Sunday, 1 October 2017

বাংলা ভাষায় মর্সিয়া সাহিত্য

Picture_24_Feather
বাংলা ভাষায় মর্সিয়া সাহিত্য
ড. এম এ সবুর
২৯ সেপ্টেম্বর ২০১৭,শুক্রবার, ০০:০০
৬৮০ খ্রিষ্টাব্দে ইরাকের কারবালায় মহানবী সা:-এর দৌহিত্র ইমাম হোসেনের সাথে স্বৈরাচার ইয়াজিদের যুদ্ধ হয়। এ যুদ্ধে ইমাম হোসেন সপরিবারে নির্মমভাবে শহীদ হন। হোসেন পরিবারের শাহাদতের বিয়োগান্ত এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে অনেক শোকগাথা রচিত হয়েছে।
কারবালায় শহীদ ইমাম হোসেন ও অন্যান্য শহীদদের উদ্দেশে লিখিত শোকগাথা ও প্র্রশংসামূলক কবিতা মর্সিয়া সাহিত্য নামে অভিহিত হয়েছে। এসব মর্সিয়া সাহিত্য সৃষ্টির পেছনে ধর্মীয়ভাব কাজ করেছে। অর্থাৎ নবী বংশের প্রতি ভক্তি-শ্রদ্ধা এবং তাদের শত্রুপক্ষের নিন্দা মর্সিয়া সাহিত্যের মূল উপজীব্য হয়েছে। মোগল শাসনামলের (১৫৭৫-১৭৫৭ খ্রি.) আগেই বাংলা সাহিত্যে মর্সিয়ার উদ্ভব হলেও মোগল শাসনামলে তা ব্যাপকভাবে বিকশিত হয়েছে।
আর এ ধারা আধুনিক বাংলা সাহিত্যকাল পর্যন্ত বিস্তার লাভ করেছে।
বাংলা সাহিত্যের প্রথম মর্সিয়া কাব্য শেখ ফয়জুল্লাহর জয়নবের চৌতিশা (১৫৪৫ খ্রি.)। ইরাকে কারবালার বিষাদময় কাহিনী অবলম্বনে রচিত হয়েছে এ কাব্য। জয়নবের চৌতিশা কারবালা যুদ্ধসংক্রান্ত বড় কাব্য না হলেও এটি বিশেষ আঙ্গিকে ইসলামি চেতনায় রচিত হয়েছে। এ কাব্যে শেখ ফয়জুল্লাহ ইমাম হোসেনের নির্মম শাহাদতবরণ ও কারবালার করুণ কাহিনী চিত্রিত করেছেন। এতে বাংলায় মর্সিয়া সাহিত্যের প্রাচীনতম রূপ বিকশিত হয়েছে। তারই পথ ধরে কারবালার ঐতিহাসিক বিয়োগান্ত করুণ কাহিনী অবলম্বনে চট্টগ্রামের অধিবাসী কবি দৌলত উজির বহরম খান জঙ্গনামা রচনা করেছেন।
মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ মর্সিয়া কাব্য মক্তুল হোসেন। এ কাব্যের রচয়িতা চট্টগ্রামের হাটহাজারী থানার জোবরা গ্রামের অধিবাসী মুহম্মদ খান (১৫৮০-১৬২০ খ্রি.)। এ কাব্যটি ফারসি কাব্য মক্তুল হোসেন এর ভাবানুবাদ হলেও এতে কবির নিজস্ব চিন্তা-ভাবনা ও কল্পনার প্রাধান্য আছে। কারবালা প্রান্তরে ইমাম হোসেন নির্মমভাবে শহীদ হলে কী করুণ অবস্থা হয়েছিল কবি কল্পনায় তা বর্ণিত হয়েছে এভাবে,
স্বর্গমর্ত্য পাতালে উঠিল হাহাকার।
কান্দন্ত ফিরিস্তা সব গগন মাঝার ॥
বিলাপন্ত যতেক গন্ধর্ব বিদ্যাধর।
অর্শিকুর্সি লওহ আদি কাঁপে থরথর ॥
অষ্ট স্বর্গবাসী যত করন্ত বিলাপ।
এ সপ্ত আকাশ হৈল লোহিত বরণ।
কম্পমান সূর্য দেখি হোসেন নিধন।
ীণ হৈল নিশাপতি আমীরের শোকে ॥
মঙ্গল অরুণ বর্ণ রক্ত মাখি মুখে।
বুধে বুদ্ধি হারাইল গুরুএড়ে জ্ঞান ॥
শুনি কালা বস্ত্র পিন্ধে পাই অপমান।
জোহরা নত্র কান্দে তেজি নাট গীত।
ফাতেমা জোহরা কান্দে শোকে বিষাদিত।
সমুদ্রে উঠিল ঢেউ পরশ আকাশ।
কম্পিত পর্বত ছাড়ে সঘন নিঃশ্বাস ॥

আসহাবনামা, দজ্জালনামা এবং কিয়ামতনামা অনুলিখিত গ্রন্থগুলোও মক্তুল হোসেন কাব্যের অন্তর্গত বলে ধারণা করেছেন বাংলা সাহিত্যের বিশিষ্ট গবেষক আব্দুর রহমান খাঁ। তবে ড. এনামুল হকের মতে, মক্তুল হোসেন কাব্যটি ফাতিমা, আসহাবনামা, হাসান, মুসলিম, যুদ্ধ, হুসেন, শ্রীদূত, অলীদ, এজিদ এবং অন্তপর্ব মোট ১১ পর্বে বিভক্ত। কারবালার ঐতিহাসিক প্রান্তরে হাসান পুত্র কাশেম নিধন ও কাশেমের সদ্য বিবাহিতা পতœী সখিনার বিলাপের কাহিনী বর্ণিত হয়েছে কাসেমের লড়াই কাব্যে। এ কাব্যের রচয়িতাও মুহম্মদ খান।
কারবালার ঐতিহাসিক বিষাদময় কাহিনী অবলম্বনে খ্রিষ্টীয় ১৭ শতকের শেষ দিকে কাসেমের লড়াই রচনা করেছেন শেখ শেরবাজ চৌধুরী। এ কাব্যের মূল বিষয়বস্তু কাশেম ও সখিনার বিবাহ প্রসঙ্গ এবং কারবালা প্রান্তরে ইমাম হোসেন ও কাশেমের শৌর্য-বীর্য এবং তাঁদের শাহাদত বরণের ঘটনা।
১৮ শতকের কবি জাফর কারবালার মর্মান্তিক ঐতিহাসিক ঘটনা অবলম্বনে রচনা করেন শহীদ-ই-কারবালা ও সখিনার বিলাপ। এ কাব্য দু’টি মর্সিয়া সাহিত্য শ্রেণীর অন্তর্গত। ১৮ শতকের প্রধান কবি রংপুরের ঝাড়বিশিলা গ্রামের হেয়াত মামুদ রচনা করেন জঙ্গনামা (১৭২৩ খ্রি.)।
বিষ প্রয়োগে হজরত হাসান হত্যার পরিকল্পনা, কারবালার শুষ্ক মরুপ্রান্তরে তৃষ্ণাকাতর ইমাম হোসেনের নির্মম হত্যাকাণ্ড, হোসেনের পুত্র কাশেম-সখিনার বিবাহ, কাশেম হত্যাকাণ্ড এবং কাশেমের স্ত্রী সখিনার অকাল বৈধব্য ইত্যাদি নির্মম কাহিনী হেয়াত মাহমুদের জঙ্গনামার মূল উপজীব্য। কারবালার মর্মান্তিক হৃদয়বিদারক ঘটনাÑ যা সারা বিশ্বের মুসলমানদের শোকাহত করেছে। সে ঘটনাই হেয়াত মাহমুদের হৃদয়স্পর্শী বর্ণনায় উজ্জ্বল হয়ে ফুটে উঠেছে এ কাব্যে। এতে ইসলামের প্রতি কবি মনের অনুভূতি ব্যক্ত হয়েছে। বাংলা মর্সিয়া সাহিত্য ধারায় ১৬ শতকের মুহম্মদ খানের মক্তুল হোসেন কাব্যের পর হেয়াত মাহমুদের জঙ্গনামা একটি পূর্ণকাব্য হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। এ কাব্যে কারবালা প্রান্তরে মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ড ও যুদ্ধের বর্ণনা দিয়ে কবি বলেন,
পাইকে পাইকে যুঝে পদাতি পদাতি
স্বারে স্বারে বিষম যুদ্ধ অতি।
তার্জিয়া গর্জিয়া যুঝে আপনার বলে
শতে শতে মুণ্ড কাটি পড়ে মহীতলে।
আঠারো শতকের বাংলা মর্সিয়া সাহিত্য ধারার অপর একজন কবি হামিদ। তিনিও মুহম্মদ খান ও হেয়াত মাহমুদের মতো কারবালার ঐতিহাসিক মর্মান্তিক ঘটনা অবলম্বনে রচনা করেন সংগ্রাম হুসন (১৭৪০ খ্রি.)।
মূলত মোগল আমলে (১৫৭৬-১৭৫৭ খ্রি.) রাজ পোষকতায় বাংলাভাষায় মর্সিয়া সাহিত্য ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করে। এ সময়ের বাংলা মর্সিয়া কাব্যের কবিরা উৎকৃষ্ট মর্সিয়া রচনার মাধ্যমে এ শাখাকে পরিপুষ্ট করেন। বিশিষ্ট মর্সিয়া সাহিত্য গবেষক ড. গোলাম সাকলায়েন মোগল শাসনামলকে বাংলা মর্সিয়া সাহিত্যের স্বর্ণযুগ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।
পূর্বসূরিদের অনুসরণ করে ইংরেজ আমলে (১৭৫৭-১৯৪৭ খ্রি.) বাংলা ভাষার মুসলিম কবিরা মর্সিয়া কাব্য রচনা অব্যাহত রাখেন। বাংলায় ইংরেজ শাসনামলে কারবালার মর্মান্তিক যুদ্ধকাহিনী নিয়ে জঙ্গনামা (১৭৯৪ খ্রি.) রচনা করেন ফকির গরীবুল্লাহ। এ পুঁথি কাব্যে কারবালা প্রান্তরে রাসূলের দৌহিত্র হজরত ইমাম হোসেন ও তাঁর পরিবারবর্গের নির্মম হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে।
ইমাম হোসেনের শাহাদতের হৃদয়বিদারক দৃশ্য সম্পর্কে কবি তার কাব্যে বলেন,
যখন বসিল কাফির ছাতির উপরে।
ছের জুদা কৈল যদি ইমামের তরে ॥
আরস কোরস লওহ কলম সহিতে।
বেহেস্ত দোজখ আদি লাগিল কাঁদিতে ॥
আসমান জমিন আদি পাহাড় বাগান।
কাঁপিয়া অস্থির হইল কারবালা ময়দান ॥
আফতাব-মাহতাব তারা কালা হইয়া গেল।
জানওয়ার হরিণ পাখি কাঁদিতে লাগিল ॥
বালক মায়ের দুধ না খাই শোকেতে।
নাওমেদ রহে সবে এনাম জুদায়েতে ॥
বাঘ-ভাল্লুক কাঁদে আর মহিষ-গণ্ডার ॥
বাচ্চারে না দেয় দুধ কাঁদে জারে জার।
গাই নাহি দুধ দেয় বাছুর লাগিয়া।
বাছুর না খাই কিছু দেলে শোক পাইয়া ॥
মৌমাছি ভ্রোমর কাঁদে হইয়া উধাও।
কাঁকে কুম করে কাঁদে গৃহস্থের বউ।
