Saturday, 3 July 2021

ইংরেজপ্রেমী হিন্দু ও বঙ্কিম

 ইংরেজপ্রেমী হিন্দু ও বঙ্কিম 



মুসলমান জাতির প্রতি বঙ্কিমের ধারণা কী ছিল তার একটা নমুনা: ‘‘ঢাকাতে দুইচারিদিন বাস করিলেই তিনটি বস্তু দর্শকদের নয়নপথের পথিক হইবে— কাক, কুকুর এবং মুসলমান। এই তিনটিই সমভাবে কলহপ্রিয়, অতি দুর্দ্দম, অজেয়। ক্রিয়া বাড়ীতে কাক আর কুকুর, আদালতে মুসলমান।’’ (বঙ্গদর্শন)। শুধু সাম্প্রদায়িক নয়, বঙ্কিমকে ইংরেজপ্রেমিক এবং দেশদ্রোহী বলতেও বাধা নেই। আনন্দমঠে লিখেছেন, ‘‘মুসলমানের পর ইংরেজ রাজা হইল, হিন্দু প্রজা তাহাতে কথা কহিল না। বরং হিন্দুরাই রাজ্য জয় করিয়া ইংরাজকে দিল। কেননা হিন্দুর ইংরাজের উপর ভিন্ন জাতীয় বলিয়া কোন দ্বেষ নাই।’’ দেশবাসীর স্বাধীনতার স্বপ্নকে বঙ্কিম ব্যঙ্গ করে লিখলেন, ‘‘স্বাধীনতা দেশী কথা নহে, বিলাতী আমদানী, লিবার্টি শব্দের অনুবাদ... ইহার এমন তাৎপর্য্য নয় যে, রাজা স্বদেশীয় হইতেই হইবে।’’ আরও লিখলেন, ‘‘ইংরেজ ভারতবর্ষের পরম উপকারী। ইংরেজ আমাদিগকে নতুন কথা শিখাইতেছে... যে সকল শিক্ষার মধ্যে অনেক শিক্ষা অমূল্য। যে সকল অমূল্য রত্ন আমরা ইংরেজদের চিত্তভাণ্ডার হইতে লাভ করিতেছি, তাহার মধ্যে দুইটি... স্বাতন্ত্র্যপ্রিয়তা এবং জাতিপ্রতিষ্ঠা। ইহা কাহাকে বলে হিন্দু জানিত না।’’ (বঙ্কিম রচনাবলি, পৃ ২৪০)।


দেশের তাঁতশিল্পকে ধ্বংস করে সরকার গরিব মুসলিম তাঁতশিল্পীদের ভাতে মারল। বঙ্কিম লিখলেন, ‘‘তাহার তাঁত বোনা ব্যবসায় লোপ পাইয়াছে বটে, কিন্তু সে অন্য ব্যবসা করুক না কেন?... তাঁত বুনিয়া আর খাইতে পায় না, কিন্তু ধান বুনিয়া খাইবার কোন বাধা নাই।’’ (বঙ্কিম রচনাবলি, ২য় খণ্ড, পৃ ৩১১)।


ইংরেজপ্রেমিক বঙ্কিম ১৮৯৪ সালে মৃত্যুর মাত্র কিছু দিন পূর্বে সরকারের কাছ থেকে সিআইই (কম্প্যানিয়ন অব দি ইন্ডিয়ান এম্পায়ার) খেতাব লাভ করেন, যার অর্থ ‘ভারত সাম্রাজ্যের সহযোগী’।

Wednesday, 9 June 2021

বসবাসের অযোগ্য শহরের তালিকায় আবারও ঢাকা শীর্ষে

 

বসবাসের অযোগ্য শহরের তালিকায় আবারও ঢাকা শীর্ষে

মুহাম্মদ নূরে আলম: বসবাসের অযোগ্য শহরের তালিকায় আবারও নাম লেখাল বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা। বিশ্বের বাসযোগ্য শহরের নতুন তালিকা প্রকাশ করেছে দ্য ইকোনমিস্টের সিস্টার কোম্পানি ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (ইআইইউ)। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের শহরের ওপর জরিপ চালিয়েছে সংস্থাটি। তালিকায় ১৪০টি দেশের নাম প্রকাশ করা হয়েছে। বসবাসের যোগ্য শহরগুলোর তালিকায় ১৪০টি শহরের মধ্যে ঢাকার অবস্থান ১৩৭। এ বছর ৩৩ দশমিক পাঁচ পয়েন্ট নিয়ে সর্বশেষ ঘোষিত তালিকার চেয়ে একধাপ এগিয়েছে ঢাকা। এ বছর ঢাকা স্থিতিশীলতায় ৫৫, স্বাস্থ্যসেবায় ১৬ দশমিক সাত, সংস্কৃতি ও পরিবেশে ৩০ দশমিক আট, শিক্ষায় ৩৩ দশমিক তিন এবং অবকাঠামোতে ২৬ দশমিক আট পয়েন্ট পেয়েছে। ২০১৯ সালে তালিকার ১৩৮ নম্বরে থাকলেও এবার রয়েছে ১৩৭ নম্বরে। এর আগে ২০১৮ সালে ঢাকা ছিল এই তালিকার ১৩৯তম শহর। অর্থাৎ ঢাকা মোটেও বসবাসের যোগ্য শহর নয়। এর আগেও শহরটি বসবাসের অযোগ্য শহরের তালিকায় জায়গা করে নিয়েছে। করোনা মহামারির কারণে লকডাউন থাকা শহরের তথ্য সংগ্রহ করতে না পারায় ২০২০ সালের তালিকা করার কাজ বাতিল করে ইকোনোমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিট।
নগরপরিকল্পনাবিদ, স্বাস্থ্য ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা বলেন, রাজধানী ঢাকা আর নাগরিক সমস্যা সমার্থক শব্দে পরিণত হয়েছে বহু আগেই। বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, শীতলক্ষ্যা ও বালু নদী দখলদারিত্বের কবলে পড়ে আবদ্ধ জলাভূমিতে পরিণত হয়েছে। নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে দুর্বিষহ যানজট, গ্যাস-বিদ্যুৎ-পানি সঙ্কট, পয়ঃনিষ্কাশনের জটিলতা, দুর্গন্ধময় ও বিষাক্ত বাতাস, দূষিত পরিবেশ, অত্যন্ত ঘনবসতি, ভেজাল খাবার, গাড়ির বিষাক্ত ধোঁয়া, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দুর্দশা, জলাবদ্ধতা, ফুটপাথ দখল, চাঁদাবাজি, মাদকের ভয়াল ছোবল, ছিনতাই, আকাশছোঁয়া দ্রব্যমূল্য, লাগামহীন বাসাভাড়া, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ক্রমাবনতি ইত্যাদি সমস্যা। অসংখ্য সমস্যার মধ্যে যেটি প্রধান হয়ে উঠেছে, তা হচ্ছে যানজট। এ সমস্যা এখন নিত্যদিনের বিষয়। যানজটে মানুষের কী পরিমাণ ক্ষতি হয়, তার হিসাব বিভিন্ন সংস্থা দিয়েছে। বুয়েটের এক গবেষণায় বলা হয়েছে, যানজটের কারণে বছরে ২২ হাজার কোটি টাকার ক্ষতি হচ্ছে। বেসরকারি গবেষণা সংস্থা পিপিআরসি বলেছে, এর পরিমাণ ২০ হাজার কোটি টাকা। সর্বশেষ জাতিসঙ্ঘের ইউএনডিপি বলেছে, যানজটে বছরে ক্ষতি ৩৫ হাজার ১০০ কোটি টাকা।
দ্য ইকোনমিস্টের সিস্টার কোম্পানি ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিট-ইআইইউ মতে, ২০২১ সালের সর্বশেষ এ জরিপে বসবাসের যোগ্য শহরের তালিকায় শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে নিউজিল্যান্ডের অকল্যান্ড। দ্বিতীয় ওসাকা, তৃতীয় অ্যাডিলেড, চতুর্থ টোকিও এবং পঞ্চম ওয়েলিংটন, ৬ষ্ঠ পার্থ, সপ্তম জুরিখ, অষ্টম জেনেভা, নবম মেলবোর্ন ও দশম স্থানে ব্রিসবেন। অর্থাৎ বসবাসযোগ্য শীর্ষ ১০টি শহরের মধ্যে নিউজিল্যান্ডের দুটি, জাপানের দুটি, অস্ট্রেলিয়ার চারটি এবং সুইজারল্যান্ডের দুটি শহর রয়েছে।
করোনা মহামারির কারণে বসবাসযোগ্য শহরের তালিকায় এবার ব্যাপক পরিবর্তন হয়েছে। ২০১৮ সাল থেকে অস্ট্রিয়ার রাজধানী ভিয়েনা এই তালিকায় শীর্ষে ছিল। কিন্তু এবার শীর্ষ ১০ শহরের মধ্যে স্থানই পায়নি ভিয়েনা। ২০১৯ সালে ভিয়েনার সঙ্গে একই পয়েন্ট নিয়ে দ্বিতীয় অবস্থান ছিল অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্ন। এদিকে এর আগের বছর বসবাসের যোগ্য শহরের তালিকায় ঢাকার অবস্থান ছিল ১৩৮তম। সে হিসেবে এবার ঢাকার অবস্থার একধাপ এগিয়েছে বলা যায়। এ তালিকাও সন্তোষজনক নয় বলে উল্লেখ করেছেন বিশেষজ্ঞরা।
ইআইইউ-এর জরিপ অনুযায়ী বসবাসযোগ্য শহরের তালিকায় একেবারে শেষে রয়েছে সিরিয়ার দামেস্ক শহর। এ শহরের অবস্থান ১৪০তম। অর্থাৎ যুদ্ধবিধ্বস্ত শহরটি একেবারেই বসবাসের অযোগ্য। অন্যদিকে বসবাসের যোগ্য শহরের তালিকায় ঢাকার চেয়ে কিছুটা ভালো অবস্থানে রয়েছে পাকিস্তানের করাচি। শহরটির অবস্থান ১৩৪। এছাড়া ১৩৫তম অবস্থানে লিবিয়ার ত্রিপোলি, ১৩৬তম আলজেরিয়ার আলজিয়ার্স, ১৩৮তম পাপুয়া নিউগিনির পোর্ট মোরেসবি এবং ১৩৯তম অবস্থানে রয়েছে নাইজেরিয়ার লাগোস। উল্লেখ্য, বিশ্বের ১৪০টি দেশের সংস্কৃতি, জলবায়ু, পরিবেশ, শিক্ষা, অবকাঠামো, স্বাস্থ্য ও জীবনযাপনের মানের ওপর ভিত্তি করে ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের বৈশ্বিক বাসযোগ্য শহরের তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে।
রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভিয়েনাকে টপকে এবারের বসবাস যোগ্য শহরের তালিকায় প্রথম স্থানে রয়েছে অকল্যান্ড। স্থিতিশীলতা, স্বাস্থ্যসেবা, সংস্কৃতি ও পরিবেশ, শিক্ষা এবং অবকাঠামোর ওপর ভিত্তি করে ১৪০টি শহরের এই তালিকা তৈরি করে।
ডিপ্লোমা শিক্ষা গবেষণা কাউন্সিলের সভাপতি মো. আবুল হাসান ও মহাসচিব খন রঞ্জন রায় বলেন, ঢাকা মহানগরে যানবাহনের অনিয়ন্ত্রিত বৃদ্ধি এবং বিভিন্ন নির্মাণকাজের কারণে বায়ুদূষণ আশঙ্কাজনক। মিরপুর ১০ নম্বর গোল চক্করে এর মাত্রা সবচেয়ে বেশি। সেখানে প্রতি ঘনমিটার বাতাসে পার্টিকুলেট মেটার (পিএম) ১৭২ মাইক্রোগ্রাম। অথচ জাতীয়ভাবে গ্রহণযোগ্য পিএম ৬৫ মাইক্রোগ্রাম। জনস্বাস্থ্য পরিস্থিতিও ভয়াবহ।
তারা আরও বলেন, রাজধানী ঢাকায় মশাবাহিত রোগের প্রকোপ দিনদিন বাড়ছে; যেমন- চিকুনগুনিয়া, ডেঙ্গু প্রভৃতির ঝুঁকি রয়েছে ব্যাপক। ময়লা-আবর্জনার কারণে দূষিত পরিবেশ; পেটের পীড়া, জন্ডিস ও টাইফয়েড আক্রান্ত হয় বহু মানুষ। ঢাকার একটি বার্ষিক ব্যাধি ডায়রিয়া। বছরে অন্তত দু’বার, বর্ষার শুরুতে ও শেষে এটা দেখা দেয়।
বিশ্বব্যাংকের হিসাবে ঢাকার মলমূত্রের মাত্র ২ শতাংশের নিরাপদ নিষ্কাশন হচ্ছে। বাকিটা মিশে যায় প্রকৃতিতে, পানির উৎসে। বিবিএস ও ইউনিসেফের তথ্য মতে, ঢাকায় সরবরাহ করা পানির দুই-তৃতীয়াংশেই মলবাহিত জীবাণু থাকে। এটি জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় ঝুঁকি। স্যানিটেশন ব্যবস্থা ভালো নয় বলে একটু বৃষ্টি হলেই স্যুয়ারেজ, ড্রেন আর পাইপের পানি একাকার হয়ে যায়।
পরিবেশ আন্দোলন বাপার মতে, রাজধানী ঢাকায় জলাবদ্ধতা অত্যন্ত প্রকট সমস্যা। ঘণ্টাখানেকের বৃষ্টিতে তলিয়ে যায় ঢাকার রাস্তাঘাট। কিছু এলাকা; যেমন- মিরপুর, মানিক নগর, মালিবাগ, ওয়্যারলেস, তেজগাঁও, কালশী রোড, দৈনিক বাংলা মোড় প্রভৃতি স্থানে রাস্তায় পানি থই থই করে। অবর্ণনীয় ভোগান্তিতে পড়ে নগরবাসী। সবচেয়ে বেশি বিপদে পড়েন স্কুল-কলেজগামী শিক্ষার্থী ও অফিসগামী যাত্রীরা। বেশির ভাগ রাস্তা ও গলি অপ্রশস্ত, ইট-খোয়া-বিটুমিন ওঠা, ময়লায় ভর্তি। এসবের ফল অসহ্য যানজট। রাস্তার সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণ নেই। সারা বছরই খোঁড়াখুঁড়ি চলে।
সূত্রে জানাযায়, দেশের সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে স্বাস্থ্য, কৃষি, মেরিন প্রকৌশল শিক্ষায় ১১৭২টি ইনস্টিটিউটের মধ্যে ঢাকাতেই প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে অর্ধেকের বেশি- ৬১৮টি। বাকি ৫৫৪টি করা হয়েছে ৩৩টি জেলায়। ৩০টি জেলায় কোনো ডিপ্লোমা ইনস্টিটিউট আজো প্রতিষ্ঠা করা হয়নি। ঢাকা শহরের জনসংখ্যার চাপ হ্রাস করতে প্রতিটি উপজেলায়-জেলায় ডিপ্লোমা ইনস্টিটিউট নির্মাণ করে কলকারখানা, খামার, হাসপাতাল, ক্লিনিকে ডিপ্লোমা ডিগ্রিধারীদের নিয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।
আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান নামবিও’র প্রকাশিত ওয়ার্ল্ড ট্রাফিক ইনডেক্স-২০১৯-এ এই তথ্য উঠে এসেছে। নামবিওর তথ্য থেকে জানা যায়, আগে ২০১৮ এবং ২০১৭ সালে যানজটে ঢাকার অবস্থান ছিল দ্বিতীয়। তার আগে ২০১৬ সালে ঢাকার অবস্থান ছিল তৃতীয়। কিন্তু মাত্র তিন বছর আগে ২০১৫ সালে ঢাকা ছিল অষ্টম। বসবাস অযোগ্যতায় তিন বছরে দুই ধাপ উন্নতি হলেও যানজটের দিক দিয়ে চার বছরে আট ধাপ অবনতি হয়ে আমরা প্রথম হয়ে গেছি। বিভিন্ন দেশের রাজধানী এবং গুরুত্বপূর্ণ ২০৭টি শহরকে বিবেচনায় নিয়ে এ তালিকা প্রণয়ন করেছে নামবিও। এ ক্ষেত্রে তারা সময় অপচয়, অদক্ষতা ও কার্বন-নিঃসরণকে বিবেচনায় নিয়েছে। বিশ্বের অনিরাপদ নগরীর তালিকায়ও ঢাকা তৃতীয়। এই তালিকাটিও করেছে ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিট। এদিকে বিশ্বের দ্বিতীয় দূষিত রাজধানী ঢাকা, সবচেয়ে দূষিত বাংলাদেশ। ২০১৮ সাল থেকে ২০২১ সালের মে মাস পর্যন্ত বিশ্ব বায়ুর মান যাচাই করে দেয়া রিপোর্ট থেকে এমন তথ্যই উঠে এসেছিল।
বাতাসে ক্ষুদ্র কণিকার উপস্থিতির পরিমাণ হিসাব করে বায়ুদূষণের মাত্রা হিসাব করা হয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, ডব্লিউএইচও স্বাস্থ্য ঝুঁকি বিবেচনা করে বাতাসে ক্ষুদ্র কণিকার গড় মাত্রা প্রতি ঘনমিটারে সর্বোচ্চ ১০ মাইক্রোগ্রাম নির্দিষ্ট করে দিয়েছে। কিন্তু ঢাকার বাতাসে এই কণিকার মাত্রা ২০১৮ সালে প্রতি ঘনমিটারে পাওয়া যায় ৯৭ দশমিক ১ মাইক্রোগ্রাম, যা নির্ধারিত মাত্রার চেয়ে প্রায় ১০ গুণ বেশি। দ্বিতীয় ও তৃতীয় অবস্থানে থাকা পাকিস্তান ও ভারতের বাতাসে ক্ষুদ্র কণিকার মাত্রা প্রতি ঘনমিটারে যথাক্রমে ৭৪ দশমিক ৩ ও ৭২ দশমিক ৫ মাইক্রোগ্রাম ছিল। এই বায়ুদূষণের জন্য দায়ী করা হয় ঢাকার আশপাশের ইটভাটা, ঢাকার নির্মাণকাজ, যানবাহনে ব্যবহৃত জ্বালানি, বর্জ্য পোড়ানো ইত্যাদি। ঢাকার এই অধঃপতন নিয়ে বছর দেড়েক আগে দৈনিক প্রথম আলো তাদের সম্পাদকীয়তে লিখেছিল, থমসন রয়টার্স ফাউন্ডেশনের করা এক তালিকায় নারীদের জন্য সবচেয়ে খারাপ মহানগরের মধ্যে বিশ্বে সপ্তম স্থানে আছে ঢাকা। যৌন সহিংসতা বিবেচনায় নিলে পরিস্থিতি আরও খারাপ; এখানে বাংলাদেশের স্থান চতুর্থ। যুক্তরাজ্যভিত্তিক সংস্থা জিপজেটের করা পর্যবেক্ষণের ফলাফল অনুযায়ী বিশ্বে সবচেয়ে শারীরিক ও মানসিক চাপের শহরগুলোর মধ্যে সপ্তম স্থানে আছে ঢাকা।
এদিকে শব্দদূষণ যে আমাদের জন্য নীরব ঘাতক হিসেবে নিত্যসঙ্গী হয়ে আছে, সেটা তো বিশেষজ্ঞরা প্রায়ই জানান দিচ্ছেন। কিন্তু কে শোনে কার কথা!  শব্দ দূষণকে বলা হয় নীরব ঘাতক। আর বিশেষ করে ঢাকা শহরে শব্দ দূষণের বহু উৎস রয়েছে যা জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকি। গাড়ির হর্ন, নির্মাণকাজ, মাইকের ব্যবহার, শিল্পকারখানা কোন ক্ষেত্রেই শব্দ দূষণ বিষয়ে যেসব নিয়ম রয়েছে তা মানা হচ্ছে না। শ্রবণজনিত সমস্যায় আক্রান্তের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। দেশে ৫৭ লাখ ৬০ হাজারেরও বেশি মানুষ শ্রবণ সমস্যায় ভুগছেন। এরমধ্যে শব্দদূষণের কারণে শহর এলাকার মানুষের শ্রবণশক্তি বেশি নষ্ট হচ্ছে বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। পুরো ঢাকা শহরই এখন শব্দ দূষণের শিকার। ঢাকা শহরে এমন কোনো জায়গা নেই, যেখানে শব্দের মাত্রা স্বাভাবিক আছে। শহরের প্রায় সব এলাকাতেই শব্দ গ্রহণযোগ্য মাত্রার চেয়ে দুই থেকে তিনগুণ বেশি। এ অবস্থা চলতে থাকলে ২০২১ সালের ডিসেম্বর নাগাদ ঢাকার জনসংখ্যার এক তৃতীয়াংশ কোনো-না-কোনো ধরনের বধিরতায় আক্রান্ত হবেন। শব্দের মাত্রার একককে বলা হয় ডেসিবেল। দেশে বধিরতার কারণে বিপুলসংখ্যক কর্মক্ষম মানুষ কর্মহীন জীবন যাপন করতে বাধ্য হচ্ছেন। অপরদিকে বাংলাদেশের এক-তৃতীয়াংশের বেশি মানুষ কোনো না কোনো মাত্রার শ্রবণ সমস্যায় ভুগছেন। বধিরতা সমস্যার উল্লেখযোগ্য কারণ হচ্ছে মধ্যকর্ণের প্রদাহ, আঘাতজনিত সমস্যা, উচ্চমাত্রার শব্দের কারণে সৃষ্ট বধিরতা। শব্দদূষণের মধ্যে রয়েছে উচ্চমাত্রার শব্দে হেডফোন দিয়ে গান শোনা, উচ্চমাত্রার হর্ন বাজানো, লাউডস্পিকারের শব্দ ইত্যাদি।
বাংলাদেশের বায়ুমণ্ডলে মিথেন গ্যাসের রহস্যময় ধোঁয়া শনাক্ত করেছে একাধিক আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থা। গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ পর্যবেক্ষক প্রতিষ্ঠান জিএইচজিস্যাট গত ১৭ এপ্রিল সংস্থার হুগো স্যাটেলাইটের পর্যবেক্ষণে ঢাকার অদূরে মাতুয়াইল ময়লার ভাগাড় থেকে উদ্ভূত একটি মিথেনের উৎসের সন্ধান পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছেন সংস্থাটির প্রেসিডেন্ট স্টিফেন জার্মেইন। সংস্থাটির অনুমান, মাতুয়াইল ময়লার ভাগাড় থেকে প্রতিঘণ্টায় ৪০০০ কেজি মিথেন গ্যাস উৎপন্ন হয়ে বায়ুমণ্ডলে মিশে যাচ্ছে, যা ১,৯০,০০০ গাড়ির বায়ুদূষণের সমান দূষণ। পৃথিবীর ১২টা মিথেন এমিসন হটস্পটের একটি বাংলাদেশ অনেক আগে থেকেই ছিল, কিন্তু স্রেফ একটা স্থান থেকে এই বিপুল পরিমাণে মিথেন নিঃসরণের উদাহরণ এই মুহূর্তে খুবই বিরল। জীবন আছে এমন জিনিস পচে গিয়ে উৎপন্ন হয় মিথেন গ্যাস।

