Thursday 22 October 2015

পূজার শুভেচ্ছা নিন আর জেনে নিন কিভাবে দূর্গা পূজার প্রচলন হলো??

পূজার শুভেচ্ছা নিন আর জেনে নিন কিভাবে দূর্গা পূজার প্রচলন হলো??

সূফি বরষণ
দুর্গাপূজার কথা হিন্দুদের প্রধান শাস্ত্রীয় গ্রন্থ বেদেও নেই। আধিপত্যবাদী ও প্রদর্শনমূলক মনোভাব থেকেই দুর্গাপূজার প্রচলন হয়েছিলো ব্যাপক ভাবে ১৭৫৭ সালের ২৩ জুন  বাংলার  মুসলমানদের পরাজয়ের পর॥ কলকাতা কেন্দ্রীক এই পূজায়  যুক্ত হয়েছিলো অশ্লীলতা ও ব্রিটিশ তোষণ। আগে এই পূজা ছিল চৈত্র মাসের শেষের দিকে পালিত পূজা কিন্তু ১৭৫৭ সালে মুসলমানদের পরাজয়ের পর কলকাতার হিন্দু মহাজনেরা ও ধনাট্য এবং জমিদারা ইংরেজদের সংবর্ধনা দিয়ে চৈত্র কালের দূর্গা  পূজা কে এগিয়ে এনে শারদীয় দূর্গা পূজার প্রচলন করে॥ মূলত ইংরেজদের খুশি করতে এটা করেছে হিন্দুরা ॥ আর সেই থেকে চালু হয়ে গেলো শারদীয় দূর্গা পূজা ॥
বর্তমানেও দুর্গাপূজার নামে বাংলাদেশের মুসলমান তোষণ ও অশ্লীলতা ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে । বাংলাদেশে দুর্গাপূজা কখনোই জাতীয় ও সার্বজনীন উৎসব ছিল না এমনকি ভারতেও দূর্গা পূজা সার্বজনীন নয়॥  প্রকৃতপক্ষে এটা হিন্দু ভাই বোনদের পূজা উৎসব মাত্র। বাংলাদেশের পাঁচ ভাগ হিন্দুদের পূজা জাতীয় ও সার্বজনীন উৎসব হয় কি করে যেখানে ভারতেই জাতীয় বা সার্বজনীন উৎসব নয়??? ভারতেও দুর্গাপূজা বাংলাদেশের মতো এতো বাড়াবাড়ির সাথে হয় না।

দুর্গাপূজার কথা বেদেও নেই এবং ভারতেও দুর্গাপূজা বাংলাদেশের মতো এতো আড়ম্বরের সাথে হয় না। বাংলাদেশে দুর্গাপূজা কখনই জাতীয় ও সার্বজনীন উৎসব হতে পারে না এবং বিশেষ  ছুটিও ঘোষিত হতে পারে শুধুমাত্র হিন্দুদের জন্য ।  কোন মুসলমানের জন্যই পূজাকে সমর্থন করা, তাতে শরীক হওয়া, প্রসাদ খাওয়া ঠিক নয়॥

দুর্গাপূজা বেদসম্মত নয়। বৈদিক পূজার ছাপ দেয়ার জন্য বেদের দেবী সূক্তটির ব্যবহার করা হয় কিন্তু বেদের দেবীসূক্তে যে হৈমবতী উমার উল্লেখ আছে তার সঙ্গে দুর্গার কোনো সম্পর্ক নেই।
বাল্মীকির রামায়ন যে সময়কার রচনা মার্কণ্ডেয় পুরাণ সে সময় জন্মায়নি, কথিত দেবী দুর্গার আখ্যায়িকাও তখনও আসেনি।
মার্কণ্ডেয় পুরাণ যুগের ভিত্তিতে ‘শ্রীশ্রীচণ্ডী’ লিখিত হয়েছে। পৌরাণিক শাক্তাচারের শক্তির আদিমতম অবস্থাকে সংস্কৃতিতে বলা হয় আদ্যাশক্তি। এই আদ্যাশক্তির চণ্ডরূপই চণ্ড শক্তি বা চণ্ডী। তেরশ বছর আগের মার্কণ্ডেয় পুরাণ যার সংক্ষিপ্ত নাম চণ্ডী যাতে দুর্গার কথা রয়েছে, সুরথ রাজার গল্প রয়েছে, তাতেও রামের কথা লেখা নেই, আর রাম যে দুর্গার পূজা করেছিলো সে গল্পও নেই।