আঠারো শতকে মর্সিয়া বাংলা সাহিত্যের এক সমাদৃত শাখা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। মর্সিয়া সাহিত্য ইসলামি ভাবধারাসমৃদ্ধ হলেও সমকালীন কোনো কোনো হিন্দু কবিও মুসলিম ঐতিহ্যভিত্তিক মর্সিয়া সাহিত্য রচনা করেছেন। পশ্চিমবঙ্গের উত্তর রাঢ়ের অধিবাসী রাধাচরণ গোপ মর্সিয়া কাব্য রচনা করেছেন। তার রচিত ইমাম হোসেনের কেচ্ছা ও আফৎনামা (হোসেনের মৃত্যু কাহিনী) কাব্য দু’টি মর্সিয়া সাহিত্যের বিশেষ নির্দশন। কাব্য দু’খানি কারবালার মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে রচিত হয়েছে। এতে মুসলিম কবিদের মতো আরবি, ফার্সি পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়েছে। কবি রাধাচরণ গোপ তার পীরের কথা মতো তার কাব্য রচনা করেছেন বলে উল্লেখ করে লিখেন,
রাধপ গোপে বলে পীরের মুখের বাণী।
শুনিতে ইমাম কেচ্ছা অপরূপ কাহিনী।
কহিল রাধপ গোপ সত্যপীরের পায়
আল্লা আল্লা বল ভাই তওফিক খোদায়।
উনিশ শতকে ফকির শাহ্ গরীবুল্লাহ-এর ধারায় মর্সিয়া রচনা করেন মুহম্মদ হামিদুল্লাহ খান। তিনি চট্টগ্রামের অধিবাসী ছিলেন এবং ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির নিকট থেকে খান বাহাদুর উপাধি লাভ করেন। তার রচিত গুলজার-ই-শাহাদৎ বা শাহাদতুদ্যান (১৮৬৩ খ্রি.) মর্সিয়া কাব্যে কারবালা যুদ্ধের বিবরণ দেয়া হয়েছে। উনিশ শতকের মর্সিয়া ধারার অপর কবি মীর মনোহার রচনা করেন হানিফার লড়াই (১৮৮৬ খ্রি.)। এ কাব্য গ্রন্থখানি বাংলা মর্সিয়া সাহিত্য ধারায় বিশেষ উল্লেখযোগ্য। তাছাড়া সুনামগঞ্জের ওয়াহেদ আলী রচনা করেন বড় জঙ্গনামা। এ কাব্যের অনেকাংশে ফকীর গরীবুল্লাহর জঙ্গনামা কাব্যের হুবহু মিল পাওয়া যায়। এ সময় পশ্চিমবঙ্গের হাওড়া জেলার বালিয়া পরগনার আলী রচনা করেন শহীদ-ই-কারবালা নামের এক বৃহৎ কাব্যগ্রন্থ। শহীদ-ই-কারবালা নামের অপর এক গ্রন্থ রচনা করেন মুহম্মদ মুনশী।
ঢাকা জেলার অধিবাসী মুন্সি তাজউদ্দীন প্রমুখ মর্সিয়া সাহিত্য রচনা করেন। বাংলা মর্সিয়া সাহিত্যের এ ধারা বিশ শতকের প্রথমার্ধ পর্যন্ত বর্তমান ছিল।
এ শতকের প্রথম দিকেই সা‘দ আলী ও আব্দুল ওয়াহাব যৌথভাবে রচনা করেন শহীদ-ই-কারবালা। এতে মুহম্মদ মুনশীর শহীদ-ই-কারবালা-এর কাহিনী ও ভাষা নকল করা হয়েছে বলে মন্তব্য করেন ড. গোলাম সাকলায়েন।
ইংরেজ আমলে বাংলা সাহিত্য প্রাচীন ধারা থেকে আধুনিক ধারায় রূপান্তরিত হয় অর্থাৎ গদ্য রীতি শুরু হয়। এ রূপান্তরিত আধুনিক যুগের ধারাতেও মর্সিয়া সাহিত্য রচিত হয়। মীর মশাররফ হোসেনের বিষাদসিন্ধু এ ধারার শ্রেষ্ঠ মর্সিয়া রচনা বলা যায়। নিলফামারী জেলার জলঢাকা থানার ইসহাক উদ্দীন রচনা করেন দাস্তান শহীদ-ই-কারবালা। কাব্যখানি ১৩৩৪ বঙ্গাব্দে চৈত্র মাসে রচনা শুরু করে ১৩৩৬ বঙ্গাব্দে ১২ ভাদ্র (১৯২৯ খ্রি.) তারিখে সমাপ্ত করেন। গ্রন্থখানি কাব্যে রচিত হলেও মীর মশাররফ হোসেন রচিত বিষাদ সিন্ধু অনুসরণ করেছেন বলে তিনি লিখেন,
বিষাদ-সিন্ধুর আমি পিছেতে হাঁটিয়া,
দাস্তানে হানিফার জঙ্গ লিখি বিবরিয়া।
চট্টগ্রাম জেলার মির্জাপুর গ্রামের কাজী আমিনুল হক রচনা করেন জঙ্গে কারবালা (১৯৪৫ খ্রি.) দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের (১৯৩৯-৪৫ খ্রি.) সময়। ইতিহাসভিত্তিক কারবালার বিষাদময় ঘটনা অবলম্বনে রচিত এ কাব্যখানি বিশেষ বৈশিষ্ট্যপূর্ণ।
এ ছাড়া আবুল আলী মোহাম্মদ হামিদ আলীর কাসেম বধ কাব্য (১৯০৬ খ্রি.) ও জয়নাল উদ্ধার (১৯০৯ খ্রি.), মোহাম্মদ উদ্দীন আহমদের মোহররম কাব্য (১৯১২ খ্রি.), মোহাম্মদ আব্দুল বারীর কারবালা (১৯১৩ খ্রি.), কবি কাজেম আল কোরাইশী ওরফে কায়কোবাদ রচিত মহরম শরীফ, ফজলুর রহিম চৌধুরীর মহরম চিত্র (১৯১৭ খ্রি.), গোলাম সাকলায়েনের কারবালার কাহিনী, মোহাম্মদ বরকতুল্লাহর কারবালার যুদ্ধ ও নবী বংশের ইতিবৃত্ত (১৯৫৭ খ্রি.) বিশেষ উল্লেখযোগ্য। বিশ শতকের শেষার্ধে মর্সিয়া কাব্যগ্রন্থ রচিত না হলেও এ সময় কারবালার মর্মান্তিক ঘটনা স্মরণে কাজী নজরুল ইসলাম ও গোলাম মোস্তফা প্রমুখ মুসলিম সাহিত্যিক অনেক কবিতা, গান, প্রবন্ধ রচনা করেছেন।
এ সময় ড. গোলাম সাকলায়েন বাংলা সাহিত্যে মর্সিয়া বিষয়ে গবেষণা করেছেন। তার রচিত বাংলায় মর্সিয়া সাহিত্য গ্রন্থ বাংলা সাহিত্যের মর্সিয়া গবেষণামূলক গ্রন্থগুলোর মধ্যে বিশেষ উল্লেখযোগ্য।
http://m.dailynayadiganta.com/?/detail/news/255638

ঘরে ঘরে পৌঁছে দাও হোসাইনী পয়গাম

Picture_24_Featherঘরে ঘরে পৌঁছে দাও হোসাইনী পয়গাম

আবদুল হাই শিকদার
এক.
‘‘নওশার সাজ নাও খুন-খচা আস্তিন,
ময়দানে লুটাতে রে লাশ এই খাস্ দিন!
হাসানের মতো পিব পিয়ালা সে জহরের,
হোসেনের মতো নিব বুকে ছুরি কহরের,
আসগর সম দিব বাচ্চারে কোরবান,
জালিমের দাদ নেবো, দেবো আজ গোর জান্!
সকীনার শেবতবাস দেবো মাতা কন্যার,
কাসিমের মতো দেবো জান্ রুধি, অন্যায়।
মোহররম! কারবালা! কাঁদো ‘হায় হোসেন’!
দেখো মরু-সূর্য এ খুন যেন শোষে না!’’
-কাজী নজরুল ইসলাম
দুই
আন্তর্জাতিক নজরুল সম্মেলনে যোগ দিতে (২০০৬) তেহরান পৌঁছেই দেখি মহানগরজুড়ে চলছে মোহররম পালনের ব্যাপক প্রস্ত্ততি। সারা ইরান যেন আচ্ছাদিত হয়ে গেছে শোকের কালো কাপড়ে। শোক আর শোক। যেন বক্ষ ফাটা তারার ক্রন্দন। দেশের প্রতিটি কোনা থেকে যেন উঠে আসছে আকুল ব্যাকুল শোকের প্লাবন।
শহরজুড়ে হোসেন হোসেন আর হোসেন। বাজারে, শপিংমলে, দোকানে, ফুটপাতে ধুমছে বিক্রি হচ্ছে শিল্পীর ছবিতে কারবালার যুদ্ধের নানা দৃশ্য সংবলিত পোস্টার। বিক্রি হচ্ছে গেঞ্জি, টি-শার্ট, স্টিকার, শোপীস। রাতে বিলবোর্ডগুলোতে ঝলমল করে ওঠে পেইন্টিং এর সাথে ইমাম হোসেনের বাণী।
দু’দিন পর কবি হাফিজ ও শেখ সাদীর ওপর ডকুমেন্টারি করার জন্য সিরাজ নগরীতে পৌঁছে প্রথম মোহররমের মিছিলের সামনে পড়লাম। আশুরা আসতে তখনও ৭ দিন বাকি। দেখলাম এভিনিউর এ-মাথা থেকে ও-মাথা পর্যন্ত দুই সারিতে বিশাল মিছিল। মিছিলে অংশগ্রহণকারীদের বেশিরভাগই কালো পোশাক পরিহিত তরুণ ও যুবক। মিছিলের সামনে, পেছনে, মাঝে দোতলা বিল্ডিংয়ের সমান বিশাল বিশাল ড্রাম। ওরা বলে দামামা। দামামায় ছন্দের তালে তালে আঘাত করা হচ্ছে। শব্দ উঠছে গগনবিদারী। কেঁপে উঠছে আশপাশের ভবন। মিছিলকারীরা বুক চাপড়ে, দুই হাত দিয়ে নিজেদের শরীরে ক্রমাগত আঘাত করছে। আর মুখ দিয়ে ধ্বনি তুলছে হায় হোসেন, হায় হোসেন।
আমার গাইড বললো, এটা তো কিছুই নয়। ইরানে ১০ মোহররম না দেখলে শোক, বেদনা ও বিশালত্ব সম্পর্কে কোনো ধারণাই পাবে না তুমি। এইভাবে মোহররম পালনের মধ্য দিয়েই প্রতি বছর ইরানীরা নতুনভাবে নিজেদের সাজিয়ে নেয়। আমাদের জনগণকে, আমাদের যুবক ও তরুণদের সাহসী হওয়ার জন্য, ন্যায়নিষ্ঠ ও নীতিনিষ্ঠ হওয়ার জন্য, আদর্শবান হওয়ার জন্য, জুলুম ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়ার জন্য, তাদের উৎসাহিত করার জন্য, জাতির চেতনা জাগ্রত রাখার জন্য, তাদের প্রশিক্ষিত করার জন্য, তাদেরকে হোসেনের মতো নীতির জন্য, দেশের জন্য, মানবতার জন্য আত্মত্যাগী হওয়ার প্রেরণা দিতে প্রতি বছর আমরা অত্যন্ত সাড়মবরে মোহররম উদযাপন করি। ইরানের যুবক ও তরুণরা এজন্যই ছোটবেলা থেকেই হোসেনের অনুসারী হওয়ার স্বপ্ন দেখে। এভাবেই শোক থেকে শক্তি অর্জন করে ইরান।
তিন
