মুহাম্মদ নূরে আলম
বিজ্ঞান মানেই নতুনের সন্ধান আর অজানাকে জানার এক অদম্য আকাক্সক্ষা। প্রতি বছরের মতো ২০২৫ সালও বিজ্ঞান উপহার দিয়েছে বিস্ময়কর অনেক আবিষ্কার। তাই ২০২৫ সাল বিজ্ঞানপ্রেমীদের কাছে বৈচিত্র্যময় ও উল্লেখযোগ্য একটি বছর ছিল। এ বছর বিশ্বের নানা প্রান্তের বিজ্ঞানীরা অনেকটা গোয়েন্দার ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে এমন কিছু প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পেয়েছেন, যা কয়েক দশক বা শতাব্দী ধরে অমীমাংসিত ছিল। ইস্টার দ্বীপের বিশালাকার পাথুরে মাথাগুলো পলিনেশীয়রা কীভাবে তৈরি করেছিল, তার রহস্য উন্মোচন থেকে শুরু করে পম্পেই নগরীর অগ্ন্যুৎপাতের আগের আকাশরেখা কেমন ছিল- এমন অনেক রোমাঞ্চকর তথ্য এ বছর সামনে এসেছে। এমনকি পেরুর আন্দিজ পর্বতমালার প্রায় ৫ হাজার ২০০টি রহস্যময় গর্তের উৎস, পাথরে জমে থাকা বিশাল ডাইনোসরের পায়ের ছাপ থেকে শুরু করে গ্রহগুলোর এক অভূতপূর্ব সারিবদ্ধ দৃশ্য আকাশের বুকে গ্রহদের অপূর্ব এক মিলনমেলা, সবকিছুই আমাদের মুগ্ধ করেছে বিজ্ঞানের এই নতুন সব আবিষ্কারের মধ্য দিয়ে। প্রাকৃতিক বিশ্বও আমাদের অবাক করা থামায়নি। বন্য শিম্পাঞ্জিদের দেখা গেছে উদ্ভিদকে ওষুধ হিসেবে কাজে লাগাতে, আর স্বর্ণের চেয়েও দুর্লভ বিবেচিত চাঁদের ধুলা গবেষণার জন্য হাতে পেয়েছে যুক্তরাজ্যে। তবে সব খবরই সুখবর ছিল না। কোথাও বিশাল এক হিমশৈল বা আইসবার্গের খণ্ড একটি প্রত্যন্ত দ্বীপের দিকে ভেসে যেতে থাকায় সেখানে বন্যপ্রাণীর জন্য হুমকি তৈরি হয়েছে, যা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, বিজ্ঞান যেমন আবিষ্কারের জন্য জরুরি, তেমনি বিপদের পূর্বাভাস দিতেও অপরিহার্য। মানব ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ বাঁকগুলোয় নতুন করে নজর দিয়ে আগুন ব্যবহারের প্রাচীনতম প্রমাণ থেকে শুরু করে মানুষ কীভাবে দীর্ঘস্থায়ী সম্পর্ক গড়ে তুলে সে বিষয়ও উঠে এসেছে নতুন গবেষণায়। চলুন ফিরে দেখা যাক ২০২৫ সালের বিজ্ঞান জগতের সেই সব অবিশ্বাস্য ঘটনাগুলো।
CRISPR জিন এডিটিং দ্রুত, ব্যক্তিগতকৃত থেরাপিতে প্রবেশ করছে : সিকল-সেল ডিজিজ এবং বিটা-থ্যালাসেমিয়ার জন্য CRISPR-ভিত্তিক ওষুধ (Casgevy)-এর প্রথম অনুমোদনের ওপর ভিত্তি করে, ২০২৫ সালে মারাত্মক CPS1 ঘাটতিতে আক্রান্ত এক শিশুর জন্য একটি মাইলফলক ব্যক্তিগতকৃত ইন ভিভো CRISPR চিকিৎসা দেখা গেছে। একটি বহুজাতিক দল মাত্র ছয় মাসে একটি LNP-প্যাকেজড CRISPR থেরাপি ডিজাইন, নিয়ন্ত্রক-অনুমোদন এবং ওঠ ইনফিউশন (শিরায় সঞ্চার) মাধ্যমে সরবরাহ করেছে, যা যকৃতের কোষে বিপাকীয় ত্রুটি সংশোধন করেছে। নিউ ইংল্যান্ড জার্নাল অফ মেডিসিনে প্রকাশিত এ ঘটনাটি দেখায় কীভাবে জিনোম এডিটিং অতি-দুর্লভ অবস্থার জন্য দ্রুত মানিয়ে নেওয়া যেতে পারে, যা ‘n-Ad-1’ ওষুধের জন্য আশা বাড়িয়ে তোলে এবং একই সাথে খরচ ও নৈতিকতা নিয়ে বিতর্ককে তীব্র করে।