Saturday, 15 May 2021

বেলফোর ঘোষণাঃ ফিলিস্তিন নিয়ে ব্রিটিশদের চক্রান্ত

 বেলফোর ঘোষণাঃ ফিলিস্তিন নিয়ে ব্রিটিশদের চক্রান্ত।



ব্রিটিশ সরকারের মুসলিম বিদ্বেষী পলিসির কারনে ফিলিস্তিনের মুসলমানরা ১০৪ বছর ধরে ইহুদীদের হাতে নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। ব্রিটিশ সরকারের পলিসির প্রতি তীব্র ঘৃণা ধিক্কার।  


ফিলিস্তিনীদের সাথে চক্রান্ত করে ইহুদীদের স্বার্থে ব্রিটেন কর্তৃক দেওয়া বেলফোর ঘোষণার ১০২ তম পূর্তি আজ। ১৯১৭ সালের ২রা নভেম্বরের দেওয়া ওই ঘোষণা ফিলিস্তিনীদের মধ্যে ব্যাপক উথান ঘটিয়েছিল। ওই ঘোষণা জায়ানিস্টদের ইহুদী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিয়েছিল যখন ব্রিটেন, "সকল ইহুদীদের আবাসস্থল" বলে ফিলিস্তিনীদের ভূমিতে ইহুদীদের রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করে। বেলফোর ঘোষণাকে ১৯৪৮ সালে ইহুদীদের কর্তৃক ফিলিস্তিনীদের ওপর দমন,পীড়ন, নির্যাতন চালিয়ে নিজ ভূমি থেকে তাদের বিতাড়িত করার বর্বর ইতিহাসের অন্যতম অনুঘটক হিসেবে দেখা হয়ে থাকে।


বেলফোর ঘোষণাটি কী ছিলো?

The Balfour Declaration (বেলফোর প্রতিশ্রুতি) ছিলো ১৯১৭ সালে ব্রিটেন কর্তৃক নিজেদের দেওয়া প্রতিশ্রুত ঘোষণা, "a national home for the Jewish people"। অর্থাৎ ইহুদীদের জন্য ইহুদী রাষ্ট্র তৈরির ঘোষণা। ব্রিটেনের ওই ঘোষণাটি পত্র আকারে ব্রিটিশ পররাষ্ট্র সচিব আর্থার বেলফোরের পক্ষ থেকে ব্রিটিনে ইহুদীর একটি বড় সংগঠন British Jews Community এর প্রধান ওয়াল্টার রথসচাইল্ডকে উদ্দেশ্য করে বিবৃত করা হয়।


বেলফোর ঘোষণাটি দেওয়া হয়েছিল প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন (১৯১৪ - ১৯১৮) সালের দিকে, ফিলিস্তিনের জন্য ব্রিটিশ মেন্ডেটের আওতার শর্তে। ঘোষণাটি দেওয়া হয় যখন অটোমান সাম্রাজ্যের পতন ঘটে যায় এরপর। ব্রিটিশ মেন্ডেট ফিলিস্তিন" নামে মেন্ডেট পদ্ধতির মূলে ছিলো যৌথ শক্তি কর্তৃক নিয়ন্ত্রণের নামে ব্রিটেন কর্তৃক ফিলিস্তিনে অবৈধভাবে উপনিবেশবাদ এবং দখলদারিত্বের শাসন। মেন্ডেট সিস্টেমে ১ম বিশ্ব যুদ্ধে পরাজিত শক্তিদের জার্মানি, অস্ট্রিয়া-হাংগেরি, অটোমান সাম্রাজ্য এবং বুলগেরিয়ার হাত থেকে বিভিন্ন রাজ্য পরিচালনার ভার যুদ্ধে জয়ী শক্তির আওতায় চলে যায়। ফিলিস্তিন নিয়ে ব্রিটিশ মেন্ডেটের মূল উদ্দেশ্য ছিলো সেখানে ইহুদী রাষ্ট্র তৈরির পরিবেশ তৈরি করা যখন সেখানে মাত্র ১০ ভাগ ইহুদী ছিলো।



ব্রিটিশ মেন্ডেট সিস্টেম শুরুর পর ব্রিটিশরা ইউরোপ থেকে দলে দলে ইহুদীদের ফিলিস্তিনে পাঠাতে বিভিন্নভাবে সাহায্য করতে থাকে। ১৯২২ থেকে ১৯৩৫ সালের মধ্যে ইহুদীদের সংখ্যা সেখানে বেড়ে দাঁড়ায় মূল জনসংখ্যার মধ্যে ২৭ ভাগে। যদিও বেলফোর ঘোষণায় উল্লেখ করা হয়েছিল এমন কিছু করা হবেনা যা নাগরিক এবং অন্যান্য ধর্মীয় সম্প্রদায়ের জন্য পক্ষপাতদুষ্ট হবে কিন্তু ব্রিটিশ মেন্ডেট এমনভাবে গঠন করা হয়েছিল যা ইহুদীদের বিভিন্নভাবে সহায়তা দিয়ে ফিলিস্তিনীদের ওপর ইহুদীদের নিজেদের কর্তৃত্বশীল ইহুদী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় সাহায্য করেছিল।


বেলফোর ঘোষণা বিতর্কিত ছিলো কেনো?


বেলফোর ঘোষণা নানা কারণে ছিলো বিতর্কিত। প্রথমত, ফিলিস্তিনী আমেরিকান পণ্ডিত এডওয়ার্ডের ভাষায়, "ইউরোপিয়ান একটি দেশ কর্তৃক অ ইউরোপীয় একটি ভূখণ্ডের বিষয়ে ঘোষণা যেখানে ওই ঘোষণা ওই ভূখণ্ডের সংখ্যাগরিষ্ঠ বাসিন্দার অস্তিত্ব এবং মতামতকে যেখানে উপেক্ষা করে।" সংক্ষেপে, বেলফোর ঘোষণা একটি ইহুদী ভূখণ্ড তৈরির প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল যেখানে স্থানীয় অধিবাসীদের সংখ্যাই ছিলো ৯০ ভাগ। দ্বিতীয়ত, ঘোষণাটি ছিলো ব্রিটিশদের যুদ্ধ চলাকালীন দেওয়া তিনটি পারস্পরিক সাংঘর্ষিক প্রতিশ্রুতির একটি। যখন এটি প্রকাশ করা হয়, ব্রিটেন ইতোমধ্যেই প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল অটোমান সাম্রাজ্য থেকে স্বাধীন আরব রাষ্ট্রের সৃষ্টির।



"Hussein-McMahon correspondence" নামের ঐতিহাসিক পত্র বিনিময় যেখানে ব্রিটিশ এবং শরীফ আল মক্কা নামে পরিচিত সৌদি ধর্মীয় নেতা হোসাইন বিন আলির ১৯১৫ সালের দিকে পত্র বিনিময়ের মধ্যে ওই প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। যেখানে হোসাইন বিন আলি অটোমান শাসনের বিরুদ্ধে আরব বিদ্রোহ ঘোষণা করে ব্রিটিশদের কাছ থেকে ওই প্রতিশ্রুতি চেয়েছিল। ব্রিটিশরা "1916 Sykes-Picot agreement" নামের সাইক পিকট চুক্তির আওতায় ফরাসিদেরও আলাদাভাবে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, সংখ্যাগরিষ্ঠ ফিলিস্তিন অঞ্চল আন্তর্জাতিক প্রশাসনের অধীন থাকবে। অন্যদিকে অন্যান্য এলাকাগুলো যুদ্ধের পর দুই ঔপনিবেশিক শক্তির মধ্যে ভাগ করে দেওয়া হবে। ওই ঘোষণা যাইহোক এটাই বুঝিয়েছিল, ফিলিস্তিন ব্রিটিশদের দখলে থাকবে এবং ফিলিস্তিনী আরব যারা সেখানে থাকবে তারা কখনো স্বাধীন রাষ্ট্র পাবেনা।


পরিশেষে, বেলফোর ঘোষণা এমন একটি ধারণার ("national home" বা জাতীয় আবাস ) পরিচিতি ঘটিয়েছিল যা আন্তর্জাতিক আইনে ছিলো নজিরহীন।পুরনো নথিগুলোতে, "ইহুদী রাষ্ট্র হিসেবে ফিলিস্তিনের পুনর্গঠন" বাক্যটি ব্যবহার করা হয়েছিল যা পরবর্তীতে পরিবর্তন হয়ে যায়। ১৯২২ সালে ইহুদিবাদী নেতা চেইম ওয়েইজম্যান সাথে একটি সাক্ষাতে আর্থার বেলফোর এবং পরে প্রধানমন্ত্রী ডেভিড লাইওয়েড জর্জ বেলফোরের ঘোষণাকে, ''চূড়ান্ত ইহুদীরাষ্ট্র সৃষ্টির প্রক্রিয়া'' বলে জানায়।


কেন এই ঘোষণা জারি করা হলো? বেলফোর ঘোষণা কেনো জারি করা হলো এটা কয়েক দশক ধরে বিতর্কিত বিষয়। ঐতিহাসিকেরা বিভিন্ন উৎস থেকে এর বিভিন্ন ব্যাখ্যা দিচ্ছে। অনেকে যুক্তি সহকারে কারণ হিসেবে তুলে ধরছে তৎকালীন ব্রিটিশ সরকারে থাকা অধিকাংশ ইহুদীবাদী কর্মকর্তাকে। অনেকে ওই ঘোষণাকে ইহুদীদের সাথে বৈষম্যের বিরুদ্ধে একটি কার্যকারী ঘোষণা বলে মনে করে যেখানে ফিলিস্তিন ভূখণ্ডকে ইহুদীদের দিয়ে দিলে ইহুদীদের সমস্যার সমাধান হবে। মূলধারার গবেষকদের সংখ্যাগরিষ্ঠের মতের ভিত্তিতে যেসব কারণগুলো উল্লেখ করা হয় সেগুলো হলোঃ ফিলিস্তিনের ওপর নিয়ন্ত্রণের উদ্দেশ্য ছিলো ব্রিটেনের মিশর এবং সুয়েজ খালকে নিজেদের প্রভাব গোলকের মধ্যে রাখা।

ব্রিটেন ইহুদিবাদীদের পক্ষ নিয়েছিল আমেরিকা এবং রাশিয়ায় ইহুদীদের আন্দোলনকে বেগবান করে তাদের সরকারকে যুদ্ধে জয়লাভ পর্যন্ত জড়িয়ে রাখার জন্য।

ব্রিটিশ সরকারে ইহুদীবাদী লবিদের সাথে মজবুত সম্পর্ক ও তীব্র প্রভাব বিদ্যমান থাকায়। ব্রিটিশ সরকারে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তা ছিলো ইহুদী।

ইহুদীরা ইউরোপ জুড়ে নিপীড়িত হয়েছিল বলে ব্রিটিশ সরকার তাদের প্রতি সহানুভূতি দেখাতে চেয়েছিল।

ফিলিস্তিনী ও আরবেরা বেলফোর ঘোষণাকে কীভাবে নিয়েছিল?