উত্তরের অনেক উত্তরে যেখানে সীমান্তের প্রান্ত ছুঁয়ে একা একা বয়ে যায় দুধকুমার, সেইখানে ভূরুঙ্গামারীর গোপালপুর গ্রামে, পঞ্চাশ ও ষাট দশকের মাঝখানে যে শৈশব আমি ফেলে এসেছি, সে শৈশবে মোহররম ছিল একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আমাদের গ্রামের সংস্কৃতির অপরিহার্য অংশ। প্রথম থেকে ১০ মোহররম পর্যন্ত আমাদের মা-চাচীরা রোজা রাখতেন। শোকের পাশাপাশি একটা উৎসবের আবহ ছড়িয়ে পড়তো সর্বত্র। লাঠিয়ালরা মেতে উঠতো লাঠিখেলায়। কারও দহলিজে বা মসজিদের মাঠে বসতো হেয়াত মামুদ কিংবা ফকির গরীবুল্লাহর ‘জঙ্গনামা’ পাঠের বৈঠক। ‘বিষাদ সিন্ধু’ হাতে আসর জমিয়ে বসতেন আহমদ আলী ভাই। সন্ধ্যার পর কোথাও বসতো জারী গানের আসর :
‘হায়রে খোদা হায়, আজ কী হলোরে হায়,
নিভিল দিনের চেরাগ সোনার মদিনায়\
দুধের শিশু আলী আজগর পিপাসায় হয়ে কাতর,
দে পানি দে পানি বলে ধুলাতে লুটায়,
পানির বদলে শেল বিঁধে কলিজায়\
হায়রে খোদা হায়, আজ কী হলোরে হায়,
নিভিল দিনের চেরাগ সোনার মদিনায়\’
গ্রামের সব বয়সের নারী-পুরুষ গোল হয়ে বসে শুনতো এসব। আর অঝোর ধারায় কাঁদতো।
বাংলাদেশের লোকসঙ্গীতের মূল্যবান ধারা ‘জারী গান’-এর জন্মই হয়েছে মোহররমের শোক থেকে। এ ব্যাপারে কবি আবদুল কাদির বলেছেন, ‘একথা সর্ববাদীসম্মত যে, কারবালা কাহিনী বহুকাল যাবৎ মুসলিম জনসাধারণের ধর্মীয় জীবনের সহিত ওতপ্রোতভাবে বিজড়িত হইয়া রহিয়াছে। সুতরাং ইহা বাংলাদেশের শিক্ষিত অশিক্ষিত অগণিত জনসাধারণের অন্তরে আলোড়নের সৃষ্টি করে;… সম্ভবত এই মাতমজারী হইতেই পল্লী বাংলার এই ক্রন্দন বা বিলাপ সঙ্গীতের উদ্ভব। এই গান পূর্ব বাংলার এক নিজস্ব সম্পদ।’
লোকসাহিত্য গবেষক ও সংগ্রাহক ‘হারামনি’ খ্যাত অধ্যাপক মনসুর উদদীন ‘জারী’র সংজ্ঞা নিরূপণ করতে গিয়ে বলেছেন, ‘জারী গান হযরত হুসাইন ইবনে আলীর শাহাদাৎ বরণের কাহিনী অবলমবনে রচিত।… এই গানে অত্যাচারী শক্তির নিষ্ঠুর জুলুম ও উৎপীড়নের বিবরণ পাওয়া যায়।’ পরবর্তীকালে বাংলা ভাষায় মর্সিয়া সাহিত্যের ওপর পিএইচডি করেছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ড. গোলাম সাকলায়েন।
এই করুণ রসাত্মক জারী গান সম্পর্কে ‘বাংলার লোকসাহিত্য’ গ্রন্থে ড. আশুতোষ ভট্টাচার্য বলেছেন, ‘বীর রসাত্মক এই কাহিনীর উপর একটি করুণ কাহিনী আছে, তাহা ইমাম হোসেন ও হাসানের হত্যা। অতি দুস্তর মরু প্রান্তরে শত্রু সৈন্যের অবরোধের মধ্যে অসহায় শিশুর একবিন্দু তৃষ্ণা বারির জন্য যে আর্তি এই সঙ্গীতের মধ্য দিয়ে প্রকাশ পাইয়াছে, তাহা একদিক দিয়া যেমন ইহার মানবিক আবেদন সার্থক করিয়াছে, আবার অন্যদিক দিয়া ইহার বীর রসাত্মক পটভূমিকার উপর সুন্দর বৈপরীত্য সৃষ্টি করিয়াছে।’
চার
মোহররমের বেদনামথিত ট্র্যাজেডি নিয়ে সারা পৃথিবী তোলপাড় হয়েছে। এজন্য মওলানা মোহাম্মদ আলীর লেখা কবিতা,
‘কতলে হোসেন আসল মে মরগে ইয়াজিদ হ্যায়,
ইসলাম জিন্দা হোতা হ্যায় হর কারবালাকে বাদ।’
-আজ লাভ করেছে অমরত্ব।
বাংলা সাহিত্যে মোহররম কেন্দ্রিক মর্সিয়া নামে আলাদা ধারাই গড়ে উঠেছিল। এই ধারার যাত্রা শুরু মুঘল আমল থেকে। বাংলা ভাষার কবিরা ৬৮০ খ্রিস্টাব্দের ১৯ অক্টোবর কারবালার প্রান্তরে ঘটে যাওয়া মর্মবিদারী ঘটনাক্রম দ্বারা হয়েছেন অশ্রুসিক্ত। আবার ন্যায়ের জন্য অসীম সাহস নিয়ে মাত্র ৭০ জন সঙ্গী নিয়ে এজিদ বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়ে ইমাম হোসেন যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছেন তাতে হয়েছেন উদ্বুদ্ধ। আবেগাপ্লুত।
ষোড়শ শতাব্দী (১৫৭৬) থেকে শুরু করে ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত এই ধারা ছিল অব্যাহত। মর্সিয়া সাহিত্যের প্রথম কবি শেখ ফয়জুল্লাহ। এরপর একে একে আসেন দৌলত উজীর বাহরাম খান, মুহম্মদ খান, শেরবাজ, হেয়াত মামুদ, জাফর, হামিদ। ইংরেজ আমলে আবির্ভূত হন কবি ফকির গরীবুল্লাহ, ইয়াকুব, মুহম্মদ হামিদুল্লাহ খান, মীর মনোহর, ওয়াহিদ আলী, জনাব আলী, মুন্সী মুহম্মদ, সাদ আলী, আবদুল ওহাব, মুহম্মদ ইসহাক উদ্দীন, কাজী আমিনুল হক। ইংরেজ আমলের শেষ প্রান্তে মর্সিয়া নিয়ে আসেন আবুল মা’আলী মুহম্মদ হামিদ আলী, মতীয়ুর রহমান খান, মহাকবি কায়কোবাদ, আবদুল বারী, আবদুল মুনায়েম, সৈয়দ ইসমাইল হোসেন সিরাজী, মুহম্মদ ইবরাহীম, মীর রহমত আলী, আজিজুল হাকিম এবং ‘বিষাদ সিন্ধুর’ লেখক মীর মশাররফ হোসেন। তিনি কাজটি করে গেছেন অনন্যসাধারণ গদ্যে আর কাজী নজরুল ইসলাম পদ্যে।
কারবালার বেদনায় যে কেবল মুসলমান কবিরাই আপ্লুত হয়েছেন তা নয়। মুঘল ও ইংরেজ আমলের প্রথম দিকে মোহররমের শোকর‌্যালিতে হিন্দুরাও ব্যাপকভাবে অংশ নিতেন। সে সময় মোহররম পেয়েছিল সর্বজনীন মর্যাদা। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, মহারাষ্ট্রের মারাঠা ব্রাহ্মণরা পর্যন্ত ‘হায় হোসেন হায় হোসেন’ বলে বিলাপ করতে করতে মিছিল নিয়ে এগুতেন।
মুসলমান কবিদের মতোই কারবালা নিয়ে মধ্যযুগে এক যুগান্তকারী কাব্য রচনা করে গেছেন কবি রাধা চরণ গোপ। অষ্টাদশ শতাব্দীর এই মহাপ্রাণ কবির কাব্যের নাম ‘জঙ্গনামা বা এমাম এনের কেচ্ছা’। তার কাব্যে আছে :
‘রাধপ গোপে বলে পীরের মুখের বাণী।
শুনিতে এমাম কেচ্ছা অপরূপ কাহিনী\
কহিল রাধপ গোপ সত্যপীরের পায়।
আল্লা আল্লা বল ভাই তহফিক খোদায়\’
মাইকেল মধুসূদন দত্তকেও নাড়া দিয়েছিল কারবালার কাহিনী। তিনি এ নিয়ে কাব্য রচনায়ও হাত দিয়েছিলেন। কিন্তু কলকাতার বর্ণ হিন্দু বন্ধুদের পরামর্শে এ কাজে ক্ষান্ত দেন।
পাঁচ
নজরুল প্রতিভার গভীর গহন মানসলোকে অনির্বচনীয় ব্যঞ্জনা নিয়ে চিরকাল বিরাজ করেছে মোহররম। মোহররম তার কাছে হয়ে উঠেছে শোক ও শক্তি। তার শিক্ষা গ্রহণ ও অনুপ্রেরণার মাধুর্যময় প্রান্তর। এভাবেই তিনি মোহররমকে ধারণ করেছেন কাব্যে ও সঙ্গীতে। তার মোহররম তাই ‘জঙ্গনামা’ নয়। আবার ‘বিষাদ সিন্ধু’ও নয়। মোহররম তার হৃদয় ও নয়নকে যেমনি সজল করেছে, তেমনি সাম্রাজ্যবাদ, উপনিবেশবাদ ও ধর্মীয় গোঁড়ামির বিরুদ্ধে লড়ার জন্য ইমাম হোসেন হয়ে উঠেছেন তার মননায়ক। কারবালার ঘটনার মধ্যে তিনি প্রত্যক্ষ করেছেন শাশবত সত্যের পুনরুজ্জীবন। তাই তো এ রক্ত যেন শুকিয়ে না যায় সে জন্য আর্তি জানিয়েছেন।
নজরুলের হাতেই আমাদের সংবাদপত্রের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো প্রকাশিত হয় ‘মোহররম’-এর ওপর বিশেষ সংখ্যা। ১৯২২ সালের ২৯ আগস্ট অর্ধ সাপ্তাহিক ‘ধূমকেতু’ পত্রিকাটি ‘মোহররম সংখ্যা’ হিসেবে প্রকাশিত হয়। বর্ধিত কলেবরে প্রকাশিত এই বিশেষ সংখ্যায়ই প্রকাশিত হয় নজরুল রচিত বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবিতা ‘মোহররম’।
মোহররমকেন্দ্রিক সাহিত্যধারার শেষ এবং অসাধারণ সাহিত্যপুরুষ কাজী নজরুল ইসলাম। নজরুলের হাত দিয়ে মোহররমের ট্র্যাজেডি খুঁজে পায় নতুন মাত্রা।
তারপরই এই ধারাকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার বদলে শুরু হয় শূন্যতার যুগ। স্থবিরতার যুগ। যেখানে নজরুলের পর এই ধারা আরও বেগবান হওয়ার কথা, আরও ভিন্ন ভিন্ন মাত্রায় নবায়ন হওয়ার কথা, সেখানে ঘটেছে উল্টোটি।
বর্তমানে আমাদের সাহিত্য সংস্কৃতি থেকে সেই ধারা পুরোপুরি হারিয়ে গেছে। শুকিয়ে গেছে। নিঃশেষ হয়ে গেছে। মরে গেছে। নাকি আমরা ভেতর থেকে দেউলিয়া হয়ে গেছি? ইউরোপের ধূলি, বালু আর প্রতাপের সামনে ভিটেছাড়া হয়ে গেছে আমাদের নিজস্বতা? নইলে একটা কবিতা, নাটক, চলচ্চিত্র কিংবা উপন্যাসও আর লেখা হলো না কেন?