, মোঘল যুগের কবি তুলসী দাসের ‘রামচিতমানস্থ। সেখানেও রাম কর্তৃক দুর্গাপূজার কোন উল্লেখ নেই। তাহলে দুর্গাপূজার প্রচলন হলো কিভাবে?

পাঠান যুগের গোড়ার দিকে বরেন্দ্রভূমিতে- মানে, উত্তর বাংলার রাজশাহী জেলার তাহেরপুরে কংস নারায়ণ রায় নামে একজন রাজা ছিলো। গৌড় রাজ্যের শাসকদের জায়গীরদার তাহের খাঁর নামানুসারে ‘তাহেরপুর’ নামকরণ হয়েছিলো। এর পূর্ব নাম ছিলো সাপরুল। তাহের খাঁকে পরাজিত করে কংস নারায়ণ তাহেরপুর দখল করে এবং লুটপাট চালিয়ে অকল্পনীয় ধন-সম্পদ হস্তগত করে। অতঃপর নিজের শক্তি ও মহিমা সর্বজনে প্রকাশ করতে অশ্বমেধ যজ্ঞ করার সংকল্প করে। সে তার সময়ের পণ্ডিতদের ডেকে বললো, ‘আমি রাজসূয় কিংবা অশ্বমেধ যজ্ঞ করতে চাই। মানুষে জানুক আমার ধন ঐশ্বর্য কি রকম আছে, আর দু’হাতে ফেলে ছড়িয়ে দান করবো।’ শুনে পণ্ডিতেরা বলেছিলো, ‘এই কলিযুগে রাজসূয় বা অশ্বমেধ যজ্ঞ হয় না, তাই মার্কণ্ডেয় পুরাণে যে দুর্গাপূজা বা দুর্গোৎসবের কথা আছে, তাতেও খুব খরচ করা যায়, জাঁকজমক দেখানো যায়, নিজের ঐশ্বর্য দেখানো যায়। আপনি মার্কণ্ডেয় পুরাণ মতে এই দুর্গোৎসব করুন।’ তখন রাজা কংস নারায়ণ রায় তৎকালীন সাতলক্ষ স্বর্ণমুদ্রা (বর্তমান বাজার মূল্যে ছয়শ’ কোটি টাকা প্রায়) ব্যয় করে প্রথম দুর্গাপূজা করে। তার দেখাদেখি একটাকিয়ার (একটাকিয়া সম্ভবত রংপুর জেলায়) রাজা জগৎবল্লভ সাড়ে আটলক্ষ স্বর্ণমুদ্রা ব্যয় করে আরো জাঁকজমক করে দুর্গাপূজা করলো। তাদের দেখাদখি অন্যান্য জমিদাররা ভাবলো, ‘আমরাইবা কম কিসে, আমরাও টাকার খেলা দেখাতে পারি।’ তারাও জাঁকজমক করে দুর্গাপূজা শুরু করলো। প্রতি হিন্দু জমিদার বাড়িতে শুরু হয়ে গেলো দুর্গাপূজা। সেই সময় পূজায় নিচু জাতের হিন্দু লোকদের অঞ্জলি দেবার অধিকার থাকতো না??
কালের আবর্তনে
এক সময় হুগলী জেলার বলাগড় থানার গুপ্তিপাড়ার (জায়গাটার আসল নাম গুপ্তবৃন্দাবন) বারোজন বন্ধু ভাবলো যে আমরা এককভাবে পারবো না, কিন্তু বারোজন মিলে তো পূজার আয়োজন করতে পারি। উর্দুভাষায় বন্ধুকে ইয়ার বলে, তাই বারোজন ইয়ারে মিলে যে দুর্গাপূজা করলো সেটা হলো বারো ইয়ারী পূজা বা বারোয়ারী পূজা। আর এই বারোয়ারী পূজায় যেহেতু অন্ত্যজ লোকদের অঞ্জলি দেবার অধিকার থাকে না, তাই সবার অধিকার যাতে থাকে সেজন্য আধুনিককালে বারোয়ারী পূজা বিবর্তিত হয়ে তাদের ভাষায় হলো সার্বজনীন পূজা।