১৯১৯ সালে, পরবর্তীতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ওউড্রো উইলসন একটি কমিশন গঠন করে সিরিয়া এবং ফিলিস্তিনের মেন্ডাটরি পদ্ধতির বিষয়ে জনসাধারণের মতামত জানার জন্য। ওই অনুসন্ধান "কিং-ক্রেন" কমিশন নামে পরিচিত হয়। ওই কমিশন অনুসন্ধানের ফলাফল পায় যে, সংখ্যাগরিষ্ঠ ফিলিস্তিনী তীব্র ইহুদিবাদ বিরোধী এবং ওই কমিশন মেন্ডেটের উদ্দেশ্য পরিবর্তনের পরামর্শ প্রদান করে।

প্রয়াত ফিলিস্তিনী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব আউনি আবেদ আল হাদি বেলফোর ঘোষণার বিরুদ্ধে নিজের স্মৃতি থেকে উল্লেখ করেন, "এটি ছিলো এক বিদেশী ইংরেজের তৈরি যার ফিলিস্তিন নিয়ে কিছু করার অধিকার নেই, বিদেশী ইহুদী যাদের এখানে কোনো অধিকার নেই।"


১৯২০ সালে, হাইফায় তৃতীয় ফিলিস্তিনী কংগ্রেসে ব্রিটিশ সরকারের ইহুদীবাদী পরিকল্পনা এবং আন্তর্জাতিক আইন বিরোধী ঘোষণার নিন্দা করা হয় যেখানে স্থানীয় অধিবাসীদের অধিকারও খর্বিত হচ্ছে। ১৯১৯ সালের নভেম্বরে যখন দামেস্ক ভিত্তিক আল ইস্তিকলাল আল আরাবি পত্রিকা নতুন করে প্রকাশিত হলো সেখানে একটি আর্টিকেলে লন্ডনের মন্ত্রীসভার ইহুদী মন্ত্রী হারবার্ট সামুয়েলের বেলফোর ঘোষণার দ্বিতীয় একটি ভাষণের সমালোচনা করে উল্লেখ করা হয়, আমাদের দেশ আরব, ফিলিস্তিন আরব এবং ফিলিস্তিন অবশ্যই আরবদের থাকবে"।


বেলফোর ঘোষণা এবং ব্রিটিশ মেন্ডেট প্রতিষ্ঠার আরো পূর্বে, আরব জাতীয়তাবাদী পত্রিকাগুলো ফিলিস্তিনীদের নিজ ভূখণ্ড থেকে সরানোর ইহুদীবাদ আন্দোলনের বিষয়ে সতর্ক করেছিল। খলিল সাকাকিনি, মাকদিসের (জেরুসালেমের বাসিন্দা) বাসিন্দা এবং অর্থোডক্স খ্রিস্টান শিক্ষক যুদ্ধের পরপর ফিলিস্তিনের বর্ণনা করেছিলেন এভাবে, "এক জাতি যারা দীর্ঘকাল গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন ছিলো তারা কেবল তখনই জাগে যখন রুক্ষভাবে বিভিন্ন ঘটনা ঝাঁকিয়ে তুলে এবং কেবল ধীরে ধীরে জেগে উঠে......"। এটিই ছিলো ফিলিস্তিনের অবস্থা, কয়েক শতাব্দী ধরে গভীর ঘুমে আছন্ন ছিলো যে পর্যন্ত না মহাযুদ্ধ শুরু হলো, ইহুদীবাদ আন্দোলনের কারণে বিস্মিত হলো, অধিকার খর্বিত হলো, এবং ধীরে ধীরে তারা জাগতে শুরু করলো।"


মেন্ডেটের অধীনে ইহুদী অভিবাসীদের ক্রমাগত সংখ্যা বৃদ্ধি উত্তেজনা বাড়িয়ে দিয়েছিল এবং ফিলিস্তিনী আরব ও ইহুদীদের মধ্যে সহিংসতা বৃদ্ধি হচ্ছিল। ব্রিটিশদের ক্রিয়াকলাপের বিরুদ্ধে প্রথম সাড়া জাগানো প্রতিক্রিয়া ছিলো "নবী মুসা বিদ্রোহ" বলে পরিচিত ১৯২০ সালের আরব ফিলিস্তিনী ও ইহুদীদের মধ্যকার দাঙ্গা যেখানে ৫ ইহুদী অভিবাসী নিহত ও ৪ ফিলিস্তিনী শাহাদাতবরণ করে এবং বহু হতাহত হয়। নবী মূসা আঃ এর নামে একটি ধর্মীয় উৎসবের সময় ঘটনাটি ঘটে।


বেলফোর ঘোষণার পিছনে আর কারা ছিলো? যেখানে ব্রিটেন ওই ঘোষণার জন্য আপাতত দৃষ্টিতে সম্পূর্ণভাবে দায়ী ছিলো কিন্তু এখানে একটি বিষয় গুরুত্বসহকারে উল্লেখযোগ্য যে, ১ম বিশ্ব যুদ্ধকালীন ব্রিটেনের মিত্র শক্তিগুলোর পূর্বমত ছাড়া ব্রিটেনের ওই ঘোষণা দেওয়া সম্ভব ছিলো না। ১৯১৭ সালে যুদ্ধকালীন মন্ত্রীসভার মিটিংয়ে , ব্রিটিশ মন্ত্রীরা সিদ্ধান্ত নেয় যে, "কোনো ঘোষণা প্রদানের পূর্বে প্রেসিডেন্ট উইলসনের মতমত গৃহীত হওয়া উচিত"। মন্ত্রীসভার সদস্যেরা স্মরণ করিয়ে দেয় যে আর্থার বেলফোর নিশ্চিত করেছে উইলসন ওই ঘোষণার অনুগ্রাহী।ফ্রান্সও ওই ঘোষণার পিছনে জড়িত ছিলো এবং বেলফোর ঘোষণার সাথে নিজেদের সমর্থন প্রকাশ করেছিল।


১৯১৭ সালে এক ফরাসি কূটনীতিক জুলেস ক্যামবনের, নাহুম সুকুলো নামের এক পোলিশ জায়ানিস্টকে পাঠানো চিঠিতে "ফিলিস্তিনে ইহুদী উপনিবেশ " উল্লেখ করে ফরাসি সরকারের সহমর্মিতার দৃষ্টান্ত বলে তা প্রকাশ করে এভাবে,

"[I]t would be a deed of justice and of reparation to assist, by the protection of the Allied Powers, in the renaissance of the Jewish nationality in that Land from which the people of Israel were exiled so many centuries ago," stated the letter, which was seen as a precursor to the Balfour Declaration.


বেলফোর ঘোষণা ফিলিস্তিনীদের ওপর কী প্রভাব ফেলেছিল? বেলফোর ঘোষণাকে ১৯৪৮ সালের ফিলিস্তিনী নাকবা সংঘটিত হওয়ার আলামত বলে দেখা হয়ে থাকে যখন ব্রিটিশদের কর্তৃক প্রশিক্ষিত ইহুদী সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা ৭,৫০,০০০ এর অধিক ফিলিস্তিনীদের নিজ ভিটে থেকে নির্যাতন, নিপীড়ন চালিয়ে জোরপূর্বক বিতাড়িত করে। যুদ্ধকালীন মন্ত্রীসভার কিছু সদস্য বিরোধিতা করে এরকম পরিস্থিতির আশংকার পূর্বাভাস দিলেও ব্রিটিশ সরকার বেলফোর ঘোষণা দেওয়া থেকে বিরত থাকেনি।


এতে কোনো সন্দেহ নেই ব্রিটিশ মেন্ডেট সংখ্যালঘু ইহুদীদের জন্য ফিলিস্তিনীদের তাদের ভূমি থেকে তাড়িয়ে ইহুদীদের জন্য নিজেদের রাষ্ট্র গঠনের সুযোগ তৈরি করে দিয়েছিল।যখন ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশরা সিদ্ধান্ত নেয় মেন্ডেট ব্যবস্থার ইতি ঘটিয়ে ফিলিস্তিন ইস্যু জাতিসংঘে উথাপন করবে, অন্যদিকে ইহুদীরা ততোদিন নিজেদের আর্মি গড়ে ফেলে। ব্রিটিশদের হয়ে ২য় বিশ্বযুদ্ধ লড়াই করা ইহুদী প্যারা মেলিটারিদের নিয়ে গঠিত হয়েছিল ওই আর্মি। আরো গুরুত্বপূর্ণ যে বিষয়টি, ব্রিটিশরা ইহুদীদের স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান যেমন ইহুদীদের ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রের জন্য প্রস্তুতি নিতে "ইহুদী এজেন্সি"র মতো প্রতিষ্ঠান গড়ার অনুমতি দিয়েছিল অন্যদিকে ফিলিস্তিনীদের এরকম কোনো প্রতিষ্ঠান গড়ার অনুমতি দেওয়া হয়নি যা ফিলিস্তিনীদের জাতিগতভাবে নির্মূলের পথ সুগম করে দিয়েছিল।


মূল সুত্রঃ [২০১৭ সালে বেলফোর ঘোষণার ১০০ শতাব্দী পূর্তিতে আল জাজিরায় প্রকাশিত বিশেষ প্রবন্ধ থেকে অনুদিত। ]


Friday, 12 April 2019

বাংলাদেশে টাকশালের গোড়ার কথা

আপডেট: ০৭ এপ্রিল ২০১৯ - ০৫:৫০ | প্রকাশিত: রবিবার ০৭ এপ্রিল ২০১৯ | প্রিন্ট সংস্করণ daily sangram 