ছয়
আমি উদ্বেগ উৎকণ্ঠা নিয়ে অবাক হয়ে লক্ষ্য করি, আমাদের যুবক ও তরুণদের অনুপ্রাণিত করার জন্য, শুধু জাতীয় পর্যায়ের কয়েকজন শহীদ ও বীরের নাম নেয়া হয়। কিন্তু ভুলেও কেউ পৃথিবীর সবচেয়ে মর্মান্তিক ট্র্যাজেডির মহানায়ক শহীদদের সর্দার ইমাম হোসেনের নাম নেয় না। পৃথিবীর সর্বকালের শ্রেষ্ঠ শহীদের নামই জানে না আজকের প্রজন্ম। জুলুমের বিরুদ্ধে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে, অসত্যের বিরুদ্ধে, নীতি ও আদর্শহীনতার বিরুদ্ধে, ন্যায়, নীতি, আদর্শ ও সত্য প্রতিষ্ঠার জন্য প্রবল প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে হোসেনের যে সংগ্রাম ও আত্মত্যাগ তার তো কোনো তুলনা নেই বিশেব। তারপরও হোসেনের কথা বলা হয় না আমাদের সন্তানদের।
ফলে কারবালা পরিণত হয়েছে অন্য দশটি সাধারণ ঘটনার মতো ঘটনায়। স্রেফ দোয়া কালাম পড়ার কাজে। কিন্তু অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায় প্রতিষ্ঠা, অসত্যের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে সত্য প্রতিষ্ঠাও যে একটা ইবাদত, তা বাহুল্য বিবেচিত হয়েছে। সে জন্য তাদের কারবালা একটা বালুকাময়
প্রান্তর মাত্র। মাগফেরাত কামনাই পেয়েছে সর্বোচ্চ গুরুত্ব। এর শিক্ষা ও লড়াই করার প্রেরণা হয়েছে উহ্য।
সাত
হোসেন কারবালা প্রান্তরে দাঁড়িয়ে ঘোষণা করেছিলেন দুরাচারী এজিদের হাতে বায়ত গ্রহণের বদলে তার তরবারির আঘাতে শাহাদত বরণ করা উত্তম। তারপর বুকের রক্ত ঢেলে জং-ধরা সত্যকে পুনরুজ্জীবন দান করে গেছেন। সেই রকমভাবে আজ দেশ চায় আদর্শবান নীতিনিষ্ঠ সত্যনিষ্ঠ সন্তান। চায় শান্তি ও কল্যাণ প্রতিষ্ঠার জন্য সত্য-পথিকদের বুকের রক্ত। কেবল তাদের রক্তই পারে বাংলাদেশকে অধঃপতনের হাত থেকে রক্ষা করে পুনর্জীবন দান করতে।
লেখক : কবি, সাংবাদিক, সাবেক পরিচালক, নজরুল ইনস্টিটিউট
http://www.iranmirrorbd.com/ঘরে-ঘরে-পৌঁছে-দাও-হোসাইনী/

বিষাদ-সিন্ধু : পাপ অথবা প্রেমের জয়-পরাজয় : আবুল আহসান চৌধুরী

বিষাদ-সিন্ধু : পাপ অথবা প্রেমের জয়-পরাজয় : আবুল আহসান চৌধুরী
Picture_24_Feather
সোমবার, ৪ জুলাই ২০১৬
মীর মশাররফ হোসেন (১৮৪৭-১৯১১) উনিশ শতকের এক বহুমাত্রিক সব্যসাচী লেখক। মশাররফই সমাজ-প্রগতির মূল স্রোতধারা থেকে বিচ্ছিন্ন বাঙালি মুসলমানের জড়বুদ্ধি, ভাষাগত সংস্কার, দোভাষী পুঁথির রুচি, জাতিগত স্বাতন্ত্র্য-চিন্তার বৃত্ত ভেঙে বেরিয়ে আসা প্রথম সার্থক সাহিত্যশিল্পী কেবল মুসলমান স¤প্রদায়েরই শ্রেষ্ঠ লেখক নন, বাংলা সাহিত্যের সামগ্রিক প্রেক্ষাপটেই তিনি একজন স্মরণীয় শিল্পস্রষ্টা। তাঁর জীবন ও ব্যক্তিত্বে যুগপৎ ক্ষয়িষ্ণু সামন্তসমাজ ও উন্মেষ-যুগের মধ্যশ্রেণির আচরণ-রুচি-প্রবণতা-বিশ্বাস প্রতিফলিত।
মশাররফ ছিলেন নব্য-উত্থিত মুসলিম মধ্যশ্রেণির প্রধান সাংস্কৃতিক মুখপাত্র। তাঁর জীবন ও সাহিত্য উনিশ শতকের বাঙালি মুসলমানের জীবন-ভাবনা, মনন-মানস ও চিন্তা-চেতনার সঙ্গে দ্ব›দ্ব-সংহতির সূত্রে গভীরভাবে সম্পৃক্ত। তাঁর রচনার বিষয়-বৈচিত্র্য, প্রকাশ-নৈপুণ্য, সমাজমনস্কতা, মুক্তমন, অসা¤প্রদায়িক চেতনা ও অকপট স্বীকারোক্তি তাঁকে শিল্পী হিসেবে একটি স্বতন্ত্র মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
দুই.
প্রায় ৬৫ বছরের জীবনকালে, ১৮৬৫ থেকে ১৯১০ সাল পর্যন্ত, মোটের ওপর প্রায় ৪৫ বছর মশাররফের শিল্পসৃষ্টির সময়কাল। এই দীর্ঘসময়ে তাঁর সাহিত্যসাধনার ফসল স্বল্প নয়। এ-পর্যন্ত তাঁর পঁচিশখানা প্রকাশিত বইয়ের সন্ধান পাওয়া গেছে। এ-ছাড়া আছে বেশকিছু অপ্রকাশিত ও অগ্রন্থিত রচনাও।
মশাররফ ছিলেন বিচিত্রধর্মী সৃষ্টিশীল লেখক। বিষয়-বৈচিত্র্যে তাঁর রচনা বিশিষ্টতার দাবি রাখে। সাহিত্যের প্রায় সব শাখাতেই তাঁর ছিল স্বচ্ছন্দ বিচরণ। উপন্যাস-উপাখ্যান-নকশা, নাটক-প্রহসন, কবিতা-সঙ্গীত-পদ্য, প্রবন্ধ-নিবন্ধ, জীবনী-আত্মজীবনী, ছাত্রপাঠ্য পুস্তক প্রভৃতি সব মাধ্যমেই তিনি লেখনী চালনা করেছেন। কেবল মুসলমান সমাজেই নয় উনিশ শতকের সমগ্র বাংলা সাহিত্যের প্রেক্ষাপটেই তাঁর মতো সব্যসাচী লেখকের দৃষ্টান্ত বিরল।
মশাররফের শিল্পীমানস পূর্বাপর সরলরৈখিক ছিল না। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা-উপলব্ধি ও সামাজিক-রাজনৈতিক কারণে তা কখনো কখনো বিচলিত ও দ্বিধান্বিত হয়েছে। শিল্পীজীবনের সূচনাকাল থেকে ‘গাজী মিঁয়ার বস্তানী’ (১৮৯৯) রচনার পূর্ব পর্যন্ত তাঁর শিল্প ও সমাজসম্পর্কিত দৃষ্টিভঙ্গি প্রায় অপরিবর্তিত ছিল। এই কালপর্বে প্রগতিচিন্তা ও অসা¤প্রদায়িক চেতনা তাঁর মানসতা ও সাহিত্যকর্মকে প্রাণিত করেছে। কিন্তু এরপর তাঁর পূর্ব-বিশ্বাস ও ধারণায় চিড় ধরে। উত্তরকালের সাহিত্যে শিল্পপ্রেরণার পরিবর্তে ধর্মীয় বোধের প্রভাব ও নিয়ন্ত্রণ তাঁর মানসকে আচ্ছন্ন করে। তাই এই নিরিখে মীরের সাহিত্যকর্মকে শিল্পপ্রেরণাজাত ও ধর্মাশ্রিত, প্রবণতার দিক দিয়ে, এই দুইভাবে বিভক্ত করা চলে।
মশাররফের সাহিত্যধারণার জন্ম লৌকিক কাহিনী ও দোভাষী পুঁথির মাধ্যমে। এই গ্রাম্যরুচির সাহিত্যবোধ পরিশীলিত হয় মূলত তারাশঙ্কর তর্করতœ (?-১৮৫৮)-অনূদিত বাণভট্টের ‘কাদম্বরী’ (১৮৫৪) উপাখ্যানের সঙ্গে পরিচয়ের ভেতর দিয়ে। এই প্রসঙ্গে তাঁর সাহিত্যগুরু কাঙাল হরিনাথের (১৮৩৩-১৮৯৬) বিভিন্ন রচনা, বিশেষ করে ‘বিজয়-বসন্তে’র (১৮৫৯) কথাও উল্লেখ করতে হয়। মশাররফের উপাখ্যান রচনার প্রাথমিক প্রেরণা এই তিন সূত্র থেকেই এসেছে বলে অনুমান করা চলে। মশাররফের ‘রতœবতী’র (১৮৬৯) আগে প্যারীচাঁদ মিত্র (১৮১৪-১৮৮৩) কিংবা বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের (১৮৩৮-১৮৯৪) কয়েকটি উপন্যাসধর্মী বই প্রকাশিত হলেও, অন্তত প্রথম উপাখ্যান ‘রতœবতী’তে মশাররফ এসব রচনার দ্বারা প্রভাবিত হননি।
মশাররফ মূলত গদ্যশিল্পী। তাঁর গদ্যনির্ভর শিল্পকর্মের মধ্যে উপন্যাস-উপাখ্যান-নকশাজাতীয় রচনা সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য। এই ধারার রচনার মধ্যে একটি ক্রমোত্তরণের আভাস অত্যন্ত স্পষ্ট। এই শিল্প-বিবর্তন কেবল ভাষার ক্ষেত্রেই সীমিত নয়, তা বিষয়োপকরণ ও আঙ্গিক সম্পর্কেও সমান সত্য। তাঁর প্রথম গ্রন্থ ‘রতœবতী’র সঙ্গে উত্তরকালের অগ্রন্থিত রচনা ‘নিয়তি কি অবনতি’র তুলনা করলে এই সিদ্ধান্ত আরো পোক্ত হয়। ‘রতœবতী’তে যেখানে কেবল রূপকথাশ্রিত কাহিনী-পরিবেশনের মাধ্যমে গল্পরস ও নীতি-প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য নিহিত, সে-ক্ষেত্রে ‘নিয়তি কি অবনতি’র কাহিনী বাস্তব-সমস্যার সামাজিক ভূমি থেকে উত্থিত। চিরায়ত প্রণয়-কাহিনী পরিবেশনের জন্যে তিনি পুরাণের সাহায্য গ্রহণ করেন, তার প্রমাণ মেলে ‘হজরত ইউসোফ’ (‘প্রেম-পারিজাত’) কিংবা ‘তহমিনা’য়। পবিত্র কোরআন শরিফ ও প্রচলিত লোকপুরাণ থেকে চয়ন করেন ইউসুফ-জোলেখার প্রণয়-কাহিনী। পারস্য-পুরাণ ‘তহমিনা’র কাহিনীর উৎস। এক ভিন্ন আঙ্গিকে শ্রæতি ও স্মৃতিনির্ভর নীল-চাষ ও বিদ্রোহের কাহিনী বিবৃত হয় ‘উদাসীন পথিকের মনের কথা’য় (১৮৯০)। সমকালীন ইতিহাসের এক শিল্পগাঢ় রূপ এই গ্রন্থ। এর বহিরঙ্গে অত্যাচারী নীলকরের কথা ও কাহিনী, আর অভ্যন্তরে প্রচ্ছন্ন আছে রিপু-শাসিত মানব-মানবীর স্খলন-পতনের দুঃখময় পরিণতি। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার আলোকে উদ্ভাসিত মীরের অভিনব নকশা ‘গাজী মিঁয়ার বস্তানী’। তীব্র ব্যঙ্গ-কৌতুক-শ্লেষের মধ্য দিয়ে মানবপ্রকৃতির রহস্যঘন স্বরূপ এখানে উন্মোচিত। ইতিহাসের এক মর্মন্তুদ মানবিক ট্র্যাজেডিকে তিনি রূপ দিয়েছেন ‘বিষাদ-সিন্ধু’তে (১৮৮৫-৯১)। সেইসঙ্গে গভীর শৈল্পিক মমতায় উদঘাটিত করেছেন অচরিতার্থ প্রণয়ের বেদনায় জর্জরিত এক অসহায় ও নিয়তি-লাঞ্ছিত মানবের হৃদয়গত উপলব্ধিকে। মূলত ইতিহাসে তিরস্কৃত ও ধর্মপ্রাণ মানুষের কাছে ঘৃণিত এক চরিত্রের প্রেম-তাড়িত বিফল কামনা-বাসনার প্রকৃতি ও পরিণাম চিত্রণই এই উপাখ্যানের মূল লক্ষ্য।
তিন.