, ঊনিশ শতক থেকে আস্তে আস্তে কলকাতার পূজার রেশ ছড়িয়ে পড়েছিলো বাংলাদেশে এবং কলকাতায় অবস্থানরত অনুপস্থিত ভূস্বামী ও ধনাঢ্যরা কলকাতায় আমোদ ফুর্তি তামাসার একটি অংশ আবার শুরু করতে চাইলো বাংলাদেশের নিজ নিজ অঞ্চলে। এ ছাড়া মধ্যবিত্ত, ধনাঢ্য পেশাজীবীরা যারা প্রধানত থাকতো কলকাতা বা ঢাকায় তারাও আসতো পূজার ছুটিতে গ্রামে। মূল উদ্দেশ্য সবার ছিলো একই, ঐশ্বর্য (আধিপত্য) ও প্রজাদের প্রতি ক্ষমতা প্রদর্শন।

বর্ণহিন্দু ছাড়া তথাকথিত নিম্নবর্ণের হিন্দুদের মধ্যে যারা ছিলো বিত্তশালী তারাও দুর্গাপূজা উপলক্ষে নিজেদের ‘সম্মান’ বাড়ানোর চেষ্টা করতো। তারা অবিকল অনুকরণের চেষ্টা করতো বর্ণ হিন্দুদের, যা বর্ণহিন্দু বিশেষ করে ব্রাহ্মণেরা মোটেই পছন্দ করতো না। এমনকি নিম্নবর্ণের বাড়িতে প্রতিষ্ঠিত প্রতিমা প্রণামও ছিলো নিষিদ্ধ।

, বাঙালি হিন্দুর দুর্গাপূজা শুরু হয়েছে ষোড়শ শতাব্দী থেকে। এ ঐতিহ্য একান্তভাবেই বাঙালি হিন্দুর। উপমহাদেশের অন্য অঞ্চলের হিন্দুদের মধ্যে শারদীয় দুর্গাপূজার প্রচলন নেই।

এরপর ঊনবিংশ শতাব্দীতে কলকাতা শহরকে কেন্দ্র করে যে নব্যধনীদের উদ্ভব ঘটে, তারা দুর্গাপূজার নামে অশ্লীলতাকে আরো বিস্তার করে। অশ্লীল কদর্য নৃত্যগীত, মদ্যপান ও বেশ্যাগমনকে তাদের দুর্গাপূজার অপরিহার্য অনুষঙ্গ তারা করে নেয়।

দুর্গাপূজা প্রবল উৎসবে পরিণত হয়েছিলো প্রথমে কলকাতায়। শুধু নিছক উৎসবের জন্য নয়, প্রভু ইংরেজদের মনোরঞ্জন ও যোগাযোগের জন্যও উচ্চবর্গ ও মধ্যবিত্ত ব্যবহার করতো দুর্গাপূজা। এর প্রচুর বিবরণ ছড়িয়ে আছে সমসাময়িক বিভিন্ন পত্রপত্রিকায়, নকশা, উপন্যাসে। এখানে একটি পুস্তিকার সামান্য উদ্ধৃতি দেয়া হলো, ‘...মহামায়ার শুভ আগমনে যে কেবল হিন্দুরা আহ্লাদে ফুটিফাটা হলো তা নয়, ইংরেজ ফিরিঙ্গিরাও এ সময়ে আমোদ করতে ছাড়েন না। সম্বতসরের মধ্যে বঙ্গদেশে এই একটি বিশেষ সময়।...