আবু রাওনাফ আলী নূর : টাকশাল নামেই পরিচিত। পোশাকি নাম দ্য সিকিউরিটি প্রিন্টিং করপোরেশন (বাংলাদেশ) লিমিটেড। দেশের টাকা ছাপানোর একমাত্র এই প্রতিষ্ঠানের অবস্থান গাজীপুরে। টাকশালের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয় ১৯৮৯ সালে। এ বছর এসে পূর্ণ হলো ৩০ বছর। টাকশাল নিয়েই আজকের এই প্রতিবেদন। বিশ্বে স্বাধীন দেশের সংখ্যা প্রায় ২০০। তবে সরকারি ও বেসরকারি মিলিয়ে নোট মুদ্রণের ছাপাখানা আছে মাত্র ৬৫; যার মধ্যে বাংলাদেশের টাকশাল একটি। নাগরিক হিসেবে ব্যাপারটা নিশ্চয় মর্যাদা ও গর্বের। দেশের মানুষের কাছে ‘টাকশাল’ নামে বেশি পরিচিত বাংলাদেশের টাকা ছাপানোর প্রতিষ্ঠানটির পোশাকি নাম ‘দ্য সিকিউরিটি প্রিন্টিং করপোরেশন (বাংলাদেশ) লিমিটেড। দি সিকিউরিটি প্রিন্টিং কর্পোরেশন (বাংলাদেশ) লিমিটেড (The Security Printing Corporation (Bangladesh) Ltd. (SPCBL) হল বাংলাদেশে ব্যাংকনোট ও সরকারি ডাকটিকিটের প্রধান ছাপাখানা। ওয়েবসাইট http://www.spcbl.org.bd, ১৯৮৮ সালে প্রতিষ্ঠিত এই প্রতিষ্ঠানটি বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি প্রকল্প হিসেবে কার্যক্রম শুরু করে। ১৯৯২ সালের এপ্রিল থেকে, এটি দেশের উপস্থিত আইনের আওতাধীন স্বায়ত্ত্বশাসিত প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ শুরু করে। এটি আন্তর্জাতিক সরকারি ছাপাখানা সমিতির নিয়মিত সদস্য। নেপাল সহ আরও বহু দেশ এর চার রং বিশিষ্ট উন্নত ডাকটিকিটের ক্রেতা। ২০১৩ সালে এর রজত জয়ন্তী উপলক্ষে প্রতিষ্ঠানটি সীমিত পরিমাণে ২৫ টাকার স্মারক নোট অবমুক্ত করে।
টাকশালের অভ্যন্তরে : ইংরেজি শব্দ ‘মিন্ট’-এর বাংলা হচ্ছে টাকশাল যেখানে কাঁড়ি কাঁড়ি ধাতব মুদ্রা বা কয়েন বানানো হয়। তবে মজার ব্যাপার হলো, কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা ছাপালেও বাংলাদেশের টাকশালে কোনো কয়েন তৈরি হয় না। আর্থিকভাবে লাভ-লোকসান বিশ্লেষণে দেশের জন্য কয়েন উৎপাদন লাভজনক বিবেচিত না হওয়ায় আমাদের টাকশালে এখনো কয়েন তৈরির কোনো পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়নি এবং এ জন্য কয়েন তৈরির কোনো মেশিনও সংস্থাপন করা হয়নি। তবে টাকশালে শুধু যে টাকাই ছাপা হয়, ব্যাপারটা এমন নয়। টাকা ছাপানোর উদ্দেশ্যে স্থাপিত হলেও সরকারের বিভিন্ন নিরাপত্তাসামগ্রী এখানে ছাপানো হয়, যেমন: অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের সঞ্চয়পত্র, নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্প, রাজস্ব স্ট্যাম্প, আদালতে ব্যবহৃত বিভিন্ন নিরাপত্তামূলক সামগ্রী, স্মারক ডাকটিকিট, খাম, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের ট্যাক্স লেবেল, ব্যাংকের চেক বই, প্রাইজবন্ড, রপ্তানি উন্নয়ন বুুরোর জিএসপি ফরম, দেশের সব শিক্ষা বোর্ডের বিভিন্ন পাবলিক পরীক্ষার নম্বরপত্র ও সনদ ইত্যাদি। এ ছাড়াও কোনো কোনো কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুরোধে তাদের শিক্ষা সনদও মুদ্রণ করা হয়ে থাকে। টাকা মুদ্রণের কারণে প্রতিষ্ঠানটি সম্পর্কে সাধারণ মানুষের আগ্রহ প্রচুর। প্রায় ৬৬ একর জায়গা নিয়ে দেশের টাকা তৈরির একমাত্র এই কারখানা বৃক্ষশোভিত। আর গাছগাছালিতে ভরা বলেই টাকশালের অভ্যন্তর সব সময় পাখির কলরবে মুখরিত থাকে। শুধু প্রাকৃতিক দিক থেকেই নয়, টাকা মুদ্রণের একক ক্ষমতাপ্রাপ্ত হওয়ার কারণে প্রতিষ্ঠানটি দেশের অন্যান্য প্রতিষ্ঠান থেকে কিছুটা ভিন্নও। কিন্তু বিদ্যমান বহু স্তরে নিরাপত্তাব্যবস্থার কারণে এই প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব কর্মী ও প্রতিষ্ঠানটিকে কঠোর নিয়ম মেনে চলতে হয়। পুলিশের প্রায় ৮০ জন সদস্য প্রতিষ্ঠানের বাইরের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে থাকে। এই ছাপাখানায় প্রবেশ করতে হলে চারটি ফটকে নিরাপত্তাকর্মী ও পুলিশকে প্রয়োজনীয় তথ্য পরিবেশন করতে হয়। প্রেসের মূল ফটক ও ভেতরের ঘরগুলোতে কর্মচারী, কর্মকর্তাদের চলাচলে অ্যাকসেস কন্ট্রোল ছাড়াও সব কর্মকর্তা, কর্মচারী এবং অনুমতি পাওয়া গ্রাহকদের ছাপাখানায় প্রবেশের সময় দেহ তল্লাশি করা হয়। ব্যক্তি ও মালপত্রের আসা-যাওয়া নিয়ন্ত্রণ ও সংশ্লিষ্ট তথ্য লিখে রাখার জন্য করপোরেশনের শতাধিক নিরাপত্তাকর্মী রয়েছেন। কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের প্রেসের অভ্যন্তরে চলাচলেও কড়াকড়ি আরোপ করা হয়ে থাকে। মুদ্রণসহ যেকোনো নিরাপত্তাসামগ্রী উৎপাদনে বেশ কিছু পর্যায়ে বিভিন্ন ঘরে (হল) কাজ করা হয়ে থাকে। নির্ধারিত কর্মচারী ও কর্মকর্তা ছাড়া এক হল থেকে অন্য হলে কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া যেতে পারেন না। প্রতিটি হলের জন্য আলাদা এন্ট্রি পাস ছাড়াও দরজায় নিরাপত্তাকর্মীরা অন্যদের প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ করে থাকেন। উৎপাদন প্রক্রিয়াতেও নিরাপত্তা বিধানের ব্যবস্থা রয়েছে। সংগৃহীত কাঁচামাল ও উৎপাদিত সামগ্রীর মধ্যে সমন্বয়ন পদ্ধতি এই প্রতিষ্ঠানে গুরুত্ব দিয়েই পালন করা হয়। সমন্বয়ন বা রিকনসিলিয়েশনে গ্রাহক প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ব্যাংক, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর), অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ, রপ্তানি উন্নয়ন বু্যুরো, বিভিন্ন বাণিজ্যিক ব্যাংকের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ থাকে। যতক্ষণ সংগৃহীত কাঁচামালের সঙ্গে উৎপাদিত পণ্য ও ওয়েস্টেজ বা অপচয়ের মিল হবে না, ততক্ষণ হিসাব করা হতে থাকবে। হিসাব মিলে গেলে গ্রাহক প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধির উপস্থিতিতে ওয়েস্টেজ ধ্বংস করা হয়। এমন নিরাপত্তা বিধান ও স্বচ্ছতার কারণে এই টাকশাল গ্রাহক প্রতিষ্ঠাগুলোর আস্থা অর্জনে সমর্থ হয়েছে।
গোড়াপত্তনের গল্প : ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরও দেশে কিছুদিন পাকিস্তানী টাকার প্রচলন ছিল। তখন ওই টাকাগুলোতে ‘বাংলাদেশ’ লেখা স্ট্যাম্প ব্যবহার করা হতো। পাকিস্তানী মুদ্রার পরিবর্তে বাংলাদেশের মুদ্রা হিসেবে টাকার প্রচলন শুরু হয় ১৯৭২ সালের ৪ মার্চ। টাকশালে টাকা ছাপানো শুরুর আগ পর্যন্ত ভারত, সুইজারল্যান্ড, ইংল্যান্ড, দক্ষিণ কোরিয়া, জার্মানি থেকে বাংলাদেশের নোট ছেপে আনা হতো। সংগ্রহ নীতিমালা অনুসরণ করে একটি ভিন্ন দেশ থেকে নোট ছেপে সময়মতো আনা কিছুটা ঝুঁকিপূর্ণ বোধ করে আমাদের দেশেই নোট মুদ্রণের একটি ছাপাখানা প্রতিষ্ঠা করার প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। নোট ছাপার জন্য একটি প্রেস স্থাপনের ব্যাপারে ১৯৮৩ সালে একনেকে সিদ্ধান্ত নেয়ার পর ১৯৮৯ সালে প্রতিষ্ঠানটির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়। তবে উদ্বোধনের আগে ১৯৮৮ সালেই পরীক্ষামূলকভাবে ১ টাকা ও ১০ টাকার নোট ছাপানো হয়েছিল। প্রথম দিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি প্রকল্প হিসেবেই এই প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম শুরু হয়েছিল। জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি বা একনেকের অনুমোদনের পর অর্থ মন্ত্রণালয় নোট মুদ্রণের এই প্রকল্প বাস্তবায়নের দায়িত্ব দেয় বাংলাদেশ ব্যাংকের ওপর। বাংলাদেশ ব্যাংক নিজস্ব অর্থায়নে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন সম্পন্ন করে। পরে যৌথ মূলধন কোম্পানির অনুমোদন নিয়ে একটি পাবলিক লিমিটেড কোম্পানি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে, যার নামকরণ করা হয় ‘দ্য সিকিউরিটি প্রিন্টিং করপোরেশন। শুনেছি, ‘দ্য’ নির্দেশকটি তৎকালীন অর্থসচিব ড. আকবর আলি খানের দেওয়া।
নোট ছাপানোর রীতিনীতি : বাংলাদেশ ব্যাংকসহ বিভিন্ন গ্রাহক প্রতিষ্ঠান সচরাচর বছরভিত্তিক তাদের প্রয়োজন মোতাবেক পণ্যের চাহিদা বা কার্যাদেশ দিয়ে থাকে। বাংলাদেশ ব্যাংকের চাহিদা অনুযায়ী নোটের উৎপাদন ও সরবরাহ করা টাকশালের পক্ষে এর আগে কখনো সম্ভব হয়নি। ৩০ বছর আগে বসানো স্বল্পসংখ্যক মেশিন দিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের ক্রমবর্ধমান চাহিদা মেটানো টাকশালের পক্ষে সম্ভব ছিল না। সম্প্রতি আরেকটি উৎপাদন লাইনের মেশিন বসানোর পর উৎপাদনও শুরু হয়েছে। মেশিনের স্বল্পতার জন্য কয়েকটি মূল্যমানের নোট একই সময়ে মুদ্রণ করা সম্ভব হয় না; একটি নোট ছাপাতে প্রায় ৩০ পর্যায় পার করতে হয়। নোট উৎপাদনের পরিমাণ নিয়মিত বাংলাদেশ ব্যাংককে জানানো হয়ে থাকে। বাংলাদেশ ব্যাংক তাদের বিভিন্ন অফিসের প্রয়োজনমতো বিভিন্ন মূল্যমানের নোটের চাহিদা জানালে টাকশালের ভল্ট থেকে তা সরবরাহ করা হয়।
টাকশাল হলো কোম্পানি : ১৯৯২ সালে প্রকল্প থেকে পাবলিক লিমিটেড কোম্পানিতে পরিণত হওয়ার পর বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রত্যক্ষ কর্তৃত্ব কিছুটা কমে এই প্রতিষ্ঠানের ওপর। কর্তৃত্ব চলে যায় পরিচালনা পর্ষদের হাতে। বর্তমানে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের নেতৃত্বে গঠিত সাত সদস্যবিশিষ্ট পরিচালনা পর্ষদ টাকশাল পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছে। এই পরিচালনা পর্ষদ প্রতিষ্ঠানটির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী কর্তৃপক্ষ। অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ, অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ডাক বিভাগের প্রতিনিধিসহ বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন ডেপুটি গভর্নর ও সিকিউরিটি প্রিন্টিং করপোরেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এই পরিচালনা পর্ষদের সদস্য। টাকশালের পুরো মূলধন বাংলাদেশ ব্যাংক জোগান দিয়েছে।
৯ ধরনের নোট : বাংলাদেশে ৯টি মূল্যমানের কাগজি নোট রয়েছে; অবশ্য বর্তমানে ১ টাকা মূল্যমানের কাগজি নোট আর ছাপানো হয় না। বাকি নোটগুলো গাজীপুরে অবস্থিত সিকিউরিটি প্রিন্টিং করপোরেশনে ছাপা হয়ে থাকে। এ ছাড়া সব স্মারক নোটও এই টাকশালেই মুদ্রিত। উচ্চ মূল্যমানের নোটগুলো জাল হয় বলে এগুলোর নকলরোধে বেশি নিরাপত্তা বৈশিষ্ট্যের সংযোজন করা হয়ে থাকে। কম মূল্যমানের নোটগুলো অপেক্ষাকৃত বেশি হাতবদল হয় এবং এই নোটগুলো ব্যবহারের অযোগ্য হয়ে গেলেও বদলে নেওয়ার জটিলতায় কেউ ব্যাংকের দ্বারস্থ হয় না। এসব বিবেচনায় কম মূল্যমানের কাগজি নোটের পরিবর্তে ধাতুর তৈরি কয়েন বিদেশ থেকে আমদানি করে ইস্যু করা হয়ে থাকে। কিন্তু আমাদের জনগণ কয়েন ব্যবহারে একেবারেই অভ্যস্ত নয় এবং কয়েন ব্যবহারের অপরিহার্যতা আমাদের দেশে এখনো সৃষ্টি হয়নি। টাকশালের প্রায় ১ হাজার কর্মচারী-কর্মকর্তার পরিশ্রমে যে নতুন কচকচে নোট উৎপাদন হয়, সেই নতুন নোটে বেতন হয় না বলে একটু আক্ষেপ দেখেছি তাঁদের মধ্যে। যে টাকা তাঁরা তৈরি করেন, সেই টাকা ভুলক্রমে বাসা থেকে অফিসে প্রবেশের সময় সঙ্গে পাওয়া গেলে তার জন্যও তাঁদের শাস্তি ভোগ করতে হয়। অধিকাংশ কর্মচারী, কর্মকর্তাকে ওভার টাইম কাজসহ পুরো দিনটি পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে থাকতে হয়; কারণ উৎপাদন এলাকায় মুঠোফোন নেওয়া নিষিদ্ধ। 
দেশখ্যাত শিল্পীদের নকশায় টাকা ছাপা হয় গাজীপুরের টাকশালে: বিশাল এক কর্মযজ্ঞের মধ্য দিয়ে মানুষের হাতে কাগজের টাক বা ধাতব পয়সা আসে। কখন কী পরিমান মুদ্রা ছাড়া হবে তার আছে হিসাব পদ্ধতি। মুদ্রার নক্সা করতে যুক্ত করা হয় দেশের স্বনামখ্যাত শিল্পীদের। টাকশালের যাত্রা শুরুতে বিভিন্ন মানের ৩০ কোটি নোট ছাপানোর সক্ষমতা ছিল। বেড়ে এখন ১শ’ ২০ কোটিতে দাঁড়িয়েছে। কাগজের নোটের স্থায়িত্ব ও নিরাপত্তার কথা বিবচেনা করে বদল করা হয় সময়ে সময়ে, যার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংককে প্রতি বছর ব্যয় করতে হয় ৫শ’ কোটি টাকা। রাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক হিসেবে মুদ্রা ছাপার সকল সিদ্ধান্ত নেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। টাকশাল প্রতিষ্ঠার পর বহু বছর এর সক্ষমতা বৃদ্ধির বিষয়টি স্থবির ছিল, সংকটের ঝুঁকিও ছিল। এখন সব প্রযুক্তি সফটওয়্যার ভিত্তিক। 
টাকশালে কোন সমস্যা হলে জার্মানীতে বসে মেরামত সম্ভব। নোট ছাপানোর সক্ষমতাও বেড়েছে চারগুণ। দেশের বরেণ্য চিত্র শিল্পীরা মুদ্রার নক্সা করেন। সরকার পাল্টালে ক্ষমতাসীন  রাজনৈতিক দলের মতবাদ অনুসারে মুদ্রার নকশাও পাল্টায়। জাতির জনক বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর তার ছবি বাদ দেবার মধ্য দিয়ে নক্সা পরিবর্তনে রাজনীতি শুরু হয়। তবে ছবি টাকার নকল  রোধে সহায়ক। মুদ্রা ছাপানো নিয়ে নিরীক্ষা চলে নিয়মিত। দু’দশক আগে প্লাস্টিকের তৈরি ১০ টাকার নোট ছাড়া হয়েছিল, নানা জটিলতায় তা ক’বছরেই বাতিল হয়। সেটাকে ভুল সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখেন এই নোট প্রবর্তনকালীন গর্ভনর। কাগুজে মুদ্রা আবিষ্কারের অনেক আগে তৈরি করা হয়েছিল ধাতব মুদ্রা। তুরস্কের এশিয়া মহাদেশীয় অংশের লিডিয় জাতি সর্বপ্রথম মুদ্রা তৈরি করে। লিডিয়দের মুদ্রা তৈরির প্রায় কাছাকাছি সময়ে প্রাচীন ভারতে মুদ্রা তৈরি এবং প্রচলন হয়। ধারণা করা হয় এখানে মুদ্রার প্রচলন হয় প্রায় আড়াই হাজার বছর আগে। বাংলাদেশের মুদ্রার নাম টাকা, ১৯৭১-এ বাংলাদেশ স্বাধীন হলে এই নামটিই মুদ্রার সরকারি নাম হিসেবে গৃহীত হয়। ১৯৭২ সালের ৪ মার্চ তারিখ থেকে ১ টাকার নোট প্রচলনের মাধ্যমে বাংলাদেশ স্বাধীন এবং সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে নিজস্ব ব্যাংক নোট চালু করে। ১৯৭৪ সালের ৩০ মার্চ পর্যন্ত চালু থাকা এই নোট ছাপা হয় ইন্ডিয়ান সিকিউরিটি প্রিন্টিং প্রেসে। পরে সুইজ্যারল্যান্ড, ইংল্যান্ড, ভারত, কোরিয়া, জার্মানি ও অস্ট্রেলিয়া থেকে বাংলাদেশের নোট ছাপা হয়। ১৯৮৯ সালে গাজীপুরে দেশের প্রথম ও একমাত্র আধুনিক টাকশাল স্থাপিত হয়। 
বাংলাদেশে মুদ্রার ইতিহাস : ভাষাবিদগণের মতানুসারে টাকা শব্দটি সংস্কৃত টঙ্ক শব্দ থেকে উদ্ভূত যার অর্থ রৌপ্যমুদ্রা। এক টাকার শতাংশকে পয়সা নামে অভিহিত করা হয়। দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক যা বাংলাদেশ ব্যাংক নামে পরিচিত টাকার কাগুজে নোট মুদ্রণ এবং মুদ্রা প্রস্তুতকরণ এবং তা বাজারে প্রচলনের জন্য দায়িত্ব প্রাপ্ত। ৭৫০ খ্রিস্টাব্দ থেকে খ্রিস্টীয় দ্বাদশ শতাব্দীর মধ্যভাগ পর্যন্ত বাংলাদেশের উত্তর ও পশ্চিমাঞ্চলের বিশাল অংশে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী পাল রাজাদের রাজত্ব ছিল। তবে সে সময়ের মুদ্রা পাওয়া না যাওয়ায় তাদের টাকশাল সম্পর্কে বিশেষ কিছু জানা যায় না। দ্বাদশ শতক থেকে ত্রয়োদশ শতক পর্যন্ত ব্রাহ্মণ ধর্মাবলম্বী সেনরাজারা বাংলাদেশের পশ্চিম ও উত্তরাঞ্চলে রাজত্ব করে। সেনযুগে পালযুগের মতো মুদ্রার পরিবর্তে কড়ির প্রচলন ছিল। ১৩৩৮ থেকে ১৫৩৮ সাল পর্যন্ত ২০০ বছর মুসলমান সুলতানরা বাংলাদেশে স্বাধীন রাজত্ব কায়েম করার ফলে বাংলাদেশ এবং বাংলা ভাষার পুনরুজ্জীবন ঘটে। কাপড় ও চিনিসহ বাংলাদেশের বহু পণ্য বিদেশে রফতানি হয়। ফলে বাংলাদেশ তখন সম্পদশালী দেশ হিসেবে পরিচিতি পায়। সে সময়ে বাংলাদেশের বাগেরহাট এলাকার খলিফাতাবাদ টাকশাল, রাজশাহীর মাহিসন্তোষের বারবাকাবাদ টাকশাল, সোনারগাঁওয়ের নিকটবর্তী মুয়াজ্জমাবাদ টাকশাল, ফখরুদ্দিন মুবারক শাহরে রাজধানী সোনারগাঁওয়ের টাকশাল, চট্টগ্রাম টাকশালসহ প্রায় ৮০টি টাকশালের অস্তিত্ব পাওয়া যায়। স্বাধীন সুলতানি শাসন সময়ের পর মুঘল আমলেও বাংলাদেশে টাকশালের অস্তিত্ব পাওয়া যায়। মুঘল যুগের জাহাঙ্গীরনগর টাকশালে তৈরি মুদ্রার কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করা যায়। যার পাশাপাশি কাগুজে নোটেরও প্রচলন হয়। তবে তা আধুনিক মানের ছিল না। ৮৬০ খ্রিস্টাব্দে তৈরি নোটটি সবচেয়ে পুরনো হিসেবে ধরা হয়। এই উপমহাদেশে লখনৌতি গঙ্গানদীর পশ্চিম তীরে অবস্থিত বাংলার আদি টাকশাল শহর। ১২০৫ খ্রিস্টাব্দে ইখতিয়ার উদ্দীন মুহাম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজী কর্তৃক মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠার সাথে সাথেই লখনৌ রাজধানী শহর হিসেবে আবির্ভূত হয় এবং প্রথম টাকশাল হওয়ারও গৌরব অর্জন করে। ১৩৩২ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত টাকশাল শহর হিসেবে এটি চালু ছিল।  ফখরুদ্দীন মুবারক শাহের রাজত্বকালে ৭৪০ হিঃ থেকে ৭৫০ হিঃ পর্যন্ত রাজধানী ছিল সোনারগাঁয়ে। তাঁর আমলের সব মুদ্রার সুস্পষ্টভাবে আঁকা হয়েছে, সোনারগাঁও টাকশালের কথা। সেখান থেকে সর্বশেষ মুদ্রা তৈরি হয় ১৪২১ সালে। সোনারগাঁও এক শতাব্দীর বেশি সময় ধরে টাকশাল শহর হিসেবে পরিচিত ছিল। 
উপমহাদেশে সর্বপ্রথম মুদ্রা আইন পাস হয় ১৮৩৫ সালে ও কাগুজে মুদ্রার প্রচলন হয় ১৮৫৭ সালে। কাগজের মুদ্রার প্রচলন করেন লর্ড ক্যানিং। সেই সময় যে অভিন্ন মুদ্রা ছিল তার নাম রুপি। কিন্তু বাংলাদেশের মানুষ মুদ্রাকে টাকা বলতো। ১৯৪৭ সালে ভারত ও পাকিস্তান রাষ্ট্রের সৃষ্টির পর পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মুদ্রার নাম ছিল রুপি। কিন্তু পূর্ব পাকিস্তানে তখনো মুদ্রাকে টাকা বলা হতো। টাকা শব্দটি সংস্কৃত ‘টঙ্কা’ শব্দ থেকে এসেছে। ১৯৮৯ সালে প্রিন্টিং প্রেসটি চালু হয় সর্বপ্রথম ১০ টাকার নোট ছাপার মাধ্যমে। টাকা ছাপানোর জন্য বিশেষ ধরনের কাগজ আমদানি করা হয় সুইজারল্যান্ড থেকে। ৫০০ টাকার নোট ছাপানো হয় জার্মানি থেকে। এছাড়া ২০০০ সালের ১৪ ডিসেম্বর সর্বপ্রথম ১০ টাকা মূল্যমানের পলিমার নোট ছাপা হয়। ১০ টাকার পলিমার নোট তৈরি হয় অস্ট্রেলিয়ায়। ১ ও ৫ টাকা মূল্যমানের যে ধাতব মুদ্রা বাংলাদেশে প্রচলিত তা তৈরি করা হয় কানাডায়। বাংলাদেশে ১ টাকার ধাতব মুদ্রা চালু হয় ৯ মে ১৯৯৩ সালে এবং ৫ টাকার ধাতব মুদ্রা চালু হয় ১ অক্টোবর ১৯৯৫ সালে। বাংলাদেশে নতুন নোট বাজারে চালু করার ক্ষমতা আছে একমাত্র বাংলাদেশ ব্যাংকের। ১ ও ২ টাকার নোটের মালিকানা বাংলাদেশ সরকারের। এগুলোতে স্বাক্ষর থাকে অর্থ সচিবের। ১ ও ২ টাকার নোট ছাড়া বাকি সব বাংলাদেশ ব্যাংকের নোট, এগুলোতে স্বাক্ষর থাকে বাংলাদেশ ব্যাংক গভর্নরের। বাংলাদেশে জাল নোটের ইতিহাস খুবই পুরোনো। ১৯৭২ সালে ১০০ টাকার জাল নোট ব্যাপক হারে বিস্তার করে সদ্য স্বাধীন দেশের অর্থনীতিকে নড়বড়ে করে দেয়। বর্তমানে ঈদ, পূজা, পার্বনকে সামনে রেখে সক্রিয় হয়ে উঠে জালিয়াত চক্র। বড় বড় মার্কেট থেকে শুরু করে ছোটখাটো ব্যবসা প্রতিষ্ঠানেও জাল নোট সুকৌশলে ছড়িয়ে দেয় জাল নোট কারবারিরা। ৫০ টাকার নোট থেকে শুরু করে ১০০, ৫০০ ও ১ হাজার টাকার নোট জাল করা হচ্ছে। ১৯৯৮ সাল থেকে ২০১২ সালের জুন পর্যন্ত সারাদেশে জাল নোট সরবরাহ ও বাজারজাতকরণে জড়িতদের বিরুদ্ধে এ পর্যন্ত বিভিন্ন থানায় ৫ হাজার ৮৪টি মামলা হয়েছে। এরপরও ঠেকানো যাচ্ছে না জাল নোট কারবারিদের। জাতিসংঘের সদস্য দেশ ১৯৩টি, প্রতিটি দেশই আঞ্চলিক মুদ্রা, জাতীয় মুদ্রা ব্যবহার করে। এক দেশ থেকে অন্য দেশে ভ্রমণে পাসপোর্ট, ডাক টিকেট, ধন দৌলত হস্তান্তরে প্রয়োজন হয়। বিশ্বব্যাপী ৩৭ হাজার ৩১৪টি সিকিউরিটি প্রিন্টিং প্রেসে ২০ লক্ষাধিক কর্মকর্তা/কর্মচারীর নিবিড় তত্ত্বাবধানে কারেন্সি পাসপোর্ট প্রিন্টিং হচ্ছে। তাদের বেতন হাজার ডলার থেকে লাখ ডলার পর্যন্ত। অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় বাংলাদেশের কারেন্সী প্রিন্টিং প্রযুক্তিবিদ্যায় কোন ডিপ্লোমা ইনস্টিটিউট না থাকাতে লোভনীয় পদগুলোতে কোন বাংলাদেশীর চাকুরী হচ্ছে না। সিকিউরিটি প্রিন্টিং করপোরেশন বাংলাদেশ লিঃ ৩৮ বছরে স্বাধীনদেশের আশা আকাক্সক্ষা পূরণে চরম ব্যর্থ হয়েছে। এই ব্যর্থতার কারণে স্বাধীনতার চার দশক পরও টাকা পাসপোর্ট, ডাকটিকেট, দলিলের স্টাম্প প্রিন্টিং সম্পূর্ণভাবে বিদেশের উপর নির্ভরশীল। বিদেশে জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র ছাপাতে প্রতিবছর ৩/৪ হাজার কোটি টাকা পাচার হয়। জাতীয় সিকিউরিটি প্রিন্টিং করপোরেশন সম্প্রতি মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক ও বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্র্যাজুয়েটদের মূল সনদপত্র ছাপাতে অপারগতা প্রকাশ করে। নিম্নমানের কাগজ ও প্রিন্টিংয়ের কারণে বিদেশে বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের মূল সনদপত্র অবমূল্যায়ন করা হয়। জাতীয় প্রতিষ্ঠানের এই ব্যর্থতার কারণ অনুসন্ধানে দেখা যায় টাকশালে কর্মরত ৭১৪ জন কর্মকর্তা কর্মচারী কারোরই কারেন্সী ইঞ্জিনিয়ারিং টেকনোলজি/সিকিউরিটি প্রিন্টিং টেকনোলজিতে ন্যূনতম শিক্ষা প্রশিক্ষণ নেই। জাতীয় ও অতীব গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানটিতে কারেন্সী প্রযুক্তিবিদের নিয়োগ নিশ্চিত করে উন্নত বিশ্বের আবিস্কৃত মেশিনারি সংযুক্ত করা হলে দেশের প্রিন্টিং চাহিদা পূরণ হতো। প্রিন্টিং টেকনোলজিতে স্বয়ংসম্পূর্ণতা ও টাকশালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতো বাংলাদেশ।