এআই ও মাইক্রোফ্লুইডিক্সের মাধ্যমে শুক্রাণু নির্বাচন বৃদ্ধি: বিশ্বব্যাপী প্রায় ১৫ শতাংশ দম্পতি বন্ধ্যাত্বের কারণে প্রভাবিত হন। যদিও আইভিএফ এবং সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তিগুলি আশা জাগায়, তবুও সাফল্যের হার সীমিতই থেকে যায়। বিদ্যমান কম্পিউটার-সহায়িত শুক্রাণু বিশ্লেষণ (CASA) টুলগুলি প্রধানত দৃশ্যমান মূল্যায়ন এবং পরিসংখ্যানকে সমর্থন করে, যার ফলে নিষিক্তকরণের ফলাফলে খুব কম প্রভাব পড়ে। নরওয়ের আর্কটিক ইউনিভার্সিটি (UIT), নর্থ-নরওয়ের ইউনিভার্সিটি হাসপাতাল এবং নরইনোভা-র গবেষকরা স্পার্মোটা (Spermotile) নামে একটি নতুন CASA সিস্টেম তৈরি করেছেন, যা AI, লেবেল-ফ্রি মাইক্রোস্কোপি এবং মাইক্রোফ্লুইডিক্সকে একত্রিত করে। এই প্রযুক্তিটি নির্ভরযোগ্য ঘনত্ব বজায় রেখে উচ্চ-মানের ‘স্টার স্পার্ম’ সনাক্ত ও ফিল্টার করে, যার লক্ষ্য IVF, IUI এবং ICSI-তে নিষিক্তকরণের সাফল্য উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত করা। দলটি এখন অংশীদার, বিনিয়োগকারী এবং লাইসেন্সিং সুযোগ খুঁজছে।
পোকামাকড় ট্র্যাকিং ক্যামেরা : পরাগায়নকারী পোকামাকড়ের গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতনতা এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি। মৌমাছি না থাকলে বৈশ্বিক খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হতো। এ কারণে অনেকেই এখন মৌমাছি, প্রজাপতি ও অন্যান্য পরাগবাহী পোকা আকর্ষণের জন্য বিশেষভাবে বাগান তৈরি করছেন। এই প্রেক্ষাপটে ‘পেটাল’ নামের একটি নতুন ইনসেক্ট-ট্র্যাকিং ক্যামেরা বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। কমলা রঙের ফুলের মতো দেখতে এবং গাছের কাণ্ডের আদলে তৈরি এ ক্যামেরাটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে পোকামাকড় শনাক্ত করতে পারে, তাদের চলাচল পর্যবেক্ষণ করে এবং বীজ অঙ্কুরোদ্গমের মতো প্রাকৃতিক প্রক্রিয়াও নজরদারি করে। যাদের নিজস্ব বাগান নেই, তাদের জন্য কোম্পানিটি ‘ওয়ান্ডার ব্লকস’ নামের আরেকটি পণ্য আনছে, যা ছোট জায়গায় পরাগায়নকারী পোকাদের সহায়তা করার সুযোগ দেবে এবং এটি বসন্ত মৌসুমে বাজারে আসবে।
স্মার্ট লিপস্টিক : প্রসাধনী জগতে এক অভিনব উদ্ভাবন এনেছে ব্রাজিলের কসমেটিকস কোম্পানি ও বোটিকারিও। প্রতিষ্ঠানটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-চালিত একটি স্মার্ট লিপস্টিকের প্রোটোটাইপ উন্মোচন করেছে, যা দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী বা শরীরের ওপরের অংশে সীমিত নড়াচড়া রয়েছে, এমন ব্যক্তিদের স্বনির্ভরভাবে মেকআপ করতে সহায়তা করবে।