‘বিষাদ-সিন্ধু’ বাংলা সাহিত্যের একটি ধ্রæপদি গ্রন্থ। শিল্পবোধ, জীবনানুভূতি ও ভাষাসৌকর্যে ‘বিষাদ-সিন্ধু’ মশাররফ হোসেনের এক স্মরণীয় সাহিত্যকীর্তি। মীরের অসামান্য লোকপ্রিয়তা ও ব্যাপক পরিচিতির মূলেও আছে এই বই। কারবালার মর্মন্তুদ ঘটনাকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে এই উপাখ্যানের কাহিনী। ‘মহরম পর্ব্ব’, ‘উদ্ধার পর্ব্ব’, ‘এজিদবধ পর্ব্ব’- ‘বিষাদ-সিন্ধু’র এই তিনটি পর্ব স্বতন্ত্রভাবে প্রকাশিত হয় যথাক্রমে ১৮৮৫, ১৮৮৭ ও ১৮৯১ সালে। শেষ পর্ব প্রকাশের পরে একসঙ্গে এর তিন পর্বের অখণ্ড সংস্করণ প্রকাশিত হয়। মশাররফ ‘বিষাদ-সিন্ধু’র প্রথম সংস্করণ ‘মাত’ সম্বোধনে উৎসর্গ করেন টাঙ্গাইলের দেলদুয়ার এস্টেটের জমিদার করিমন্নেসা খানমকে। অবশ্য মশাররফের সঙ্গে তাঁর ‘অন্নদাত্রী’ করিমন্নেসার সম্পর্কের অবনতির কারণে পরবর্তী সংস্করণে এই উৎসর্গপত্রটি প্রত্যাহার করে নেন। ‘বিষাদ-সিন্ধু’ রচনায় মশাররফ ‘সংবাদ প্রভাকরে’র সহকারী সম্পাদক ভুবনচন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের (১৮৪২-১৯১৬) বিশেষ সহায়তা পেয়েছিলেন বলে জানা যায়। ভুবনচন্দ্র ‘বিষাদ-সিন্ধু’কে ‘উত্তমরূপে শোধন করিয়া বিশুদ্ধ বঙ্গভাষায় সজ্জিত করেন’। অবশ্য এই তথ্যের যথার্থতা নির্ণয় এখন আর সম্ভব নয়।
চার.
কারবালার ঘটনাকে কেন্দ্র করে বাংলা সাহিত্যের মধ্যযুগ থেকেই কাব্য-কবিতা রচনার প্রয়াস লক্ষ করা যায়। কারবালা-কাহিনী নিয়ে গড়ে উঠেছে মর্সিয়া সাহিত্যের বিশাল এক ভাণ্ডার। আধুনিককালেও এ-ধারা নিঃশেষিত হয়ে যায়নি। কারবালার ট্র্যাজেডি মাইকেল মধুসূদন দত্ত (১৮২৪-১৮৭৩)-কেও স্পর্শ করেছিল। মহররমের কাহিনী নিয়ে একটি মহৎ মহাকাব্য রচিত হতে পারে বলে তিনি মত পোষণ করেছিলেন।
‘মহরমপর্ব্বে’ লেখকের ‘মুখবন্ধে’ মশাররফ ‘বিষাদ-সিন্ধু’র কাহিনী-উৎস সম্পর্কে জানিয়েছেন : ‘পারস্য ও আরব্য গ্রন্থ হইতে মূল ঘটনার সারাংশ লইয়া ‘বিষাদ-সিন্ধু’ বিরচিত হইল। প্রাচীন কাব্যগ্রন্থের অবিকল অনুবাদ করিয়া প্রাচীন কবিগণের রচনাকৌশল এবং শাস্ত্রের মর্যাদা রক্ষা করা অত্যন্ত দুরূহ।… তবে মহররমের মূল ঘটনাটি বঙ্গভাষাপ্রিয় প্রিয় পাঠক-পাঠিকাগণের সহজে হৃদয়ঙ্গম করিয়া দেওয়াই আমার একমাত্র মুখ্য উদ্দেশ্য।’ তবে সমালোচকেরা মশাররফের এই বক্তব্য অনুমোদনে দ্বিধান্বিত। মুনীর চৌধুরী মশাররফের দাবি সম্পর্কে যৌক্তিক সংশয় পোষণ করেছেন। তিনি দোভাষী পুঁথির সঙ্গে ‘বিষাদ-সিন্ধু’র আন্তরিক সাদৃশ্য আবিষ্কার করে নিশ্চিন্ত হয়েছেন যে মশাররফের অবলম্বন ছিল কারবালা-বিষয়ক জনপ্রিয় বাংলা পুঁথিই। গোলাম সাকলায়েনের অভিমতও অভিন্ন। আনিসুজ্জামান ও মুস্তাফা নূরউল ইসলামও মনে করেন দোভাষী পুঁথিই মশাররফের কাহিনীর প্রেরণা ও মূল উৎস।
পাঁচ.
তিন পর্বে বিভক্ত ‘বিষাদ-সিন্ধু’র ‘মহরম পর্ব্বে’র পরিচ্ছেদ সংখ্যা ছাব্বিশ, ‘উদ্ধারপর্ব্বে’র ত্রিশ ও ‘এজিদবধ পর্ব্বে’র পাঁচ। অবশ্য ‘মহরম পর্ব্বে’র ‘উপক্রমণিকা’ ও ‘উদ্ধার পর্ব্বে’র ‘উপসংহার’কে ধরলে আরো দুটি অধ্যায় বৃদ্ধি পাবে। এখানে পরিচ্ছেদ চিহ্নিত হয়েছে ‘প্রবাহ’ নামে।
‘মহরম পর্ব্বে’ বর্ণিত হয়েছে দামেস্ক-অধিপতি মাবিয়া-পুত্র এজিদের প্রণয়াসক্তি, ব্যর্থতা এবং তার পরিণাম। হাসানপতœী জয়নাবের প্রতি এজিদের প্রণয়-দৌর্বল্য থাকলেও জয়নাবকে সে করায়ত্ত করতে সক্ষম হয়নি। এই ব্যর্থতার সূত্রে হাসানের প্রতি সে বৈরী মনোভাব পোষণ করে এবং তার ষড়যন্ত্রকৌশলে হাসানকে জীবন দিতে হয়। এজিদ হাসান-অনুজ হোসেনকেও ধ্বংস করতে উদ্যত হয় এবং অবশেষে কারবালা প্রান্তরের এক অসম যুদ্ধে অপ্রস্তুত হোসেন নৃশংসভাবে নিহত হন।
‘উদ্ধার পর্ব্বে’র কাহিনী-অংশে আছে বিপন্ন হোসেন-পরিবারের অস্তিত্বরক্ষা এবং ক্রোধান্ধ দুর্জয় বীর মোহাম্মদ হানিফার প্রতিশোধ-গ্রহণের বিবরণ।
‘বিষাদ-সিন্ধু’র শেষখণ্ড ‘এজিদবধ পর্ব্বে’ হানিফার এজিদ-হত্যার প্রচেষ্টা, এজিদের ভূ-গর্ভস্থ গুপ্তকক্ষে পলায়ন ও জ্বলন্ত অগ্নিকুণ্ডে নারকীয় কষ্টভোগ, দৈবনির্দেশে বহু প্রাণক্ষয়কারী হানিফার প্রাকৃতিক বন্দিত্ব এবং হোসেন-বংশধর জয়নাল আবেদীনের রাজ্যলাভের কাহিনী বিবৃত হয়েছে। উপসংহারে লেখক সত্যের জয় ও পাপের পরিণামফল ভোগের অবশ্যম্ভাবিতার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন।
ইতিহাস-সূত্রে জানা যায়, এজিদের সঙ্গে হাসান-হোসেনের বিবাদ-বিরোধ রাজনৈতিক, রাষ্ট্রক্ষমতার দখলই এই দ্ব›েদ্বর মূল কারণ। কিন্তু ‘বিষাদ-সিন্ধু’তে এই বৈরিতার মূল কারণ হিসেবে এজিদের জয়নাব-লাভের তীব্র কামনাই চিহ্নিত। ‘বিষাদ-সিন্ধু’তে জয়নাবই যে এই মহা-ট্র্যাজেডির উপলক্ষ তা তার স্বগতোক্তিতেই জানা যায় : ‘হায়!… আমার নিজ জীবনের আদি অন্ত ঘটনা মনোযোগের সহিত ভাবিয়া দেখিলে প্রত্যক্ষ প্রমাণের সহিত সপ্রমাণ হইবে, এই হতভাগিনীই বিষাদ-সিন্ধুর মূল। জয়নাব এই মহা প্রলয়কাণ্ডের এক মর্মান্তিক কারণ।’ [এজিদবধ পর্ব্ব, তৃতীয় প্রবাহ]।
এ-দিক দিয়ে ‘বিষাদ-সিন্ধু’র সঙ্গে হোমারের ‘ইলিয়াডে’র কাহিনীর কিছু সাদৃশ্য আছে। সেখানেও এক রমণী, হেলেনের কারণেই ঘটে যায় গ্রিক ও ট্রোজানদের মধ্যে বিনাশী সমর, রচিত হয় মানবিক বিপর্যয়ের এক মর্মান্তিক ট্র্যাজেডি।
‘বিষাদ-সিন্ধু’র প্রকরণ-প্রকৃতি বিচারে সমালোচকদের মধ্যে মতভেদ আছে। কেউ কেউ একে ‘ঐতিহাসিক উপন্যাস’ হিসেবে অভিমত পেশ করেছেন (আবদুল লতিফ চৌধুরী, মোহাম্মদ আবদুল আউয়াল)। কারো বিবেচনায় এটি ‘উপন্যাস’ (মুস্তাফা নূরউল ইসলাম)। কেউ একে চিহ্নিত করেছেন ‘গদ্যে-লেখা মহাকাব্য’ ও ‘ইতিহাসাশ্রয়ী রোমান্স হিসেবে’ (ক্ষেত্র গুপ্ত)। কেউ বা আবার সিদ্ধান্ত করেছেন, ‘বিষাদ-সিন্ধু’ ‘… ইতিহাস, উপন্যাস, সৃষ্টিধর্মীয় রচনা ও নাটক ইত্যাদি সাহিত্যের সংবিধ সংমিশ্রণে রোমান্তিক আবেগ মাখানো এক সংকর সৃষ্টি’ (মুহম্মদ আবদুল হাই)।
‘বিষাদ-সিন্ধু’ রচনার পশ্চাতে ইতিহাসচেতনা বা ধর্মীয় উদ্দেশ্য নয়, মানবিক উপলব্ধি ও শিল্পপ্রেরণার প্রভাবই সক্রিয় ছিল বলে সমালোচকদের অনুমান। তাই এই উপাখ্যানে লেখকের ইতিহাসনিষ্ঠা বারবার বিচ্যুত হয়েছে, রূপায়িত হয়নি ধর্মীয় উদ্দেশ্যও।
ছয়.