বাংলাদেশের উর্দু কবি নওশাদ নূরী

১৯৫২ বাংলা ভাষা আন্দোলনের পক্ষে লেখা প্রথম উর্দু কবিতা ‘মহেঞ্জোদারো’





মুহাম্মদ নূরে আলম: ১৯৫২ বাংলা ভাষা আন্দোলনের পক্ষে লেখা প্রথম উর্দু কবিতা ‘মহেঞ্জোদারো’ কবি, বাংলাদেশের ধ্রুপদী ও প্রগতিশীল ঘরানার কবি। কবি নওশাদ নূরী একজন অবাঙালি উর্দুভাষী হওয়া সত্ত্বেও রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবির পক্ষে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে তার স্পষ্ট সমর্থন ও ‘মহেঞ্জাদারো’ নামে এক সুন্দর কবিতা রচনা করেন। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের পক্ষে লেখা প্রথম উর্দু কবিতা নওশাদ নূরীর ‘মহেঞ্জোদারো’। এ কবিতা ছাপা হওয়ার পরপরই পাকিস্তান সরকার তাঁকে দেশ ছাড়ার হুকুম দেন। কবি দেশ ছেড়ে যান। ১৯৬০ সালে তিনি পুনরায় ঢাকা ফিরে আসেন। (বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী) তাজউদ্দিন আহমদের পৃষ্ঠপোষকতায় ১৯৬৯ সালে প্রকাশিত হয় উর্দু সাপ্তাহিক ‘জারিদা’; ১৯৬৯-৭১ সাল পর্যন্ত এই পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন নওশাদ নূরী।
তাঁর কাব্য রচনার ভাষা উর্দু। ষাটের দশক থেকে শূন্য দশক পর্যন্ত বাংলাদেশের কাব্যসাহিত্যের জগতে তাঁর উপস্থিতি ছিল গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর কবিতার অনুপম বুননশৈলী, ভাবপ্রকাশের ধারা চিরায়ত উর্দু কাব্যের আধুনিক উত্তরাধিকার বহন করে। শব্দের গভীর দ্যোতনা, পরিমিত উপমা, ছন্দময় চিত্রকল্প এসব কবিতাকে অনন্য উচ্চতায় স্থান দিয়েছে। একজন উর্দুভাষী কবি হিসেবে বাংলাদেশের প্রকৃতির রূপকল্প, রাজনীতি-সমাজজীবন উপস্থাপনের ক্ষেত্রেও তাঁর মুন্সীয়ানা মনোযোগ আকর্ষণ করে। কিন্তু ভাষাগত ভিন্নতার কারণে তিনি বাঙালি পাঠকদের কাছে ব্যাপকভাবে পরিচিতি ও সমাদর পাননি। উর্দু-ফার্সির পা-িত্য, পরোপকারী হৃদয় ও খোলামেলা স্বভাবের জন্যে তৎকালীন কবি-সাহিত্যিকদের মাঝে তাঁর অসম্ভব গ্রহণযোগ্যতা ছিল। বাঙালি জাতির অহংকার ভাষা আন্দোলন, মায়ের মুখের ভাষায় কথা বলার অধিকার আদায় এবং দখলদার পাকিস্তানি বাহিনীর করালগ্রাস থেকে একটি স্বাধীন ভূমি হিসেবে বাংলাদেশকে মুক্ত করবার আন্দোলনে একজন উর্দুভাষী মানুষ কবি নওশাদ নূরীর ত্যাগ সত্যিই আমাকে বিমোহিত করে। সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে অবিচল একজন মানুষ নওশাদ নূরীকে নিয়ে তার সমসাময়িক, অনুজ এবং বাংলাদেশের খ্যাতিমান কথাসাহিত্যিক, সাংবাদিকের কলম থেকে যে নির্যাস চিত্রায়িত হয়েছে তা বাঙালির ইতিহাসের অংশ হয়েই থাকবে।
বোহেমিয়ান ও জাত কবি নওশাদ নূরী ১৯২৬ সালের ২১ অক্টোবর বিহারের দ্বারভাঙ্গা জেলার বসন্তপুর গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত উর্দুভাষী পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। নওশাদ নূরী কবির ছদ্মনাম। তার আসল নাম মোহাম্মদ মোস্তফা মাসুম হাশমী। তিনি ছিলেন প্রবাদপ্রতীম কবি ও গীতিকার ফয়েজ আহমদ ফয়েজ প্রতিষ্ঠিত প্রগ্রেসিভ রাইটার্স এসোসিয়েশনের বিহার শাখার সেক্রেটারি। ১৯৫১ সাল। নওশাদ নূরী  বিএন কলেজ, পাটনা থেকে স্নাতক সম্পন্ন ও প্রগতিশীল লেখক সমিতিতে  যোগদান করেন। যেখানে উর্দু কবি ও সোহেল আজিমাবাদী, আখতার ওরায়নভি, মুখতার উদ্দিন আরজু ও কালাম হায়দারির মতো লেখকদের তার সংশ্রব ঘটে এবং রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির সাথে পরিচিত হন।
নবীন ভারত তাদের নব্য স্বাধীনতাকে ‘ঐশ্বর্যম-িত’ করার লক্ষ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দান-ভা-ারের দুয়ারে। সে সময় প-িত জওহরলাল নেহেরুকে মার্কিন সাহায্য নেয়া থেকে বিরত থাকার জন্যই লিখলেন কবিতা দে দে রাম ফেলাদে রাম, দেনে ওয়ালা সীতারাম’। কবিতাটি প্রকাশের পরপরই সারাদেশে আলোড়ন তোলে। জওহরলাল নেহেরু কবি নওশাদ নূরীর নামে হুলিয়া জারি করেন। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে। প্রতিবাদী এই কবিতা লেখার দায়ে গ্রেফতারের এড়াতে ১৯৫১ সালে  ঢাকা (সাবেক পূর্ব পাকিস্তান) চলে আসেন । তিনি সামরিক অডিট অ্যান্ড অ্যাকাউন্টস বিভাগের চাকরি  পান। পশ্চিম পাকিস্তানের কোয়েটায় তাঁর পোস্টিং হয়। তারপর আপন করে নিলেন বাংলাদেশটাকে। জাতীয়তাবাদী সংকীর্ণতার ওপরে উঠে অবাঙালি উর্দুভাষী কবি হয়েও ১৯৫২ সালে রাষ্ট্র ভাষা বাংলার সপক্ষে অবস্থান নিলেন। ভাষা আন্দোলনের পক্ষ নিয়ে ‘মহেঞ্জোদারো’ শিরোনামে লিখলেন কবিতা।
পরবর্তীতে ১৯৬৯ সালে উর্দু সাপ্তাহিক জারিদায় বাঙালি জনতার ছয় দফা আন্দোলনেও সমর্থন জানালেন। লিখলেন, ‘তেরি নাজাত মেরি নাজাত, ছে নুকাত ছে নুকাত’ (তোমার মুক্তি আমার মুক্তি, ৬ দফা ৬ দফা)। বস্তুত ১৯৫৪ সালে হক-ভাসানী-সোহরাওয়ারদির নেতৃত্বে গঠিত যুক্তফ্রন্টকে সমর্থন করা, আইয়ুব খানের সামরিক শাসন বিরোধী গণআন্দোলন, সে সময়ের পাকিস্তানি তথ্যমন্ত্রীর রবীন্দ্রনাথ-বিরোধী উক্তির প্রতিবাদ, ইয়াহিয়া তথা পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর নৃশংসতম গণহত্যা ও লোমহর্ষক মর্মান্তিক নারী নিগ্রহের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে মুক্তিযুদ্ধকে সমর্থন করেছেন। ১৯৫২ সালে তিনি "মনেজোদারো " শিরোনামে  আরেকটি কবিতা লিখেন। এ কবিতাটির অনুপম কাব্যশৈলীর মাধ্যমে তিনি কায়েদ-ই-আজম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর (পাকিস্তান এর প্রতিষ্ঠাতা) দ্বারা বাঙালিদের উর্দু চাপিয়ে দেওয়ার প্রতিবাদ জানান। এ কবিতাটির জন্য নওশাদ নূরীকে চাকরি থেকে পদত্যাগ করতে অনুরোধ করা হয়। তিনি চাকরি ছেড়ে ১৯৬০ সালে ঢাকায় ফিরে আসেন।
ঢাকায় ফিরে নওশাদ নূরী একটি বই দোকান খুলেন। পাশাপাশি একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি নেন। ১৯৬৪-৬৭ সাল পর্যন্ত তিনি পাকিস্তান ফিচার সিন্ডিকেট -এর সহকারী সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৬৮ সালে তিনি মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী পৃষ্ঠপোষকতায় প্রকাশিত উর্দু সাপ্তাহিক "রুদাদ"-এর  সম্পাদক হিসেবে যোগদান করেন।
ঢাকায় অনুষ্ঠিত ১৯৮৭ এবং ৮৮ সালে এশীয় কবিতা উৎসবে তিনি লিঁয়াজো অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পারন করেন। তাঁর দক্ষতা ও তৎপরতার ফলে আহমদ ফারাজ, হেমায়েত আলী শায়ের, জমির হাসান জাফরি, কিশওয়ার নাহিদ -এর ও পারভীন শাকির মত পাকিস্তানী কবি এশীয় কবিতা উৎসব অংশগ্রহণ করেন।
বাংলাদেশে আসার কিছু সময়ের মধ্যেই কবি নওশাদ নূরী রাজনৈতিক মতাদর্শে মওলানা ভাসানী, কমরেড আবদুল হকসহ খ্যাতিমান রাজনৈতকি ব্যক্তিত্বের সাথে ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানও তাঁকে ভীষণ পছন্দ করতেন। স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পর কবি নওশাদ নূরীর অনেক আত্মীয়-স্বজন ছেড়ে গেলেও তিনি থেকে গেলেন ঢাকার মায়ায়।
কবি নওশাদ নূরী একজন আপাদমস্তক কবি ছিলেন। শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতির ষান্মাসিক ‘মনন রেখা’র বর্তমান (৪র্থ) সংখ্যাটিতে খ্যাতিমান লেখকদের স্মৃতিচারণ পড়ে আপনাদের তাই মনে হবে। প্রকৃতির কবিরা কখনো কোনো অন্যায়ের কাছে মাথা নত করেন না। আপোস করেন না। কবি নওশাদ নূরীও তাই সময়ের প্রয়োজনে জ্বলে উঠেছেন বারবার। কবি আসাদ চৌধুরী তার মন্তব্যে বলেছে ‘কবিতায় নওশাদের উপমা, উৎপ্রেক্ষা, তাঁর চিত্রকল্প অসাধারণ, তুলনাহীন। কোথাও বাড়াবাড়ি নেই।’
নওশাদ নূরী ছিলেন বাংলাদেশের উর্দু লেখকদের অভিভাবক। ভারত-পাকিস্তানের যে কোনো উর্দু কথাশিল্পী ঢাকায় এলে প্রথমে তাঁর সাথেই যোগাযোগ করতেন। আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের ‘খোয়াবনামা’ উপন্যাসের নামকরণের পরামর্শটাও কবি নওশাদ নূরী দিয়েছিলেন। তিনি একজন আন্তর্জাতিক কবি। তার বিবরণ পাই ড. মোহাম্মদ গোলাম রব্বানীর বর্ণনায়। সময়ে সময়ে কলম ধরতেন জুলুম-নির্যাতনের বিরুদ্ধে। ১৯৬৭ সালে ইসরায়েল আক্রমণ করে বসে ফিলিস্তিন। তখন তিনি আক্রমণের প্রতিবাদে কবিতা লিখে ফিলিস্তিনিদের পক্ষে তার অবস্থান পরিষ্কার করেন। ১৯৮২ সালে ইসরাইল আবার আক্রমণ করে বসে লেবাননের উপর। তখন তিনি প্রতিবাদে ‘রাহগুজার আশনাই’ কবিতা লিখেন। ইরাকের উপর আমেরিকার আক্রমণের প্রতিবাদে লিখেন ‘তুফান সাহারা’। এছাড়াও তিনি আন্তর্জাতিক সাহিত্য সম্মেলনের উদ্যোক্তা এবং সমন্বয়কারী হিসেবেও ভূমিকা রাখেন যা একজন আন্তর্জাতিক চিন্তা ও চেতনার কবির পক্ষেই সম্ভব। যে মানুষটির এমন জীবন-ধারা তাঁর লেখা পাঠ যে সচেতন পাঠকের আরাধ্য হয়ে ওঠে। পাঠকের সেই তৃষ্ণা মেটাতেই লেখক ও গবেষক আইয়ুব হোসেন এবং শামীম জামানভি তাঁদের সুসম্পাদনে সংকলিত করে পরিবেশন করেছেন ‘নওশাদ নূরীর কবিতা’ গ্রন্থটি। এতে রয়েছে কবি নওশাদ নূরীর ৩০টি কবিতা ও ৫টি গজল। অনুবাদ করেছেন প্রখ্যাত লেখক ও কবি আসাদ চৌধুরী, ইনায়াতুল্লাহ সিদ্দিকী, বশীর আল্ হেলাল, মোহাম্মদ হাসান, জাফর আলম, আল মুজাহিদী, মিজারুল কায়েস, সৈকত রুশদী এবং হাইকেল হাশমী।
সমাজ ও রাষ্ট্রের বিবর্তনের পরিক্রমায় কবি নওশাদ নূরীর অবদান ইতিহাসের পাতা থেকে খসে পড়েছে মনে হয়। কারণ অনেকেই বাংলাদেশের স্বাধীনতার যুদ্ধ ও ভাষা-আন্দোলনের ইতিহাসের সাথে একই সূত্রে গাঁথা এই মানুষটি সম্পর্কে জানার সুযোগ পায়নি। আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে কীর্তিমান কবি নওশাদ নূরীকে তুলে ধরা জরুরী হয়ে পরেছে। বাংলাদেশে প্রায় পাঁচ লাখ লোক উর্দু ভাষায় কথা বলেন। এখানে বসবাসরত বিহারি কবি-লেখকেরা উর্দু ভাষায় সাহিত্যচর্চা করেন। অগ্রগণ্য উর্দু কবি নওশাদ নূরী আমৃত্যু ঢাকায় বাস করেছেন। ভাষা আন্দোলন নিয়ে  ‘মহেঞ্জোদারো’ শিরোনামের সেই কবিতায় তিনি লেখেন: ‘বাংলা সাহিত্যের দৌলত আজ বিপন্ন/ হানাদারেরা এগিয়ে আসছে/ পত্র, প্রস্তর, চর্ম, প্যাপিরাস, তাম্র ও কাংসপত্রে সংরক্ষণ করো/ বাংলার মূল্য ও চেতনাকে।/ কারণ সেই অশুভ ঘটনা ঘটতে যাচ্ছে।/ যা এক নগরকে উল্টে-পাল্টে দেয়/ এক মৃতের স্তুপে।’
এখানকার উর্দু-ফারসি সাহিত্যের ইতিহাসে ঢাকার নবাব খাজা পরিবারের অবদান অনস্বীকার্য। উনিশ ও বিশ শতকে এই পরিবারের যাঁরা উর্দুতে সাহিত্য করেছেন, তাঁদের মধ্যে খাজা হায়দার জান, খাজা আসাদউদ্দীন কাওকাব, খাজা আবদুর রহিম সাবা, খাজা আহসানুল্লাহ শাহীন, খাজা নাজিমউদ্দীনের নাম করা যায়। বাঙালি বিস্মৃতি বিলাসী। সে যেমন তার শত্রুর মুখ ভুলে তাকে রাজাসনে বসায় তেমনি বন্ধুকৃত্যও ভুলে যায় অবলীলায়। উর্দু কবি হিসেবে বাংলাদেশে নওশাদ নূরীর ঠাঁই বন্ধুর কাতারে হবে, না কি শত্রু শিবিরে সে বিচারের ভার ইতিহাসের। উল্লেখ্য, মনন রেখ। বর্ষ-২ সংখ্যা : ৪। সম্পাদক মিজানুর রহমান নাসিম। প্রকাশকাল : ডিসেম্বর ২০১৮। প্রচ্ছদ : মামুন হোসাইন, মূল্য ১০০ টাকা, উর্দুভাষী কবি নওশাদ নূরীকে নিয়ে একটি সুন্দর প্রবন্ধ প্রকাশ করে। উর্দুভাষী কবি নওশাদ নূরীর কবিতার বাংলা অনুবাদ সঙ্কলন: নওশাদ নূরীর কবিতা সম্পাদনা: আইয়ুব হোসেন ও শামীম জামানভি, প্রচ্ছদ: ম্যাস্-লাইন প্রিন্টার্স, প্রকাশনা হাক্কানী পাবলিশার্স, দাম: ১২৫ টাকা। 