দুর্গাপূজা নিয়ে বর্তমানে যে মচ্ছব হচ্ছে তা অতীতে যখন কম ছিলো তখন থেকেই খোদ হিন্দুদের মধ্যেই অনেকে সমালোচনা করে আসছে। উদাহরণত, ‘...পূর্বের দুর্গোৎসবে আর এখনকার দুর্গোৎসবে অনেক প্রভেদ হইয়া দাঁড়াইয়াছে। পূর্বের পূজা মানসিক ছিলো, আর এখনকার পূজা তামসিক হইয়া দাঁড়াইয়াছে। নাচ, তামাসা লইয়া এখন লোকের পূজা ...।’

ষোড়শ শতক থেকে ঊনিশ শতক পর্যন্ত ধনিকরা দুর্গাপূজাকে তাদের মতো করে দুর্গোৎসবে রূপান্তরিত করতে চেয়েছে। তাতে তাদের উৎসবের ক্রমাগত অশ্লীলতার বিস্তার ঘটেছে। পূজার সময় ‘ধনীর দুয়ারে কাঙালিনী মেয়েরা চোখের পানি ফেলেছে, আর মুষ্টিমেয় ধনীর দুলাল-দুলালীরা নানা ধরনের পৈশাচিক আনন্দে মেতেছে। ধনিকদের পারিবারিক দুর্গাপূজা অনুষ্ঠান উপলক্ষে ঊনিশ শতকের কলকাতায় যেমনটি ঘটতো, এখন তার চেয়ে হাজারগুণ বেশি দুর্গাপূজার নামে অশ্লীল ও বিকৃত দুর্গোৎসবে পরিণত হতে দেখে অনেক হিন্দু ধর্মবিশ্বাসী মানুষও বেদনায় ভারাক্রান্ত হয়ে উঠে।

অতীতে ইংরেজদের আকৃষ্ট করতে হিন্দু জমিদাররা যেমন দুর্গাপূজায় অবাধ অশ্লীলতার ব্যবস্থা করতো বর্তমানে মুসলমানদেরকে দুর্গাপূজায় আকৃষ্ট করতে অতীতের চেয়ে বহুগুণ বেশি অশ্লীলতার অবাধ সুযোগ করে দিচ্ছে।

হিন্দুরা এদেশে আমাদের আপনজন প্রতিবেশী  । একসঙ্গে পড়াশোনা সময়ের বন্ধু ॥ তবে দেশের শতকরা মাত্র ৫ ভাগ থেকেও কম হিন্দুরা ইদানীং পূজার নামে যেভাবে বাড়াবাড়ি করছে॥ তেমনটা ভারতেও হয় না পূজার নামে॥ এই দেশ সব ধর্মের মানুষের সবাই তার ধর্ম নিরাপদে আনন্দের সাথে পালন করবে এতে কারো আপত্তি থাকার কথা নয়॥ কিন্তু বাড়াবাড়ি করে দূর্ঘটনা ঘটানো কারো কাম্য নয়॥

হিন্দুরা তাদের  শারদীয় পূজার নামে সার্বজনীন শব্দ যোগ করে প্রচার করে যাচ্ছে। কারণ সেটা তাদের  সার্বজনীন উৎসব অন্য �ধর্মের অনুসরণকারীদের নয়॥ অন্য ধর্মের কেউ তাদের উৎসব দেখতে যেতে পারে বা শুভেচ্ছা জানাতে পারে এটা সামাজিকতা সুন্দর ॥

বিশেষভাবে স্মরণীয়,  মুসলমানরা পূজা যদিও যায়ও কিন্তু সতর্কতার সাথে  থাকতে হবে দেবীর নামে উৎসর্গ কৃত কোনো প্রসাদ খাওয়া যাবে না।
মুক্তবুদ্ধি চর্চা কেন্দ্র থেকে
সূফি বরষণ

No comments:

Post a Comment