মহাকাব্যিক ক্যানভাসে অঙ্কিত, ‘বিষাদ-সিন্ধু’তে গৌণ-মুখ্য চরিত্রের এক মহা-মিছিলের সমাবেশ ঘটেছে। তবে সব চরিত্রই কাহিনীর প্রয়োজনে অপরিহার্য নয় কিংবা তারা সমানভাবে প্রস্ফুটিতও হয়নি। অধিকাংশ চরিত্রই বৃত্তাবদ্ধ, তাদের আচরণ বা কর্মের মাধ্যমে সক্রিয় ও স্বতঃস্ফ‚র্ত ভূমিকা পালন করতে পারেনি। ধর্মীয় ক্ষেত্রে বা ইতিহাসে যে-সব চরিত্র শ্রদ্ধেয়, মহিমান্বিত, গুণসমৃদ্ধ তাঁরা এই উপন্যাসে নিতান্তই নি®প্রভ ও নিষ্ক্রিয়।
এজিদই ‘বিষাদ-সিন্ধু’র প্রধান চরিত্র। তার কামনা-বাসনাকে কেন্দ্র করেই এই উপন্যাসের সূচনা এবং তার শোচনীয় বিপর্যয়েই এই কাহিনীর সমাপ্তি। তার কর্মকাণ্ডকে অবলম্বন করেই ‘বিষাদ-সিন্ধু’র কাহিনী পল্লবিত হয়ে উঠেছে। লেখক এজিদ চরিত্র-চিত্রণে যতটা আন্তরিক ও মনোযোগী, অন্য চরিত্র অঙ্কনে ততখানি নিবিষ্ট হতে পারেননি। রিপুশাসিত রক্ত-মাংসের একজন মানুষের প্রকৃতি, প্রবণতা ও বাস্তবতা নিয়ে এজিদ চরিত্রটি উপস্থাপিত। এ-প্রসঙ্গে মুনীর চৌধুরীর বিশ্লেষণ স্মরণীয় : ‘গ্রন্থের সর্বাপেক্ষা স্পষ্ট এবং প্রদীপ্ত চরিত্র এজিদের। তার চিন্তায়-আচরণে, আবেগে-অভিব্যক্তিতে এমন একটা দৃঢ় গাঢ় ঔজ্জ্বল্য আছে যে অন্যান্য চরিত্র তার পাশে নিতান্ত মর্যাদাহীন বলে মনে হয়। নীতিবিদের দৃষ্টিতে এজিদের ক্রিয়াকর্ম যত গর্হিত ও অভিশপ্ত বিবেচিত হোক না কেন, চরিত্র বিচারের সাহিত্যিক মানদণ্ডে এজিদের মতো প্রাণময় পূর্ণাবয়ব পুরুষ সমগ্র উপন্যাসে দ্বিতীয়টি নেই। এজিদ পাপী, ধর্মদ্রোহী এবং ইন্দ্রিয়পরবশ। কিন্তু এজিদের পাপের প্রকৃতি অসামান্য, তার বিকাশ প্রলয়ঙ্করী, তার পরিণাম যেমন ভয়াবহ, তেমনি শোকাবহ।’
এজিদের রূপতৃষ্ণাই তার ট্র্যাজিক পরিণতির জন্যে দায়ী। রূপজমোহের তীব্র আগুনে এজিদ অসহায় প্রেম-পতঙ্গের মতোই দগ্ধ হয়েছে সারাজীবন। ইতিহাসে এজিদের যে রাজনৈতিক অভিপ্রায় বিবৃত, তা এই উপন্যাসে অনুপস্থিত। এখানে মহানবী (সা.)-এর দৌহিত্র হাসান-হোসেনের সঙ্গে এজিদের দ্ব›েদ্বর মূল কারণ হিসেবে এক রমণীর প্রতি তার তীব্র প্রণয়-কামনাই নির্দেশিত হয়েছে। রাজ্য নয়, রমণীই তার লক্ষ্য। উপাখ্যানে স্পষ্টই বিবৃত হয়েছে : ‘এজিদ রাজ্যের প্রয়াসী নহেন, সৈন্যসামন্ত ও রাজমুকুটের প্রত্যাশী নহেন, রাজসিংহাসনের আকাক্সক্ষী নহেন। তিনি যে রতেœর প্রয়াসী, তিনি যে মহামূল্য ধনের প্রত্যাশী তাহা তাঁহার পিতার মনের অগোচর, বুদ্ধির অগোচর।’ [মহরম পর্ব্ব, প্রথম প্রবাহ]।
উপন্যাসের সূচনাতেই এজিদ তার মনের গোপন আকাক্সক্ষা আবেগকম্পিত কণ্ঠে প্রকাশ করেছে : ‘পিতঃ আমার দুঃখ অনন্ত, এ দুঃখের সীমা নাই, উপশমের উপায় নাই। আমি নিরূপায় হইয়াই জগতের আশা হইতে একেবারে বহুদূরে দাঁড়াইয়াছি। আমার বিষয় বিভব, ধনজন ক্ষমতা সমস্তই অতুল, তাহা আমি জানি। … কিন্তু আমার অন্তর যে মোহিনী মূর্ত্তির সুতী² নয়নবানে বিদ্ধ হইতেছে, সে বেদনার উপশম নাই। পিত! সে বেদনার প্রতিকারের প্রতিকার নাই। যদি থাকিত তবে বলিতাম।… আর বলিবার সাধ্য নাই। হয় দেখিবেন না হয় শুনিবেন,- এজিদ বিষপান করিয়া যেখানে শোকতাপের নাম নাই, প্রণয়ে হতাশ নাই, অভাব নাই এবং আশা নাই, এমন কোন নির্জ্জন স্থানে এই পাপময় দেহ রাখিয়া সেই পবিত্রধামে চলিয়া গিয়াছে।…’ [মহরম পর্ব্ব, প্রথম প্রবাহ]।
জয়নাবের প্রতি এজিদের প্রেমাসক্তির তীব্রতা সম্পর্কে লেখক উল্লেখ করেছেন : ‘এজিদের শিরায় শিরায়, শোণিতবিন্দুর প্রতি পরমাণু-অংশে, প্রতি শ্বাস-প্রশ্বাসে, শয়নে-স্বপ্নে জয়নাব-লাভের চিন্তা অন্তরে অবিরতভাবে রহিয়াছে।’ [মহরম পর্ব্ব, তৃতীয় প্রবাহ]। আবার অন্যত্র বলেছেন : ‘এজিদ ত পূর্ব্ব হইতেই জয়নাবরূপে আত্মসমর্পণ করিয়া বসিয়া আছে। যেদিন জয়নাবকে দেখিয়াছে, জয়নাবের অজ্ঞাতে সেদিন এজিদের নয়ন-চকোর জয়নাবের মুখচন্দ্রিমার পরিমলসুধা পান করিয়াছে, সেইদিন এজিদ জয়নাবকেই মনঃপ্রাণ সমর্পণ করিয়া জয়নাব রূপসাগরে আত্মবিসর্জ্জন করিয়াছে, জয়নাবকেই জপমালা করিয়া দিবানিশি জয়নাব-নাম জপ করিতেছে। জয়নাব ধ্যান, জয়নাব জ্ঞান।’ [মহরম পর্ব্ব, চতুর্থ প্রবাহ]।
জয়নাবের-প্রেমে উন্মাদ-প্রায় এজিদ তার ‘রাজ্যসুখ তুচ্ছ’ ও ‘প্রাণ পর্য্যন্ত পরিত্যাগ’ করতে উদ্যত। হাসান-হোসেনের ‘বধসাধনের জন্য’ মদিনায় সৈন্যদল প্রেরণে তার কোনো রাজনৈতিক অভিপ্রায় ছিল না। এজিদের মনোগত আকাক্সক্ষা উন্মোচিত হয় যখন মন্ত্রী মারওয়ানকে সেনাদলের অধিনায়ক নির্বাচন করে আবেগী ভাষায় সে বলে : ‘ভাই মারওয়ান! … যদি এজিদের মানরক্ষা করিতে চাও, যদি এজিদের অন্তরাগ্নি নির্বাণ করিতে চাও, যদি এজিদের মনের দুঃখ দূর করিতে চাও, যদি এজিদের জয়নাবলাভের আশা-তরী বিষাদ-সিন্ধু হইতে উদ্ধার করিতে চাও, তবে এখনই অগ্রসর হও আর পশ্চাতে ফিরিও না।’ [মহরম পর্ব্ব, দশম প্রবাহ]।
এজিদ একনিষ্ঠ প্রেমিক। তার প্রেমে খাদ নেই, কপটতা নেই। বন্দিনী জয়নাবকে লক্ষ করে উচ্চারিত বক্তব্যে প্রণয়কাতর অন্তরের মর্মকথাই প্রকাশিত হয়েছে : ‘এ ভীষণ সমর কাহার জন্য? এ শোণিতপ্রবাহ কাহার জন্য? কি দোষে এজিদ আপনার ঘৃণার্হ? কি কারণে এজিদ আপনার চক্ষের বিষ? কি কারণে দামেস্কের পাটরাণী হইতে আপনার অনিচ্ছা?’ [উদ্ধার পর্ব্ব, তৃতীয় প্রবাহ]।
এজিদের প্রণয়াকাক্সক্ষা মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়েও- আত্মবিনাশের পদধ্বনি শুনেও জাগ্রত থাকতে জানে। মোহাম্মদ হানিফার আক্রমণে সন্ত্রস্ত এজিদ আত্মরক্ষার জন্যে যখন পলায়নোদ্যত তখনও তার মনের গভীরে লালিত জয়নাবের স্মৃতি তাকে আলোড়িত করে : ‘বন্দীগৃহ চক্ষে পড়িল। এজিদের চক্ষে দামেস্কের বন্দীগৃহ পড়িতেই তাঁহার মন যেন কেমন করিয়া চমকিয়া উঠিল। এমন সঙ্কট সময়েও এজিদের মন যেন কেমন করিয়া উঠিল। যে রূপ হৃদয়ের নিভৃত স্থানে লুকাইয়া ছিল, সরিয়া আসিল।’ [এজিদবধ পর্ব্ব, চতুর্থ প্রবাহ]।
এজিদের জীবন বেদনা, অচরিতার্থতা আর অসাফল্যে পূর্ণ। যে-জয়নাবের জন্যে এজিদ মনুষ্যত্ব ও নৈতিকতার সকল সীমা অতিক্রম করে চরম নিষ্ঠুরতার পরিচয় দিয়েছে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তার জয়নাব-লাভের আশা ফলবতী হয়নি, বরঞ্চ বলি হয়েছে বহুসংখ্যক মানুষের জীবন। কৃতকর্মের জন্যে তার মনে অনুশোচনা জেগেছে, আত্মদ্ব›দ্ব আর বিবেক-দংশনে জর্জরিত হয়ে বলে সে : ‘কেন হেরিলাম? সে জ্বলন্ত রূপরাশির প্রতি কেন চাহিলাম? হায়! হায়! সেই এক দিন, আর আজ এক দিন! কি প্রমাদ! প্রেমের দায়ে কি না ঘটিল? কত প্রাণ-ছি! ছি! কত প্রাণের বিনাশ হইল।’ [উদ্ধার পর্ব্ব, ঊনবিংশ প্রবাহ]। তীব্র শোচনাজাত আত্মগøানি আর অন্তরের প্রচ্ছন্ন হাহাকারে দীর্ণ এজিদের এই স্বগতোক্তি তার চরিত্রের একটি ভিন্ন দিকের পরিচয় তুলে ধরে।