পরিবেশ-নিয়ন্ত্রিত নিউরাল ইয়ারবাড : প্রযুক্তির আরেকটি আলোচিত সংযোজন হলো ‘নাকি নিউরাল ইয়ারবাডস’। এর আগে মস্তিষ্ক ইমপ্লান্ট নিয়ে গবেষণার জন্য ডিভাইস দিয়ে মস্তিষ্ক নিয়ন্ত্রণের সম্ভাবনা থাকলেও, এর জন্য বিপজ্জনক মস্তিষ্ক অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হতো। তবে নাকি নিউরাল ইয়ারবাডস একেবারে ভিন্ন ও নিরাপদ বিকল্প হিসেবে হাজির হয়েছে। এই ইয়ারবাডস ব্যবহার করে মুখের সূক্ষ্ম নড়াচড়া ও চোখের ইশারার মাধ্যমে কম্পিউটার, হুইলচেয়ারসহ বিভিন্ন ডিভাইস নিয়ন্ত্রণ করা যায়।
জাইরোস্কোপিক প্রযুক্তির মাধ্যমে দাঁত চাপলে লাইট অন-অফ করা বা মাথা সামান্য কাত করলে টিভির ভলিউম বাড়ানো-কমানোর মতো কাজ সম্ভব। এই ইয়ারবাডস সিইএস ২০২৫ ইনোভেশন অ্যাওয়ার্ডও অর্জন করেছে। কোম্পানিটির প্রতিষ্ঠাতা ও সিইও মার্ক গডসি জানান, নাকির লক্ষ্য হলো- মানুষের ক্ষমতায়ন এবং আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক ও উদ্ভাবনী ভবিষ্যৎ গড়ে তোলা।
বাতাস থেকে কফি তৈরির মেশিন : সবচেয়ে কৌতূহলোদ্দীপক উদ্ভাবনগুলোর একটি হলো বাতাস থেকে পানি তৈরি করতে সক্ষম কফি মেশিন। প্রতিদিন সকালে পানি ভরার ঝামেলা ছাড়াই তাজা কফি বানানোর ধারণাকে বাস্তবে রূপ দিয়েছে ‘কারা পড’। এ মেশিনটি বাতাসের আর্দ্রতা থেকে পানি সংগ্রহ করে দিনে সর্বোচ্চ ১৩ কাপ পানি তৈরি করতে পারে। এর মাধ্যমে অতিবেগুনি রশ্মি ব্যবহার করে পানি বিশুদ্ধ করা হয় এবং উদ্ভিদভিত্তিক কফি পড দিয়ে কফি প্রস্তুত করা হয়।
আছে সতর্কবার্তাও
২০২৫ সালের বিজ্ঞানের ডায়েরিতে একটি আশঙ্কাজনক খবরও ছিল। একটি বিশাল বরফখণ্ড বা আইসবার্গ একটি দুর্গম দ্বীপের দিকে ভেসে আসতে দেখা গেছে। এটি দ্বীপের বন্যপ্রাণীদের জীবনযাত্রায় মারাত্মক বিঘ্ন ঘটাতে পারে। বিজ্ঞান আমাদের যেমন পৃথিবীর ইতিহাস বা মহাকাশের রহস্য জানায়, তেমনি জলবায়ুর পরিবর্তন বা প্রকৃতির ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার সংকেতও দিয়ে থাকে। এ আইসবার্গের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করে বিজ্ঞানীরা এখন প্রাণীকুলকে রক্ষার উপায় খুঁজছেন।
পুরো বছরটি পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে পৃথিবী এবং মহাকাশ আমাদের জন্য অগণিত রহস্য লুকিয়ে রেখেছে। ডাইনোসরের পায়ের ছাপ আমাদের নিয়ে যায় কোটি বছর পেছনে। আগুনের প্রমাণ মনে করিয়ে দেয় মানুষের বুদ্ধির প্রথম বড় সাফল্য। আকাশের গ্রহগুলো দেখায় মহাবিশ্বের বিশালতা। শিম্পাঞ্জিদের আচরণ শেখায় আমরা প্রকৃতি থেকে এখনো কত কিছু জানতে পারি। আবার বরফখণ্ডের মতো ঘটনাগুলো সতর্ক করে দেয় ভবিষ্যতের জন্য। সব মিলিয়ে ২০২৫ ছিল বিজ্ঞানকে নতুন চোখে দেখার একটি গুরুত্বপূর্ণ বছর।
সূত্র: সিএনএন, বিবিসি, ন্যাশনাল জিওগ্রাফি, বিবিসি হিউম্যান ও এনিমেল প্লান্টে।https://weeklysonarbangla.net/uncategorized/post-44480/

No comments:
Post a Comment