Thursday, 11 April 2019

জিন্নাহ না নেহরু : কে ভাঙলেন ভারতবর্ষ



  • অধ্যাপক সারওয়ার মো: সাইফুল্লাহ খালেদ
  • ৩০ জানুয়ারি ২০১৯, ১২:২১




  • জওয়াহেরলাল নেহরু, মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ ও মাওলানা আবুল কালাম আজাদ - ছবি : সংগৃহীত
    ‘পুঁজি’ কী? ষাটের দশকের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি বিভাগের প্রবীণতম শিক্ষক ড. এ এন আবু মাহমুদের জবানিতে বলি- ‘কার্ল মার্কস তিন খণ্ডে (দুই হাজার ২৬৬ পৃষ্ঠা) ‘ক্যাপিট্যাল’ গ্রন্থ লিখে সুস্পষ্ট করে বলতে পারেননি ‘পুঁজি’ বলতে আসলে কী বুঝায়। তবে সে জটিলতায় না গিয়ে আমাদের ছাত্রদের সরলীকরণ করে শিখিয়েছি- ক্যাপিটাল ইজ অ্যা মিনস অব প্রোডাকশন উইথ অ্যা ফ্লো অব ইনকাম। ‘ক্যাপিট্যাল’ পড়ে শিখেছি আসলেও ব্যাপারটি তত সরল নয়।
    তেমনি ভারত যে ভাগ হলো তার জন্য দায়ী কে? এর উত্তর খুঁজতে গিয়েও দেখছি, চৌদ্দ-পনের শ’ শব্দের একটি লেখায় এর মীমাংসা করা দুরাশা মাত্র। যদিও চোখ বুজে অনেকেই মুখস্থ বলে ফেলেন- দায়ী হলেন জিন্নাহ। নিচের উদ্ধৃতিগুলো বিবেচনাসাপেক্ষে এ বিষয়ে বিচারের ভার পাঠকের ওপর ছেড়ে দিলাম।

    সম্প্রতি ভারতের জম্মু-কাশ্মির রাজ্যের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী ফারুক আবদুল্লাহ ভারত ভাগের বিষয়টি সামনে এনেছেন। তিনি বলেন, ‘মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ ভারতকে বিভক্ত করতে চাননি। ভারত ভাগের জন্য পণ্ডিত জওয়াহেরলাল নেহরু, মাওলানা আবুল কালাম আজাদ ও সরদার বল্লভভাই প্যাটেলের মতো শীর্ষ রাজনীতিকেরাই দায়ী’ (সূত্র : ফেসবুক, ০৪ মার্চ ২০১৮)। এই চারজনেরই অবস্থানের বিষয়টি মাওলানা আবুল কালাম আজাদ তার ‘ইন্ডিয়া উইনস ফ্রিডম’ (যা ভারতীয় প্রখ্যাত কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায় বাংলায় ‘ভারত স্বাধীন হলো’ শিরোনামে তরজমা করেছেন) গ্রন্থে পরিষ্কার করেছেন।
    কংগ্রেস দলের সভাপতি হিসেবে তিনি লিখেছেন, ‘ভারতের স্বাধীনতা প্রশ্নে ক্যাবিনেট মিশন পরিকল্পনায় বলা হয়েছিল, মাত্র তিনটি বিষয় বাধ্যতামূলকভাবে কেন্দ্রীয় সরকারের অধীন থাকবে। তিনটি বিষয় বলতে প্রতিরক্ষা, পররাষ্ট্রীয় বিষয় এবং যোগাযোগ- যা আমার পরিকল্পনায় বাতলানো হয়েছিল। মিশন অবশ্য পরিকল্পনায় একটি নতুন জিনিস যোগ করে। এতে পুরো দেশকে ‘ক’, ‘খ’, ‘গ’- তিনটি মণ্ডলে ভাগ করা হয় এ কারণে যে, মিশনের সদস্যরা মনে করেছিলেন, তাতে সংখ্যালঘুদের মধ্যে ঢের বেশি ভরসার ভাব আসবে। ‘ক’ অংশের মধ্যে পড়বে মাদ্রাজ, বোম্বাই, যুক্ত প্রদেশ, বিহার, মধ্যপ্রদেশ ও উড়িষ্যা; ‘খ’ অংশের মধ্যে পড়বে পাঞ্জাব, সিন্ধু উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ আর ব্রিটিশ বেলুচিস্তান। ‘গ’ অংশের মধ্যে পড়বে বাংলা আর আসাম। বাকি সবার চেয়ে মুসলমানদের সংখ্যা হবে সামান্য বেশি। ক্যাবিনেট মিশন ভেবেছিল, এ ব্যবস্থায় মুসলিম সংখ্যালঘুরা পুরোপুরি ভরসা লাভ করবে এবং মুসলিম লীগের যেসব ন্যায্য ভয়ভীতি, তা দূর হবে। ক্যাবিনেট মিশন পরিকল্পনার সাথে আমার প্রস্তাবের আত্মিক মিল ছিল এবং তাতে একমাত্র সংযোজন ছিল তিনটি অংশের প্রবর্তন- সে কারণে মনে করেছিলাম, প্রস্তাবটি আমাদের গ্রহণ করা উচিত।
    আজাদের ভাষায়, গোড়ায় জিন্না ওই পরিকল্পনার সম্পূর্ণ বিরুদ্ধে ছিলেন। স্বতন্ত্র স্বাধীন রাষ্ট্রের দাবি নিয়ে মুসলিম লীগ এতদূর এগিয়ে গিয়েছিল যে, সেখান থেকে পিছিয়ে আসা তার পক্ষে কঠিন হয়ে গেল। মিশন থেকে সুস্পষ্টভাবে ও দ্বিধাহীন ভাষায় জানানো হয়েছিল, দেশ বিভাগ এবং একটি স্বতন্ত্র স্বাধীন রাষ্ট্র গঠন কোনোক্রমেই তারা অনুমোদন করবেন না...। ক্যাবিনেট মিশন ভেবেছিল এতে কোনো অন্যায় নেই। প্রকৃত যুক্তরাষ্ট্রে, ক’টি এবং কী ধরনের বিষয় কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে হস্তান্তরিত করা হবে, প্রত্যেকটি অঙ্গরাজ্যের তা ঠিক করার স্বাধীনতা থাকবে (ভারত স্বাধীন হলো, ১৯৯৩, পৃষ্ঠা ১৪৩-১৪৪)।
    এরপর মাওলানা আজাদ লিখছেন, ‘১৯৩৯ থেকে ১৯৪৬ একটানা সাত বছর (কংগ্রেসের) সভাপতি থাকার পর এবার আমার বিদায় নেয়া উচিত। সুতরাং আমি ঠিক করলাম, কাউকে আমার নাম প্রস্তাব করার অনুমতি দেবো না...। সব দিক বিচার-বিবেচনা করে আমার মনে হলো, জওয়াহেরলালের হওয়া উচিত নতুন সভাপতি...। যতটা যা সম্ভব ঠিক বুঝেই তা করেছিলাম। তারপর ঘটনা যেভাবে গড়াল, তাতে আমার যথেষ্ট আক্কেল হয়েছে। বুঝেছি, এটা ছিল বোধহয় আমার রাজনৈতিক জীবনের মারাত্মক ভুল। এ রকম সঙ্কটপূর্ণ সময়ে কংগ্রেসের সভাপতি পদ থেকে সরে আসার সিদ্ধান্ত নিয়ে যা পস্তানো পস্তায়েছি, তা আর বলার নয়। গান্ধীজীর ভাষায়, আমার এই ভুল ছিল হিমালয় প্রমাণ। যখন আমি ঠিক করলাম নিজে দাঁড়াব না, তখন সর্দার প্যাটেলকে সমর্থন না করাটা ছিল আমার দ্বিতীয় ভুল...। এই পরিকল্পনা পয়মাল করার সুযোগ জিন্নাহ পেতে জওয়াহের লাল যে গলদযুক্ত কাজ করেছিল, প্যাটেল তা কখনোই করতেন না...। যখন ভাবি, এ ভুলগুলো যদি আমি না করতাম, তাহলে হয়তো গত ১০ বছরেই ইতিহাস পাল্টে যেত, তখন নিজেকে কখনোই ক্ষমা করতে পারি না’ (ভারত স্বাধীন হলো ১৯৯৩, পৃষ্ঠা ১৪৭-১৪৮)।
    মুসলিম লীগ কাউন্সিল আগেই ক্যাবিনেট মিশন পরিকল্পনা গ্রহণ করেছিল। জাতীয় কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটিও তাই করেছিল। অবশ্য তখনো বাকি ছিল (অল ইন্ডিয়া কংগ্রেস কাউন্সিল) এআইসিসির অনুমোদন (ভারত স্বাধীন হলো ১৯৯৩, পৃষ্ঠা ১৪৯)। সেটাও মাওলানা আজাদ দক্ষতার সাথে করে নেন। এবারই দুর্ভাগ্যজনক ঘটনাটি ঘটল, যে রকম ঘটনা ইতিহাসের মোড় ফিরিয়ে দেয়। ১৯৪৭-এর ১০ জুলাই জওয়াহেরলাল বোম্বাইতে একটি সংবাদ সম্মেলন ডাকেন। তাতে তিনি এক আজব বিবৃতি দিলেন। সংবাদপত্রের কিছু প্রতিনিধি তাকে জিজ্ঞেস করেন, এআইসিসি যখন প্রস্তাব পাস করেছে, তখন কংগ্রেস অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনসমেত পরিকল্পনাটি সর্বাংশে গ্রহণ করেছে কিনা।
    উত্তরে জওয়াহেরলাল নেহরু বলেন, কংগ্রেস বোঝাপড়ার কোনোরকম বাঁধন না মেনে এবং সব সময় অবস্থা বুঝে ব্যবস্থা গ্রহণের স্বাধীন মনোভাব নিয়ে গণপরিষদে প্রবেশ করবে। সংবাদপত্রের প্রতিনিধিরা আরো জিজ্ঞেস করেন, এর মানে এটা কি যে, ক্যাবিনেট কমিশনের রিপোর্ট হেরফের করা যাবে। উত্তরে তিনি জোর দিয়ে বলেন, কংগ্রেস রাজি হয়েছে শুধু গণপরিষদে যোগ দিতে এবং মনে করে, তেমন বুঝলে কংগ্রেস অবাধে ক্যাবিনেট মিশন পরিকল্পনা রদবদল বা ইতরবিশেষ করতে পারে (ভারত স্বাধীন হলো, ১৯৯৩, পৃষ্ঠা ১৫০)...। জানতে পারলাম, গোটা ব্যাপারটার পেছনে নাটের গুরু ছিলেন পুরুষোত্তমদাস ট্যান্ডন। তার চিন্তাভাবনার ওপর আমার তেমন শ্রদ্ধা ছিল না; তবে জওয়াহেরলালকে আমি বোঝানোর চেষ্টা করলাম, যাতে তিনি মত পরিবর্তন করেন...। জওয়াহেরলাল আমার সাথে একমত হলেন না এবং তার নিজের বিচার ঠিক বলে আঁকড়ে রইলেন (ভারত স্বাধীন হলো ১৯৯৩, পৃষ্ঠা ১৫৬-১৫৭)।
    এতে আজাদ হতাশ হয়ে লিখেছেন, ‘ধরে বেঁধে মুসলিম লীগকে দিয়ে ক্যাবিনেট মিশন পরিকল্পনা মানিয়ে নেয়া হয়েছিল...। কাজেই মিশনের সাথে আলোচনায় যে ফলাফল হয় তাতে জিন্নাহ মোটেই খুশি হননি। জওয়াহেরলালের বিবৃতি দেখে তার আক্কেলগুড়ম হলো। তৎক্ষণাৎ তিনি এই মর্মে বিবৃতি দিলেন যে, কংগ্রেস সভাপতির এই ঘোষণার ফলে গোটা অবস্থার পুনর্বিবেচনা দরকার...। তার মতে, জওয়াহের লালের ঘোষণার মানে, কংগ্রেস ক্যাবিনেট কমিশন পরিকল্পনা প্রত্যাখ্যান করছে। ২৭ জুলাই বোম্বাইতে মুসলিম লীগ কাউন্সিলের বৈঠক বসে। জিন্নাহ এর উদ্বোধনী বক্তৃতায় পাকিস্তান দাবির পুনরাবৃত্তি করে বলেন, মুসলিম লীগের পক্ষে এ ছাড়া গত্যন্তর নেই। তিন দিন ধরে আলোচনার পর ক্যাবিনেট মিশন পরিকল্পনা প্রত্যাখ্যান করে কাউন্সিল থেকে প্রস্তাব পাস করা হয়। তাতে এটাও ঠিক হলো, পাকিস্তান অর্জনের জন্য লীগ প্রত্যক্ষ সংগ্রামের পথে যাবে (ভারত স্বাধীন হলো ১৯৯৩, পৃষ্ঠা ১৫০-১৫৮)। এরপর বহু কাঠখড় পুড়িয়েও জিন্নাহ এবং লীগকে আর ফেরানো যায়নি, কারণ জিন্নাহ কংগ্রেসকে আর বিশ্বাস করলেন না।
    জওয়াহেরলাল নেহরু একসময় জিন্নাহ সম্পর্কে মন্তব্য করেছিলেন ‘কিছু পুরাতন নেতা কলকাতা কংগ্রেসের পর কংগ্রেসের সাথে সম্পর্ক ত্যাগ করেন এবং তাদের মধ্যে জিন্নাহ ছিলেন এক জনপ্রিয় ও বিখ্যাত ব্যক্তি। সরোজিনী নাইডু তাকে ‘হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের রাজদূত’ আখ্যা দিয়েছিলেন। অতীতে মুসলিম লীগকে কংগ্রেসের কাছাকাছি আনার কৃতিত্ব ছিল তারই।... পরে ১১ আগস্ট ১৯৪৭ সালে হিন্দু-মুসলমানদের উত্তাল ক্রন্দন-কোলাহলের মধ্যে স্থায়ীভাবে ভারতবর্ষ ত্যাগ করার চতুর্থ দিনে পাকিস্তান গণপরিষদের সদস্যদের সামনে জিন্নাহ... বলেছিলেন, ‘আপনারা স্বাধীন। এই পাকিস্তান রাষ্ট্রে আপনাদের ইচ্ছামতো মন্দির-মসজিদ অথবা অপর যেকোনো উপাসনাস্থলে যাওয়ার অধিকার আপনাদের আছে। আপনাদের ধর্ম, জাতি ও সম্প্রদায় যাই হোক না কেন, তার সাথে এই মূল নীতির কোনো সম্পর্ক নেই যে, আমরা একই রাষ্ট্রের অধিবাসী।
    আমার মতে, এই নীতিকে আমাদের আদর্শরূপে সদা জাগরুক রাখতে হবে। তা হলে আপনারা দেখবেন যে, হিন্দুরা আর হিন্দু এবং মুসলমানেরা আর মুসলমান থাকবে না- ধর্মবিশ্বাসের দিক থেকে নয়, কারণ সেটা হলো প্রত্যেক মানুষের ব্যক্তিগত বিশ্বাসের প্রশ্ন। এটা হলো রাজনৈতিক অর্থে, রাষ্ট্রের নাগরিক হিসাবে।’... জিন্নার বক্তৃতার ওই অংশ আমি অন্তত যেসব বহুল প্রচারিত জাতীয়তাবাদী সংবাদপত্র পড়তাম, তাতে প্রকাশিত হয়নি। আর তা হলেও আমার নজরে পড়েনি। তাই হাসু কেবল রমানীর রচনায় ওই উদ্ধৃতি পড়ে চমকিত হলাম। এ তো কোনো সাম্প্রদায়িকতাবাদীর উক্তি হতে পারে না (শৈলেশকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়, জিন্নাহ-পাকিস্তান/নতুন ভাবনা, ১৯৮৯, পৃষ্ঠা ১-২)।
    যা হোক, কাশ্মিরের প্রবীণ রাজনৈতিক নেতা ফারুক আবদুল্লাহ বলেন, ‘ভারত বিভক্ত না হলে বাংলাদেশ ও পাকিস্তানেরও জন্ম হতো না। (ভারতীয় রাজনীতিকেরা) মুসলিম ও শিখদের সংখ্যালঘু হিসেবে কখনোই মেনে নিতে পারেননি। জিন্নাহ কখনোই দেশ ভাগের পক্ষে ছিলেন না। ভারতকে বিভক্ত করতে একটি কমিশন গঠনের প্রস্তাব উঠেছিল। কমিশন সেই সময় জানায়, তারা সংখ্যালঘু ও শিখদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা নেবে। মুসলিমদের জন্য বিশেষ প্রতিনিধিত্ব রাখবে, কিন্তু দেশ ভাগ করবে না। কিন্তু ভারতীয় রাজনীতিকেরা মুসলমান ও শিখদের জন্য সংখ্যালঘু কমিশন চাননি। জিন্নাহ এতে রাজি হলেও জওয়াহেরলাল নেহরু, মাওলানা আজাদ ও সরদার প্যাটেল দ্বিমত পোষণ করেন। যখন এটি ঘটল না, তখন জিন্নাহ পাকিস্তানের দাবি তুললেন। না হলে কোনো বিভক্তি ঘটত না। তা হলে বাংলাদেশ, পাকিস্তানের জন্ম হতো না। এক ভারত থাকত। তাই জিন্নাহ নয়, নেহরুর কারণেই দেশ ভাগ ঘটেছিল। (সূত্র : ফেসবুক ০৪ মার্চ ২০১৮)।
    দেশ ভাগ ও ভারতে তার জের বিষয়ে আলোচনা করতে গিয়ে ভারতের এককালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী যশোবন্ত সিং লিখেছেন, ‘প্রথমে দু’টি ভাগ এবং পরে পাকিস্তান বাংলাদেশে ভেঙে যাওয়ায়, তিনটি ভাগে উপমহাদেশে বিভাজনের জের চলতে থাকে। অচিরেই বিভাজিত দেশগুলো বিভাজনের আবশ্যকতা নিয়ে পুনর্বিবেচনা শুরু করে দেয়। দেশ ভাগের অন্যতম প্রধান কারিগর, বস্তুত ওই বিভাজনের খসড়া-রচনাকারী নেহরু অচিরেই নিজের ভাবনা ও কাজ নিয়ে প্রশ্ন তুলতে শুরু করেন’ (যশোবন্ত সিং, জিন্নাহ ভারত দেশ ভাগ স্বাধীনতা, ২০১৬, পৃষ্ঠা ৪৩০-৪৩১)।
    জম্মু-কাশ্মিরের স্বাধীনতার প্রশ্ন, ফারুক আবদুল্লাহর মতে, ‘তিন পারমাণবিক ক্ষমতাধর ভারত, চীন ও পাকিস্তান এই (জম্মু-কাশ্মির) উপত্যকার পাশে অবস্থান করায় স্বাধীন কাশ্মিরের আলোচনা নিরর্থক (সূত্র : ফেসবুক ০৪ মার্চ ২০১৮)। যা হোক, বিগত সত্তরোর্ধ্ব বছর ধরে জম্মু-কাশ্মির উপত্যকার স্বাধীনতাকামী জনগণ ভারতীয় বাহিনীর হাতে অমানুষিক নির্যাতন ভোগ করে আসছে। তাদের জন্য স্বাধীনতা অবিলম্বে জরুরি বলেই শান্তিকামী বিশ্ব মনে করে।
    লেখক : অর্থনীতির অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক, বিসিএস সাধারণ শিক্ষা কাডার।