এজিদ-চরিত্রে নিষ্ঠুরতা-নির্মমতা, দানবীয় পৈশাচিকতা, অমানবিক আচরণ- সবকিছুরই ব্যাখ্যা পাওয়া যায় তার প্রণয়-তৃষ্ণার সূত্রে। প্রণয়ে ব্যর্থতা ও দয়িতার প্রত্যাখ্যানের মর্মপীড়া তার অন্তরে যে প্রতিহিংসার ক্রোধবহ্নি জ্বেলেছে তাতেই ভস্মীভূত হয়েছে সকল মানবিক গুণাবলি, নীতিবোধ ও স্বাভাবিক বিবেচনাশক্তি। এজিদ স্পষ্টই বলেছে : ‘আমি যাহার জন্য প্রাণ পর্য্যন্ত পরিত্যাগ করিতে প্রস্তুত, আমি যাহার জন্য রাজ্যসুখ তুচ্ছ করিয়া এই কিশোর বয়সে জীবন পর্য্যন্ত বিসর্জ্জন করিতে অগ্রগামী, যাহার জন্য এতদিন কষ্ট সহ্য করিলাম, সেই জয়নাবকে হাসান বিবাহ করিবে? এজিদের চক্ষে তাহা কখনই সহ্য হইবে না। এজিদের প্রাণ কখনই তাহা সহ্য করিতে পারিবে না।… জয়নাবলাভের প্রতিশোধ এবং সমুচিত শাস্তি অবশ্যই এজিদ তাহাদিগকে দিবে। আমার মনে যে ব্যথা দিয়াছে, আমি তাহা অপেক্ষা শত সহস্রগুণে তাঁহাদের মনে ব্যথা দিব। এখনই হউক বা দুদিন পরেই হউক, এজিদ বাঁচিয়া থাকিলে ইহার অন্যথা হইবে না; এই এজিদের প্রতিজ্ঞা।’ [মহরম পর্ব্ব, ষষ্ঠ প্রবাহ]।
প্রকৃতপক্ষে প্রণয়-প্রত্যাশাই ঘটনাপ্রবাহের মাধ্যমে এজিদকে ক্রমান্বয়ে আসক্ত, মুগ্ধ, অভিভূত, হতাশ, রক্তাক্ত, উদ্ভ্রান্ত, ক্রোধান্বিত, প্রতিশোধস্পৃহ ও অনুশোচনাদগ্ধ করে তোলে। প্রণয়ের অভিঘাতে এজিদের এই যে রূপান্তর তা তাকে বহুমাত্রিক চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের অধিকারী করে তুলেছে। ‘রূপজমোহ যে হৃদয়কে সম্পূর্ণরূপে অধিকার করিয়া বসিয়াছে, সে হৃদয় যথার্থ মানব-হৃদয় হইলেও সময়ে সময়ে পশুভাবে পরিণত হয়’ (উদ্ধারপর্ব্ব, একবিংশ প্রবাহ)- প্রণয়-ব্যর্থ এজিদের মাত্রা-অতিক্রমী প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে লেখকের এই ব্যাখ্যা অযথার্থ নয়।
এজিদ-চরিত্র সৃষ্টিতে মশাররফ ‘মেঘনাদবধ কাব্যে’র রাবণ-চরিত্রের দ্বারা প্রভাবিত হন বলে অনুমান করা যায়। পুরাণ ও ইতিহাসের এই দুই ‘ভিলেন’ চরিত্র উনিশ শতকীয় নবচেতনায় প্রাণিত দুই মহৎ শিল্পীর হাতে নতুন তাৎপর্য ও ব্যঞ্জনা নিয়ে প্রকাশিত হয়েছে। অমিত শক্তির অধিকারী এই দুই চরিত্রেই নিয়তি-নির্ধারিত বিপর্যয় ও পতন সম্পূর্ণ মানবিক এবং করুণা ও দীর্ঘশ্বাস উদ্রেককারী। কাজী আবদুল ওদুদ এজিদ-চরিত্রের পরিকল্পনায় রাবণ-চরিত্রের সাদৃশ্য ও প্রভাব নির্দেশ করেছেন। তবে সমালোচকের সতর্ক বীক্ষণে যথার্থই উদঘাটিত হয়েছে যে : ‘… মধুসূদনের বেলায় ব্যক্তিগত সহানুভূতি ও শৈল্পিক দৃষ্টিভঙ্গির কোনো বিরোধ ঘটেনি- পক্ষান্তরে মশাররফ হোসেন শিল্পী ও ব্যক্তি-চৈতন্যের টানাপোড়েনে ক্ষত-বিক্ষত, রক্তাক্ত’ (আবু হেনা মোস্তফা কামাল)।
‘প্রচণ্ড প্রতাপে, নিষ্ঠুর নির্যাতনে, ঈর্ষা-হিংসা, ক‚ট-ষড়যন্ত্রণা ও প্রবঞ্চনা প্রবণতায়’ এজিদ যে মহাভারতের দুর্যোধনের সমগোত্রীয়,- সে-ধারণাও কেউ কেউ পোষণ করেছেন (হাসান আজিজুল হক)।
এজিদ কেবল ‘বিষাদ-সিন্ধু’র কেন্দ্রীয় চরিত্রই নয়, কাহিনীর নিয়ন্ত্রকশক্তিও সে। হাসান-হোসেন বা কারবালার কাহিনী এই উপন্যাসে উপলক্ষ মাত্র, মূল লক্ষ্য এজিদ, তার প্রেমতৃষ্ণার ভয়াবহ পরিণাম-নির্দেশ। তাই ‘শিল্পী মশাররফ এজিদ-চরিত্র রূপায়ণেই তাঁর শ্রেষ্ঠ মনোযোগ অর্পণ করেছিলেন’ (আবু হেনা মোস্তফা কামাল)।
এই উপন্যাসে পাপ ও প্রেমের অবস্থান সমান্তরাল। প্রেম তার জীবনকে আনন্দ-সুখে পূর্ণ করেনি, পক্ষান্তরে পাপ তার জীবনকে বেদনা-বিষে করে তুলেছে জর্জরিত। নিয়তি-নির্ধারিত এক মানবভাগ্যের করুণ পরিণতি নেমে এসেছে এজিদের জীবনে। প্রণয়-বঞ্চিত আত্মদ্ব›েদ্ব পরাভূত এক বিক্ষত মানুষের করুণ মর্মস্পর্শী কাহিনী হয়ে উঠেছে ‘বিষাদ-সিন্ধু’। যথার্থই, ‘ইতিহাসের প্রকৃত মরুপ্রান্তর নয়, এজিদের প্রেমদীর্ণ হৃদয়ই এখানে কারবালায় রূপান্তরিত হয়েছে। বিষাদের উত্তাল তরঙ্গসমূহের উৎস এজিদের হৃদয়-সিন্ধু’ (মুনীর চৌধুরী)
সাত.
একমাত্র এজিদই ‘বিষাদ-সিন্ধু’র প্রাণবন্ত চরিত্র, যার বিকাশ ও বিবর্তন আছে। অন্যসব চরিত্রই ভালো বা মন্দ এই মোটা দাগে বিভক্ত। ধর্ম, ন্যায়, নীতি ও সত্যের সপক্ষে ভূমিকা পালন করেছেন হাসান, হোসেন, হানিফা, গাজী রহমান, আজর ও জয়নাব। মারওয়ান, সীমার, জাএদা, মায়মুনা ঈর্ষা, স্বার্থ, লোভ, নিষ্ঠুরতার প্রতীক। মাবিয়া এবং অলিদ চরিত্র কিছুটা ভিন্নধর্মী। মাবিয়া এজিদের পিতা হলেও পুত্রের সব অন্যায় ও দুষ্কর্মই তিনি অনুমোদন করেননি। তাঁর সচেতন বিবেকের পরিচয় মেলে ‘মহররম পর্ব্বে’র ষষ্ঠ প্রবাহে। এজিদ-সেনাপতি অলিদ-চরিত্রেও বিবেকবোধ ও বিবেচনাশক্তির পরিচয় আছে।
ধর্মপ্রাণ হাসান ও হোসেন চরিত্রে সদ্গুণাবলীর অনুশীলন ও পরিচয় ‘বিষাদ-সিন্ধু’তে অত্যন্ত স্পষ্ট ও সার্থকভাবে প্রতিফলিত। হাসান-চরিত্র সম্পর্কে সমালোচকের উক্তি : ‘… ইমাম হাসানের চরিত্র বাস্তবিক বড় মধুর করে ‘বিষাদ-সিন্ধু’কার এঁকেছেন। যে বৃদ্ধ নিজের মনের বিষে তাঁকে বর্শা ফেলে মেরেছিল তার প্রতি ও তাঁর প্রাণঘাতী স্ত্রী জাএদার প্রতি তাঁর যে ব্যবহার তা বড় সৌজন্যময়’ (কাজী আবদুল ওদুদ)।
হোসেনও ধর্মপ্রাণ সজ্জন, তাঁর মধ্যে কর্তব্যবোধ, নির্ভীকতা, আবেগপ্রবণতা, ক্ষমাশীলতা ও সরলতার প্রকাশ আছে। তবে এজিদের সঙ্গে প্রতিতুলনায় হোসেন অনুজ্জ্বল ও নি®প্রভ। তাঁর ভূমিকা অনেকটাই পূর্ব-নির্ধারিত। তবুও অভাবিত মানবিক সংকটের মুখে যখন অস্তিত্ব বিপন্নপ্রায় তখনও চিন্তা ও আচরণে হোসেন অনেক বেশি জীবন্ত ও প্রাণময়। নারীচরিত্রের মধ্যে জয়নাব, জাএদা ও মায়মুনা উল্লেখযোগ্য। এক অর্থে, ‘বিষাদ-সিন্ধু’র কাহিনী অনুসারে জয়নাবই এই বিনাশী সমর-সংঘাতের মূল কারণ। তার সঙ্গে ‘ইলিয়াডে’র হেলেনের তুলনা মনে আসে। সামগ্রিক বিচারে জয়নাবই ‘বিষাদ-সিন্ধু’র নায়িকা। তার অন্তর্দহন ও ট্র্যাজেডিও গভীর। এই চরিত্রটির পরিকল্পনাতেও ‘মেঘনাদবধ কাব্যে’র সীতা-চরিত্রের সাদৃশ্য আছে। সমালোচকের সাক্ষ্য : ‘… ‘মেঘনাদবধে’র সীতা-চরিত্রের মাধুর্য ও কোমলতার অনেকখানি সমাবেশ ঘটেছে ‘বিষাদ-সিন্ধু’র জয়নাব-চরিত্রে। গ্রন্থের শেষের দিক জয়নাবের যে দীর্ঘ আত্মবিলাপ রয়েছে তার সঙ্গে সীতা ও সরমার কথোপকথনের সাদৃশ্য সহজেই চোখে পড়ে’ (কাজী আবদুল ওদুদ)। তবে হাসান-হোসেন যেমন এজিদ-চরিত্রের পাশাপাশি অনুজ্জ্বল, তেমনি জয়নাবও জাএদার কাছে নি®প্রভ।
জাএদা ‘বিষাদ-সিন্ধু’ উপাখ্যানের সবচেয়ে প্রাণবন্ত নারী-চরিত্র। জাএদা স্বভাবে-আচরণে অনেকটাই এজিদের সমানধর্মা। সে এজিদের মতোই প্রেমের দাবি পূরণ করতে গিয়ে নির্মম-নিষ্ঠুর-অমানবিক হতে বিন্দুমাত্র দ্বিধাবোধ করে না। সামান্যতম হলেও, এজিদের অনুশোচনাবোধ আছে, কিন্তু জাএদা চরিত্রে তার লেশটুকুও মেলে না। এ-কথা মানতেই হয়, জাএদা চরিত্রে ‘প্রেমিক নারীর ঈর্ষা এবং সপতœীদ্বেষের তীব্র রূপ’ প্রকাশিত হয়েছে এবং তা ‘একটি অসাধারণ নারীচরিত্রের মনস্তাত্তি¡ক বিকারের ছবি’। ‘জাএদা বাঁচিয়া থাকিতে স্বামী ভাগ করিয়া লইবে না’ (মহরম পর্ব্ব, ত্রয়োদশ প্রবাহ)- এই উপলব্ধি থেকেই জাএদার মনে প্রতিহিংসা জাগ্রত হয়েছে, জন্ম নিয়েছে ঈর্ষা। মায়মুনার সঙ্গে আলাপচারিতায় তার অন্তরের গভীর বেদনা প্রকাশিত হয়েছে : ‘যে আমার হইল না, আমার মুখের দিকে যে ফিরিয়া তাকাইল না, আমার মুখের দিকে যে ফিরিয়া তাকাইল না, তাহাকে ঔষধে বশ করিয়া লাভ কি বোন।’ [মহরম পর্ব্ব, ত্রয়োদশ প্রবাহ]। স্বামীসঙ্গবঞ্চিতা এক ব্যথিত নারীর করুণ আর্তিই এখানে ফুটে উঠেছে। প্রেম-প্রত্যাখ্যাতা জাএদার একসময় মনে হয়েছে, ‘এখন শীঘ্র মরণ হইলেই আমি নিস্তার পাই’ (মহরম পর্ব্ব, ত্রয়োদশ প্রবাহ)। মায়মুনা যখন তাকে স্বামী-হত্যার পরামর্শ দিয়েছে তখন সে এই প্রস্তাব তীব্রভাবে অগ্রাহ্য করে বলেছে : ‘… এই দুঃখে যদি মরিয়াও যাই, আরও শত শত প্রকার দুঃখ যদি ভোগ করি, সপতœী-বিষম বিষে আরও যদি জর্জ্জরিত হই পরমায়ুর শেষ পর্য্যন্ত যদি এই দুঃখের শেষ না হয়, তথাপিও উহা পারিব না; আমার স্বামী আর আমি- আমার প্রাণের প্রাণ- কলিজার টুকরা আর আমি-।’ [মহরম পর্ব্ব, ত্রয়োদশ প্রবাহ]।