    Friday, 15 March 2019

    এডওয়ার্ড ডব্লিউ সাইদ ও তাঁর ওরিয়েন্টালিজমের সহজপাঠ

    মুহাম্মদ নূরে আলম: 
    উপনিবেশের শোষণ আর পশ্চিমা জ্ঞানতাত্ত্বিক আগ্রাসন এ দুয়ের মাঝখানে দাঁড়িয়ে প্রাচ্যের মানুষের মনের অনেক না বলা কথার প্রকাশ পেয়েছে এডওয়ার্ড সাইদের চিন্তায়। পশ্চিমের সা¤্রাজ্যবাদী ও উপনিবেশবাদী তৎপরতা, তাদের আধিপত্য আর দমন নীতির সংস্কৃতি বিশ্লেষণ করে রচিত ওরিয়েন্টালিজম সাইদকে কালজয়ী লেখকের আসনে প্রতিষ্ঠিত করেছে। একজন ইংরেজি সাহিত্যের অধ্যাপক হয়েও তিনি ইতিহাস রচনার ক্ষেত্রে পশ্চিমের আধিপত্য বেশ দক্ষতার সাথে শনাক্ত করেছেন। সাঈদ যুক্তিসংগতভাবে পুঁজিবাদের এমন কিছু কলাকৌশল চিহ্নিত করেছেন, যা তৃতীয় বিশ্বের প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলোতে শিক্ষা ও বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিষ্ঠানের আদলে ছড়িয়ে দেওয়া স্বাভাবিক একটি ব্যাপারে পরিণত হয়েছে। সা¤্রাজ্যবাদী উপনিবেশ ফিরিয়ে আনার এটি একটি অসঙ্গত প্রচেষ্টা এবং এক্ষেত্রে ইসলাম শক্তিশালী প্রতিপক্ষ তাতে সন্দেহ নেই। আর এ জন্যই ইসলামকে মুক্তচিন্তা ও সভ্যতার ¯্রােতবিমুখী বলে প্রচারণা চালানো হয়। সৃষ্টি করা হয় ধু¤্রজাল। ঘোলা জলে মাছ শিকারের আদিম কৌশলও বলা যায় একে।
    প্রাচ্যের অতীত পশ্চিমের নিজের মতো করে নির্মাণের মাধ্যমে পাশ্চাত্যকে হেয় করার অপচেষ্টা রুখে দিতেও চেষ্টা করেছেন সাইদ। পশ্চিমের বুদ্ধিবৃত্তিক আগ্রাসন আর সাংস্কৃতিক নির্মাণের পাশাপাশি জাতিসত্তার পরিচয় নির্মাণের মতো গোলক ধাঁধা থেকে প্রাচ্যকে বেরিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি। ইতিহাস রচনা ও গবেষণার ক্ষেত্রে বিশেষ করে একুশ শতকে এসে ইতিহাস চর্চা করতে গেলে প্রায় সকল শ্রেণির গবেষককে নির্ভর করতে হয় বিভিন্ন পশ্চিমা সূত্রের উপর। এক্ষেত্রে সাইদের চিন্তাধারা সম্পর্কে জানা থাকলে বিভ্রান্ত হওয়ার সুযোগ কম থাকে। প্রখ্যাত গবেষক এডওয়ার্ড সাইদের জন্ম ১৯৩৫ সালের ১ নভেম্বর জেরুজালেমে। তাঁর বাবা ও মা উভয়েই ছিলেন প্রোটেস্ট্যান্ট খৃস্টান ধর্মের মতাবলম্বী। শ্বেতবর্ণের এই লোকটি পেশায় ছিলেন একজন শিক্ষক, দার্শনিক, ফিলিস্তিনের স্বাধীনতা আন্দোলনের নেতা। সাইদ কায়রো আর জেরুজালেমে বার বার স্থানান্তরের কারণে ১২ বছর বয়স পর্যন্ত কোথাও স্থায়ী হতে পারেননি সাইদ। এরপর তিনি ১৯৪৭ সালে জেরুজালেমের সেন্ট জর্জেস একাডেমীতে ভর্তি হন। এরপর আরব ইসরাঈল যুদ্ধ শুরু হলে সাইদের পরিবার আবার জেরুজালেম থেকে কায়রো চলে যান।
    তাঁর নামের প্রারম্ভে এডওয়ার্ড আর শেষে আরবি সাইদ নাম থাকার কারণে শিক্ষাগত ক্ষেত্রে তিনি বিভিন্ন জটিলতার সম্মুখীন হয়েছিলেন। কায়রোতে গিয়ে তিনি আলেকজান্দ্রিয়ার ভিক্টোরিয়া কলেজে ভর্তি হন। এই ভিক্টোরিয়া কলেজে থাকাকালীন সময়েই ভবিষ্যত দুরদর্শী সাইদের পরিচয় মেলে। ১৯৫১ সালে তিনি কলেজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির দায়ে বহিষ্কৃত হন। এরপর তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচ্যুসেটস অঙ্গরাজ্যের নর্থফিল্ড মাউন্ট হারমন স্কুলে ভর্তি হন। এখানে শিক্ষালাভের সময় ধীরে ধীরে সাইদের চিন্তাধারার বহিঃপ্রকাশ ঘটে। তিনি ক্লাসেও অনেক ভাল ফলাফল অর্জন করতে সক্ষম হন।
    ১৯৬৩ সালে কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে একজন ইংরেজির প্রভাষক হিসেবে যোগদানের মধ্য দিয়ে সাইদের কর্মজীবন শুরু হয়। ২০০৩ সালে মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত তিনি এখানে কর্মরত ছিলেন। ১৯৭৪ সালে তিনি হার্ভাডে তুলনামূলক ভাষাতত্ত্বের খ-কালীন অধ্যাপক হিসেবে কাজ করেন। এর পাশাপাশি ১৯৭৫-৭৬ সালে স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন রিসার্চ ফেলো হিসেবে কাজ করেন। ১৯৭৭ সালে সাইদ কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপক পদে উন্নীত হন। এরপর তিনি জন হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়, ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়সহ বেশ কয়েকটি স্থানে খ-কালীন অধ্যাপনা করেন। ১৯৯৩ সালে রেইথ বক্তৃতামালায় অংশ নেয়ার সময় তাঁর দার্শনিক চেতনার প্রতিফলন ঘটে। ১৯৭৮ সালে প্রকাশিত বই ওরিয়েন্টালিজম সাইদকে একজন জগৎবিখ্যাত তাত্ত্বিকের স্থানে আসীন করে। এর পাশাপাশি সাইদের কয়েকটি রচনা প্রাচ্য ও সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের ইতিহাস রচনার ক্ষেত্রে বিশেষ প্রভাব রাখতে সক্ষম হয়।
    অন্যদিকে রচিত ইতিহাসের উপনিবেশিক প্রভাব ও বস্তুনিষ্ঠতা শনাক্তকরণের ক্ষেত্রে এডওয়ার্ড সাইদের বিশেষ ভূমিকা রয়েছে। ফিলিস্তিনী মুক্তি আন্দোলনের সাথে প্রত্যক্ষভাবে সংশ্লিষ্ট ছিলেন সাইদ। ১৯৭৭ সালের দিকে নিজ যোগ্যতায় ফিলিস্তিনী পার্লামেন্টের প্রবাসী সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৯১ সালে ইসরাঈল-ফিলিস্তিন চুক্তির শর্ত পছন্দ না হওয়াতে ১৪ বছরের এই দায়িত্বে ইস্তফা দেন। কর্মময় জীবনে অবসর খুব কমই পেয়েছে সাইদের। জীবনের শেষভাগে এসে মৃত্যুকে অনেক কাছ থেকে দেখতে পেয়েছেন ব্লাড ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে। তারপর ২০০৩ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের একটি হাসপাতালে মারা যান নির্যাতিত মানুষকে মুক্তির পথ দেখানো এই মহান দার্শনিক।
    পশ্চিমাদের শোষণ নিপীড়নের বিরুদ্ধে প্রাচ্য কখনই মাথা তুলে দাঁড়াতে পারেনি। কিন্তু ১৯৮০ সালে প্রকাশিত সাইদের ‘দা কোয়েশ্চেন অব প্যালেস্টাইন’ মধ্যপ্রাচ্যের তীব্র রক্তক্ষয়ী আন্দোলনের প্রতি আলোকপাত করে ফিলিস্তিনিদের মাতৃভূমির দাবিকে ন্যায্য বলে প্রমাণ করেন। ‘আফটার দা লাস্ট স্কাই’-এর মধ্যে তিনি এই চিন্তাধারাকে আরো বিস্তৃত করার চেষ্টা করেছেন। তিনি দেখেছেন কিভাবে একজন ফিলিস্তিনি হিসেবে জন্ম নিয়ে আজন্ম পাপের দায়ভার বহন করতে হয়। পশ্চিমের উপস্থাপনায় একজন ফিলিস্তিনির রূপ কখনও সর্বহারা শরণার্থী, কখনও খুনী-সন্ত্রাসী কিংবা একজন অপহরণকারী। সাইদ দেখিয়েছেন মাতৃভূমির ন্যায্য দাবি আদায় করতে গিয়ে ফিলিস্তিনীরা কিভাবে পশ্চিমা মিডিয়া আর উপস্থাপনার রাজনীতির শিকার হয়ে একটি নেতিবাচক রাজনৈতিক ইমেজে বন্দী হয়ে আছে। যার ধারাবাহিকতা লক্ষ্য করা গেছে ‘দা পলিটিক্স অব ডিসপজিশন’ এবং ‘কাভারিং ইসলামে’ও।
    তবে সাইদ ঐপনিবেশিক অঞ্চলগুলোতে বিদ্যমান জ্ঞানতাত্ত্বিক আগ্রাসনকে অনেক সুচারুরূপে তুলে ধরেছেন ‘রিপ্রেজেন্টেশন অব দি ইন্টেলেকচ্যুয়াল’ বইটিতে। এখানে বুদ্ধিবৃত্তিক সন্ত্রাস কিভাবে পুরো বিশ্বকে ত্রাস সৃষ্টির সাথে গ্রাস করে নিচ্ছে তা প্রতিফলিত হয়েছে। বিপ্লবী এই লেখকের মৃত্যুর পর প্রকাশিত ফ্রম অসলো টু ইরাক অ্যান্ড দি রোড ম্যাপ বইটিতেও পশ্চিমা আগ্রাসনের চুলচেরা বিশ্লেষণ লক্ষ্য করা গেছে। এই বিষয়গুলোর বিশ্লেষণ সাপেক্ষে সাইদ উত্তর-ঔপনিবেশিক কাউন্টার ডিসকোর্সকে বেশ জোরালোভাবে উপস্থাপন করতে সক্ষম হন। ইতিহাস-প্রতœতত্ত্ব-সমাজবিজ্ঞানের মতো বিষয়ের সাথে আলোকময়তার দর্শন তথা ঔপনিবেশিকতার সম্পর্ক অনেক গভীর। এই দিক থেকে বিচার করা হলে ইতিহাসতত্ত্বে সাইদের উত্তর-ঔপনিবেশিক কাউন্টার ডিসকোর্স আলোচিত হওয়ার দাবি রাখে। বিশেষ করে প্রচার মাধ্যম প্রচারের আলোয় আনতে সক্ষম হলে মিথ্যা কিভাবে সত্যে পরিণত হয়, আর সত্য কিভাবে অন্ধকারে হারিয়ে যায় তা প্রথম স্পষ্ট হয়েছে সাইদের বিশ্লেষণে। এই বিষয়গুলো ইতিহাস রচনার ক্ষেত্রে আলোচিত হওয়া জরুরী।
    ওরিয়েন্টালিজম রচনার পরপর সাইদের সৃষ্টিশীলতাকে গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করার সুযোগ হয় বিশ্বের অন্যান্য তাত্ত্বিকের। বিশেষ করে পশ্চিমা আধিপত্যে নাস্তানাবুদ বুদ্ধিবৃত্তিক পরিম-লে সাইদ পাঠককে একটি নতুন স্বাদ আস্বাদনের সুযোগ করে দিয়েছেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তরকালে সাইদের আবির্ভাব পশ্চিমা শিক্ষা-সাংস্কৃতিক পরিম-লের আধিপত্যবাদী ধারাকে অনেকটাই নাড়িয়ে দিতে সক্ষম হয়েছিল। মিশেল ফুকোর দর্শনে জ্ঞান ও ক্ষমতার যে দ্বান্দ্বিক অবস্থানের কথা উল্লেখ ছিল তাকে অনেকটাই বাস্তবে ফুটিয়ে তুলে পাঠকের দৃষ্টিগোচর করাতে সক্ষম হয়েছিলেন সাইদ। সাইদের গবেষণা দীর্ঘদিন উপনিবেশের আগ্রাসনে জীর্ণপ্রায় অঞ্চলগুলোর মানুষের অবমুক্তির তীব্র বাসনা, সংস্কৃতি বিকাশের রুদ্ধ সম্ভাবনা ও পশ্চিমা নির্মাণে ফুটে ওঠা অলীক জ্ঞানপ্রকল্পে সেগুলোর ভিন্ন উপস্থাপনার মুখোশ মানুষের সামনে খুলে দিতে সক্ষম হয়।
    কর্মজীবনে সাইদ একজন ইংরেজি সাহিত্যের অধ্যাপক হয়েও বেশ দক্ষতার সাথে পশ্চিমা আধিপত্যবাদী নীতি ও সংশ্লিষ্ট প্রকল্পগুলোর স্বরূপ বিশ্লেষণ করেছেন। পশ্চিমা জ্ঞানপ্রকল্পে একটি নির্দিষ্ট দার্শনিক অবস্থান বার বার কানাগলিতে ঘুরে ফিরে গুমরে মরতে বসলে তখন অনেকটাই আলোর পথ দেখান সাইদ। একটি বিষয় ঘিরে প্রশ্ন, অনিশ্চয়তা আর অবিশ্বাসের আঙ্গিনা ছেড়ে বেরিয়ে এসে সাইদ কিছুটা ভিন্ন পথে যাত্রা করার চেষ্টা করেছিলেন। ফলে তথাকথিত অনুন্নত বিশ্বের মানুষের মনোজাগতিক ক্ষেত্রে সাইদের আবেদন হয়ে ওঠে এক অন্যরকম প্রতিবিম্ব হিসেবে। তিনি একই সাথে পশ্চিমা শিল্প-সাংস্কৃতিক-জ্ঞানতাত্ত্বিক আধিপত্যবাদের কথা তুলে ধরে তা থেকে মুক্তির বার্তা নিয়ে এসেছিলেন। প্রাচ্যতাত্ত্বিকদের ইতিহাস উপনিবেশ সম্প্রসারণ নীতি অনুসরণ করে রচিত হওয়াও সেই ইতিহাস সাইদের রোষানল থেকে মুক্তি পায়নি।
    সাইদের দর্শন বোঝার পর সহজেই মানুষের কাছে স্পষ্ট হয় সেই মিশনারী প্রকল্পের উদ্দেশ্য, রাজনৈতিক সংগঠনের ধারণা কিংবা গ্যালিভার ট্রাভেলস এর মতো বিদঘুঁটে কল্পকাহিনীর মূল শেকড়টা কোথায়। তত্ত্বকাঠামো জটিল বিন্যাসের সাথে কোথায় প্রাচ্যতত্ত্বের মূল সুর নিহিত আছে তা বোঝার চেষ্টা করেছেন সাইদ। এই ধরণের বিশ্লেষণ উত্তর-আধুনিক চিন্তা কাঠামোতে সাইদকে বিশেষ একটি স্থান করে দিতে সক্ষম হয়েছে। উপনিবেশিক শোষণ থেকে মুক্তির পর জ্ঞানতাত্ত্বিক প্রেক্ষাপটে তাদের আজন্ম আধিপত্যের বেড়াজাল ছিন্ন করে নতুন করে আগামীর চিন্তা করার সুযোগ ঘটে সাইদের চিন্তাধারার আলোকে।
    প্রাচ্যতাত্ত্বিকরা উপনিবেশের প্রয়োজনে জাতি তত্ত্ব ও জাতি-ইতিহাস রচনার ক্ষেত্রে যে বিশেষ ধারার প্রবর্তন করেছেন তা থেকে বেরিয়ে জাতীয়তা ও আত্মপরিচয় অন্বেষণের যাত্রা মূলত সাইদের দর্শন থেকেই শুরু হয়েছিল। ওরিয়েন্টালিজম সাইদকে বিশ্বব্যাপী বিখ্যাত করতে সক্ষম হয়েছিল। সত্য উচ্চারণে নির্ভীক সাঈদ ছিলেন পশ্চিমা সা¤্রাজ্যবাদ ও আগ্রাসনের বিরুদ্ধে উচ্চকণ্ঠ। তার সবচেয়ে বিখ্যাত কর্ম হচ্ছে, ওরিয়েন্টালিজম। চিন্তার জগতে বিপ্লব সৃষ্টিকারী এই গ্রন্থটি রচিত হয় ১৯৭৮ সালে। প্রাচ্য নিয়ে পাশ্চাত্যের সুদূরপ্রসারী ও সুগভীর কলাকৌশলগুলো তিনি চিত্রিত করেছেন এই বইয়ের পৃষ্ঠাজুড়ে। ওরিয়েন্টালিজম সারা দুনিয়ার বুদ্ধিজীবী মহলে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে। ওরিয়েন্টালিজমের মাধ্যমে সাঈদ প্রাচ্যতন্ত্রের স্বরূপ উদঘাটন করে এ বিষয়ে মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। ১৯৭৮ সালে প্রথমবারের মতো প্রকাশিত হওয়ার পর প্রায় ৩০টির মতো ভাষায় এর অনুবাদ করা হয়। বিশেষ করে উপনিবেশিত অঞ্চলের নিষ্পেষিত মানুষের কাছে ওরিয়েন্টালিজম ছিল অনেকটাই মুক্তির পথ প্রদর্শক। ইতিহাস রচনা প্রসঙ্গে সাইদ বর্ণনা করেছেন‘ ইতিহাস, প্রতœতত্ত্ব বা নৃবিজ্ঞানের মতো বিষয়গুলো সবই উপনিবেশের নির্মাণ। তাঁর গভীর অনুসন্ধান পাশ্চাত্যে ইসলাম ও মুসলমানদের সম্পর্কে পূর্ব থেকে চলে আসা অনৈতিক অথচ জোরালো প্রচারণার অবগুণ্ঠন উন্মোচন করেছে। মার্কিন বিশেষায়িত মিডিয়ার সংকীর্ণ অভিব্যক্তির বাদানুবাদ করে সাঈদ শক্তিশালীভাবে ইসলামের অবস্থান তুলে ধরেছেন। সাঈদ দেখিয়েছেন, পশ্চিমের তাঁবেদার গোষ্ঠী যাদের মাঝে আবার অনেক মুসলিমও রয়েছেন, মূলত তারা ওরিয়েন্টালিস্ট [প্রাচ্যবিদ] বলেই খ্যাত, এরা ভিন্নধারার ইসলামি দৈত্যের উপকথা হাজির করেন।
    পশ্চিম ইতিহাসকে তার প্রয়োজনে, তার মতো করে, তাদের প্রতিপালিত ইতিহাসবিদদের মাধ্যমে নির্মাণ করেছে। সাইদের দৃষ্টিতে এই ইতিহাস উপনিবেশিত অঞ্চলের নিষ্পেষিত মানুষের কণ্ঠরোধকল্পে নির্মিত একটি প্যারাডাইম। সাইদ একে আর্থ-রাজনৈতিক, সামাজিক, নৃ-তাত্ত্বিক ও জাতিগত পরিসর থেকে একটি অঞ্চলের উপর পশ্চিমের কর্তৃত্বের বৈধতা দিয়ে থাকে। এই আধিপত্যবাদী নীতির পেছনে বিদ্যমান সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক চিন্তাধারার কঠোর সমালোচনা করেছেন সাইদ।
    সাইদ বস্তুত ইতিহাসবিদ ছিলেন না। তিনি ইতিহাস রচনার ক্ষেত্রে পশ্চিমা ইতিহাসবিদদের কঠোর সমালোচনা করে তাদের একরৈখিক ইতিহাস নির্মাণের প্রবণতা সুস্পষ্ট করেছেন। এই বিশ্লেষণ ঔপনিবেশিক অঞ্চলের ইতিহাস দর্শনে যুক্ত হওয়ার ফলে ঐ অঞ্চলসমূহের সুযোগ হয়েছে তাদের ইতিহাস বাস্তবতার নিরিখে পর্যবেক্ষণ করা। আর অতীত গবেষণার ক্ষেত্রে পাশ্চাত্যের প্রভাববলয় থেকে বের হয়ে তথ্যসূত্র নির্ভর গবেষণা করে নিজ জাতিসত্ত্বার পরিচয় নির্মাণের কাজ করা। সাইদ বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন প্রাচ্য পশ্চিমের কাছে অজানা। এই পরিসর থেকে পশ্চিম প্রাচ্য সম্পর্কে একটি রোমান্টিকতায় ভুগে কিছু অলীক কল্পনার জাল বিস্তার করতে পারে। প্রাচ্যের বাস্তবতা তাদের কাছে অজ্ঞাত হওয়াতে প্রাচ্য নিয়ে গবেষণা করে এ সম্পর্কে গ্রহণযোগ্য ও বস্তুনিষ্ঠ কোনো ধারণা প্রতিষ্ঠা করা পশ্চিমের পক্ষে সম্ভব নয়। প্রাচ্য নিয়ে পশ্চিমের অধ্যয়ন ও গবেষণা কেবলমাত্র কিছু পূর্ব নির্ধারিত চিন্তাধারার সারবত্তায়ন ও আরোপকরণ মাত্র।
    পশ্চিম তাদের গবেষণা বা আলোচনার শুরুতেই পশ্চিমকে মানদ- বিবেচনা করে থাকে। আর প্রাচ্যকে তারা বোঝায় ভিন্ন স্থান হিসেবে যেখানে ভালো কিছু হওয়া সম্ভব নয়, একমাত্র সম্পদ ও ঐশ্বর্য ছাড়া যেগুলো দখল করতে চায় পশ্চিম। ইতিহাস রচনার ক্ষেত্রে দেখা গেছে পাশ্চাত্যের মানুষেরা ঔপনিবেশিক শাসনে বন্দি প্রাচ্যে এসে তাদের পূর্ব অনুমিত জ্ঞান প্রকল্পের সংশোধন না করে তা প্রাচ্যের উপর জোরপূর্বক আরোপ করার চেষ্টায় সদা সচেষ্ট থেকেছে। পশ্চিম প্রাচ্যতত্ত্বের নামে বিশেষ ডিসকোর্স বা আখ্যান তৈরি করেছে তার আলোকে ‘পশ্চিমের মানুষ প্রাচ্যের উপর আধিপত্য করবে আর প্রাচ্য আধিপত্যের শিকার হবে। এসব ঐতিহাসিক বাস্তবতা দ্বারা প্রমাণিত। তাই পশ্চিমা আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে কোনো প্রতিবাদ করার সুযোগ প্রাচ্যের নেই।
    ব্রিটিশ বা ফরাসি প্রচারমাধ্যম থেকে মার্কিন প্রচারমাধ্যম একটু ভিন্নধর্মী। পশ্চিমাসমাজ, ভোক্তাগোষ্ঠী, সংগঠন ও তাদের স্বার্থও ভিন্নধরনের। প্রত্যেক মার্কিন সাংবাদিকের মাথায় একটা কথা সবসময় উপস্থিত থাকে, তার দেশ পৃথিবীর একমাত্র পরাশক্তি, যার নির্দিষ্ট স্বার্থ রয়েছে এবং সেই স্বার্থ হাসিলের দায়িত্ব তার আছে; অন্য দেশের লোক ও সাংবাদিকের মাথায় এসব চিন্তা থাকে না। প্রত্যেক মার্কিন সাংবাদিক বিশ্ব সম্পর্কে প্রতিবেদন তৈরি করার সময় এ ব্যাপারে সচেতন থাকেন, তার চাকরিদাতা কর্পোরেশনটিও মার্কিন ক্ষমতার অংশীদার। সাঈদ নিউইয়র্ক পোস্ট, নিউ রিপাবলিক, নিউইয়র্ক টাইমস, কমেন্টারি, দি আটলান্টিক, টাইম ম্যাগাজিন ইত্যাদি নামিদামি পত্রিকা ঘেঁটে জন ফিকনার, মার্শাল হাডসন, ফ্রিৎস স্টার্ন, রবার্ট থুকার, দানিয়েল প্যাট্রিক, এন্থনি হার্ট, ওয়ালজারের মতো বিখ্যাত সাংবাদিক, কলামিস্টের সংবাদ পর্যালোচনা করে দেখিয়েছেন, সা¤্রাজ্যবাদের এ সব লিখিয়ে প্রাচ্যকে কী বীভৎসরূপে উপস্থাপন করেছেন পশ্চিমাদের কাছে!
    দৃষ্টান্তস্বরূপ বলা যায়, যেসব গ্রন্থকার [প্রাচ্যবিদগণ] যেমন ধরুন বার্নাড লিউস, যিনি অত্যন্ত প্রভাবশালী ও ক্ষমতাসম্পন্ন পাবলিশারদের একজন, তিনি আবার Atlantic Monthly[আটলান্টিক মানথলি]-র প্রকাশকও, তিনি ইসলামকে উপস্থাপন করেন, Irrational [পশ্চাদপদ] ও পশ্চিমাবিরোধী  [Anti-Western] হিসেবে। জ্ঞান ও সাহিত্যের সব কলাকৌশল প্রয়োগ করেই এমনটি করা হয়। এ সব পাবলিকেশন্স এতো বিস্তৃত ও শক্তিশালীভাবে কৌশলপ্রণয়ন করে এবং এমন প্রচারকৌশলের আশ্রয় গ্রহণ করে তা করা হয়, যা মানুষের মনের ওপর প্রবল প্রভাব সৃষ্টি করে এবং তাদের প্রবণতাকে নির্দিষ্ট বৃত্তে চালিত করে। এটি পশ্চিমের সরকার ও মিডিয়ার এক বিস্ময়কর গ্রন্থি, জনমতকে রাজনৈতিক স্বার্থে চালিত করতে যা নিষ্ঠার সাথে কাজ করে চলেছে। সাঈদ দেখাচ্ছেন, পশ্চিমের কর্পোরেশনগুলো বিশেষভাবে এমন কতগুলো দুর্র্ধর্ষ হাইপ্রোফাইলার সাংবাদিককে প্রশিক্ষিত করেছে, যারা মধ্যপ্রাচ্য বা এশিয়ার বিভিন্ন দেশে থেকে তাদের স্বার্থ হাসিল করবে।
    এই দিক থেকে প্রতিষ্ঠিত প্রাচ্যতাত্ত্বিক জ্ঞানপ্রকল্পে প্রাচ্যের মানুষকে নিজেদের শাসন করার ক্ষেত্রে অযোগ্য ও অক্ষম বলে প্রমাণ করা হয়েছে। তাই তাদেরকে তাদের অতীত জানতে গেলে পশ্চিমের মাধ্যমে পশ্চিমের মতো করে জানতে হবে। তাদের নিজের প্রতিবিম্ব দেখতে হলে আশ্রয় নিতে হবে কোনো এক পশ্চিমা আয়নায়’। এই ধরনের চিন্তাধারা ঔপনিবেশিক দেশসমূহে পশ্চিমের প্রভাবমুক্ত ইতিহাস চর্চার দ্বার অনেকটাই রুদ্ধ করে দিয়েছিল।
    প্রতিবাদী লেখার ভাষায় সাইদের অনুসৃত নীতি উত্তর-ঔপনিবেশিক কাউন্টার- ডিসকোর্সকে একটি শক্ত ভিত্তির উপর দাঁড় করাতে সক্ষম হয়েছে। কালের আবর্তে নির্যাতিত নিপীড়িত মানুষের পক্ষে এই কাউন্টার-ডিসকোর্স একটি জনপ্রিয় চিন্তামাধ্যমে পরিণত হয়। অন্যদিকে, আগ্রাসনের বিরুদ্ধে অনেকটা ধর্মনিরপেক্ষ মনোভাব পোষণকারী সাইদ সা¤্রাজ্যিক ও অগণতান্ত্রিক আরব শাসকদের কাছেও গ্রহণযোগ্যতা পাননি। সাইদের চিন্তাধারায় প্রতিফলিত কাউন্টার ডিসকোর্সকে নিচের কয়েকটি ধারার মাধ্যমে শনাক্ত করা যেতে পারে। ১. প্রতিবাদী লেখনী ও বাস্তবজীবনে তার অনুশীলন ২.পশ্চিমা ক্ষমতাচক্র আর জ্ঞানতাত্ত্বিক আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ৩.পাশ্চাত্য মিডিয়ার প্রচার-প্রপাগ-ার বিরুদ্ধে যুক্তি উপস্থাপন ৪. ঔপনিবেশিকতা ও পরাধীনতার শিকলে আবদ্ধ মানুষকে মুক্তির চেতনায় উদ্দীপ্ত করা ৫. লেখনীর মাধ্যমে পশ্চিমা জ্ঞানতাত্ত্বিক আগ্রাসন, ক্ষমতা, সাংস্কৃতিক আধিপত্যবাদ ও সা¤্রাজ্যবাদের মধ্যকার অন্তর্নিহিত সম্পর্ককে বিশ্লেষণ করা। ৬. জ্ঞানতাত্ত্বিক পরিম-লে একটি নতুন চিন্তাকাঠামোর সংযুক্তি। ৭. ধর্ম নিরপেক্ষতাবাদ, গণতন্ত্র এবং কসমোপলিটন-এর পক্ষে আমৃত্যু কাজ করে যাওয়া। ৮. জ্ঞানতাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক পরিম-লে নির্যাতিত মানুষকে মুক্তির আহবানে জাগিয়ে তোলা। ‘‘দি ক্ল্যাস অব সিভিলাইজেসনস্ এ্যান্ড দ্যা রিমেকিং অব ওয়ার্ল্ড অর্ডার’’ (স্যামুয়েল পি হানটিংটন, ১৯৯৬), ‘‘দ্যা এন্ড অব হিস্ট্রি এ্যান্ড দি লাস্টম্যান” ( ফ্রান্সিস ফুকুইয়ামা, ১৯৯২) বা এই শ্রেণীর উদ্দেশ্যমূলক গ্রন্থে সভ্যতা, সমাজ ও সংস্কৃতি বিশ্লেষণে সচেতন মানসিকতার গভীরে লেখকদের যে অবচেতন মানসিকতা কাজ করে, তা অনুধাবনের জন্য এডওয়ার্ড সাঈদের চিন্তাধারার পুনঃপাঠের প্রয়োজনীয়তা একবিংশ শতাব্দীতে বিশেষভাবে দেখা দিয়েছে। হানটিংটন তাঁর গ্রন্থের প্রতিপাদ্য সম্পর্কে বলেন: ‘‘It is my hypothesis that the fundamental source of conflict in this nwe world will not be primarily ideological or primarily economic. The great divisions among mankind and the dominating source of conflict will be cultural” (দি ক্ল্যাস অব সিভিলাইজেসনস্, প্রবন্ধ, ভল.৭২, নং ৩, ফরেন এ্যাফেয়ার্স পত্রিকা, ১৯৯৩। এই প্রবন্ধটির বক্তব্যই হানটিংটন ১৯৯৬ সালে বই আকারে প্রকাশিত করেন) আর সভ্যতার বর্তমান পর্যায়কে ফুকুইয়ামা তাঁর গ্রন্থে এভাবে দেখেন : পশ্চিমা বিশ্বে স্থাপিত সরকার ব্যবস্থাই হচ্ছে ‘‘The end point of mankindÕs ideological evolution and the universali æation of Western liberal democracy as the final form of human government। এই গ্রন্থ দুটিতে আরব সমাজে বর্তমান সংঘর্ষের অনিবার্যতা ও সেখানে ‘‘লিবারাল গণতন্ত্র” প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা বিষয়ে পশ্চিমা সরকারের মানসিকতার পরিচয় পাওয়া যায়। ক্যান্সারে আক্রান্ত সাঈদ ২৫ সেপ্টেম্বর ২০০৩ সালে পরলোকগমন করেন। লেবাননের পোটাস্ট্যান্ট সমাধিক্ষেত্রে তাকে সমাহিত করা হয়।