একদিকে মায়মুনার প্রলোভন, প্ররোচনা, ক‚ট-পরামর্শ ও সপতœীসঙ্গের অন্তর্জ্বালা, অপরদিকে স্বামীর প্রতি গভীর অনুরাগ, প্রীতি ও আকর্ষণ- এই টানাপড়েনে ক্ষণিক মুহূর্তের জন্যে হলেও জাএদার অন্তর ক্ষতবিক্ষত হয়েছে : ‘জাএদা মলিনমুখী হইয়া উঠিয়া গেলেন। যেখানে গেলেন, সেখানেও স্থির হইয়া বসিতে পারিলেন না। পুনরায় নিজ কক্ষে আসিয়া শয়ন করিলেন। একদিকে রাজভোগের লোভ, অপরদিকে স্বামীর প্রণয়, এই দুইটী ক্রমে ক্রমে তুলনা করিতে লাগিলেন। কতবার পরিবর্তন করিলেন, দুরাশা-পাষাণ ভাঙ্গিয়া তুলাদণ্ড মনোমত ঠিক করিয়া অসীম দুঃখভার চাপাইয়া দিলেন, তথাচ স্বামীর প্রাণের দিকেই বেশি ভারী হইল। কিন্তু জয়নাবের নাম মনে পড়িবামাত্রই পরিমাণদণ্ডের যেদিকে স্বামীর প্রাণ, সেইদিক একেবারে লঘু হইয়া উচ্চে উঠিল।’ [মহরম পর্ব্ব, ত্রয়োদশ প্রবাহ]।
এই গভীর আত্মদ্ব›দ্ব স্বামীনিধনের আয়োজনের মুহূর্তে আবার জেগে উঠেছে, কিন্তু তা ক্ষণিক বিদ্যুৎ-চমকের মতোই মিলিয়ে গিয়ে শেষ পর্যন্ত জয়ী হয়েছে ঈর্ষা আর লোভ : ‘… অল্পে অল্পে দ্বার মুক্ত করিয়া গৃহের মধ্যে প্রবেশ করিয়া জাএদা দেখিলেন দীপ জ্বলিতেছে। এমাম হাসান শয্যায় শায়িত- জয়নাব বিমর্ষবদনে হাসানের পদ দুখানি আপন বক্ষে রাখিয়া শুইয়া আছেন।… জাএদা বিষের পুঁটুলি খুলিতে আরম্ভ করিলেন। খুলিতে খুলিতে ক্ষান্ত দিয়া কি ভাবিয়া আর খুলিলেন না। হাসানের মুখের দিকে চাহিয়া রহিলেন। ক্রমে ক্রমে মুখ, বক্ষ, উরু ও পদতল পর্য্যন্ত সর্ব্বাঙ্গে চক্ষু পড়িলে সে ভাব থাকিল না। তাড়াতাড়ি বিষের পুঁটুলি সোরাহীর মুখের কাপড়ের উপর সমুদয় হীরকচূর্ণ ঢালিয়া দিলেন।’ [মহরম পর্ব্ব, ষষ্ঠদশ প্রবাহ]।
সপতœীবাদের এই যে বিষময় ফল ‘বিষাদ-সিন্ধু’তে বিবৃত হয়েছে, তাতে মশাররফের ব্যক্তিজীবনের অভিজ্ঞতা ছায়া ফেলেছে বলে সমালোচকের যে ধারণা আমাদের বিবেচনায় তা অমূলক নয়। এই ধারণার সমর্থনে আজীজন-কুলসুমের দ্ব›েদ্ব মীরের বিড়ম্বিত দাম্পত্য জীবনের কথা এখানে পাঠকের সহজেই মনে পড়বে।
‘বিষাদ-সিন্ধু’ উপন্যাসের চরিত্র-চিত্রণে মশাররফ হোসেনের সাফল্য ও সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে কাজী আবদুল ওদুদ যে সংক্ষিপ্ত অথচ প্রাসঙ্গিক আলোচনা করেছেন তা গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর বিবেচনায়, মশাররফের সৃষ্ট চরিত্রসমূহ পূর্ণাবয়ব লাভ করতে পারেনি মূলত তাঁর কবিসুলভ আবেগোচ্ছ¡াসের জন্যে। ধর্ম ও আদর্শের অনুশীলন যাঁদের চরিত্রে সর্বাধিক, তাঁরা রক্তমাংসের মানুষ হিসেবে প্রতিষ্ঠা না পেয়ে হয়ে উঠেছে ‘ধর্মাচারের সমষ্টি-মাত্র’। তবে এর বাইরে একমাত্র সীমার ব্যতীত অন্যান্য চরিত্র ‘স্বাভাবিক মানুষ’ হিসেবেই আবির্ভূত হয়েছে, কেউই নিরঙ্কুশ ‘অমানুষ’ বা ‘শয়তান’ হিসেবে চিত্রিত হয়নি।
আট.
পুঁথির জগৎ থেকে মশাররফ ‘বিষাদ-সিন্ধু’র কাহিনী চয়ন করলেও এই উপাখ্যানে তিনি যে শিল্পবোধের স্বাক্ষর রেখেছেন তা বিশেষ উল্লেখযোগ্য। আয়তন ও স্বভাবে মহাকাব্যিক লক্ষণাক্রান্ত এই রচনার প্রধান বৈশিষ্ট্য এর ভাষাসম্পদ। সমকালে ‘বিষাদ-সিন্ধু’র আলোচনায় সঙ্গত কারণেই এর ভাষা-প্রসঙ্গই বেশি গুরুত্ব ও বিবেচনা লাভ করেছে। পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত অভিমত বিশ্লেষণ করলে সহজেই মীরের ভাষা-সাফল্যের স্বরূপ বোঝা যায়।
‘গ্রামবার্ত্তা প্রকাশিকা’ (১১ জ্যৈষ্ঠ ১২৯২) ‘বিষাদ-সিন্ধু’র ভাষার বিশুদ্ধতার প্রশ্নে মন্তব্য করে, ‘বিষাদ-সিন্ধু’র মতো গ্রন্থ ‘বঙ্গভাষা বিস্তৃতির আর একটি নূতন পথ’ এবং এর ফলে ‘মাতৃভাষা বাঙ্গালার প্রতি মুসলমানদিগের শ্রদ্ধা’ জন্মাচ্ছে। ‘ইতিপূর্বে একজন মুসলমানের এত পরিপাটী বাঙ্গলা রচনা আর দেখিয়াছি বলিয়া মনে হয় না’- ‘সিন্ধু’র ভাষাকে লক্ষ্য করে ‘ভারতী’র (ফাল্গুন ১২৯৩) এই মন্তব্যে ‘সুলভ সমাচার’ (১৯ বৈশাখ ১২৯৩) কিংবা ‘ঢাকা প্রকাশে’র (৪ আশ্বিন ১২৯৩) মতেরই প্রতিধ্বনি শোনা যায়। ‘চারুবার্ত্তা’র (২৩ জ্যৈষ্ঠ ১২৯২) সমালোচনায় বলা হয়, ‘বিষাদ-সিন্ধু’ রচয়িতার ‘লিপিশক্তি অতি মনোহর’, ‘ভাষা বিশুদ্ধ মধুর ও লালিত্যপূর্ণ’। মশাররফের মতো ‘বিশুদ্ধ ও সুমধুর বাঙ্গালা’ যে অনেক শিক্ষিত হিন্দুও লিখতে পারেন না, সেই কথাটিও আলোচক স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন।
কাব্যের দ্যোতনা, আবেগের স্পন্দন, ধ্বনির ব্যঞ্জনা আর অলঙ্কারের প্রাচুর্য, ‘বিষাদ-সিন্ধু’র ভাষা-শরীরে এক ধরনের শ্রী ও কান্তি এনে দিয়েছে- অনায়াসেই স্বতন্ত্র স্বাদ অনুভব করা যায় এই ভাষায়। যেমন : ‘যে নগরের সুখসাগরের তরঙ্গের উপর তরঙ্গ খেলা করিতেছিল, মহানন্দের স্রোত বহিতেছিল, রাজপ্রাসাদ, রাজপথ, প্রধান প্রধান সৌধ আলোকময় পরিশোভিত হইয়াছিল, ঘরে ঘরে নৃত্য সহিত বাজনার ধূম পড়িয়াছিল, রঞ্জিত পতাকাসকল হেলিয়া জয়সূচক চিহ্ন দেখাইতেছিল- তৎসমুদয় বন্ধ হইয়া গেল। মুহূর্ত্তমধ্যে মহানন্দবায়ু থামিয়া বিষাদ-ঝটিকা বেগে রহিয়া রহিয়া বহিতে লাগিল। মাঙ্গলিক পতাকারাজি নতশিরে হেলিতে দুলিতে পড়িয়া গেল। রাজপ্রাসাদের বাদ্যধ্বনি, নূপুরের ঝন্ঝন্ সুমধুর কণ্ঠস্বর আর কাহারও কর্ণে প্রবেশ করিল না। সুহাস্য আস্ফালন বিষাদকালিমা রেখায় মলিন হইয়া গেল।’ [উদ্ধার পর্ব্ব, ষষ্ঠ প্রবাহ]। উৎসব-আনন্দে মুখর রমণীয় প্রফুল্ল পরিবেশ বিপক্ষ ঘটনায় আকস্মিকভাবে কেমন নীরব ও নিরানন্দ হয়ে গেল তার একটি উজ্জ্বল ছবি এখানে অঙ্কিত হয়েছে।
‘বিষাদ-সিন্ধু’র ভাষায় আবেগ আছে, চিত্রধর্মিতা, নাটকীয়তা আছে, আছে গীতিময়তা, গতিশীলতাও। এজিদের প্রেমতৃষ্ণা, অন্তর্জ্বালা, আবেগ, অস্থিরতা ও মনোদ্ব›দ্ব প্রকাশে এই ভাষার সহায়তা উল্লেখযোগ্য। যেমন, রূপজ মোহে আচ্ছন্ন বিভ্রান্ত-বিক্ষত এজিদের ট্র্যাজিক-উপলব্ধির প্রকাশ : ‘প্রথম কথাতেই জয়নাবের মনের ভাব এজিদ অনেক জানিতে পারিয়াছেন, তাঁহার হস্তে সুতী² ছুরিকাও দেখিয়াছেন, সে অস্ত্র এজিদের বক্ষে বসিবে না; যাঁহার অস্ত্র, তাঁহারই বক্ষ, তাঁহারই শোণিত,- কিন্তু বিনা আঘাতে, বিনা রক্তপাতে, নিজ হৃদয়ের রক্ত যে আজীবন শরীরের প্রতি লোমক‚প হইতে অদৃশ্যভাবে ঝরিতে থাকিবে, তাহাও এজিদ বুঝিয়াছিলেন।’ [উদ্ধার পর্ব্ব, একবিংশ প্রবাহ]। জয়নাব-প্রত্যাখ্যাত এজিদের অতৃপ্ত প্রেমাকাক্সক্ষা ও আহত পৌরুষ যখন বিক্ষুব্ধ অভিমানে চঞ্চল হয়ে ওঠে তখন একজন প্রেম-ভিক্ষু বিপর্যস্ত মানুষের প্রতিকৃতি পাঠকের সম্মুখে উদ্ভাসিত হয়।
সদ্য-বিবাহিত, যুদ্ধাহত কাসেমের অন্তিমকাল যখন আসন্ন, তখন তিনি শোণিতসিক্ত দেহে পতœী সখিনার কাছে উপস্থিত হন। এইসময়ে তাঁর যে আচরণ ও উক্তি তাতে নাটকীয়তা ফুটে উঠেছে : ‘… কাসেমের পরিহিত শুভ্রবসন লোহিতবর্ণে রঞ্জিত হইয়াছে, শোণিতধারা অশ্বপদ বহিয়া পড়িতেছে। কাসেম অশ্ব হইতে নামিয়া সখিনাকে বলিলেন, ‘সখিনা। দেখ, তোমার স্বামীর শাহানা পোষাক দেখ। আজ বিবাহ সময়ে উপযুক্ত পরিচ্ছেদে তোমাকে বিবাহ করি নাই, কাসেমেরই দেহবিনির্গত শোণিতধারে শুভ্রবসন লোহিতবর্ণে পরিণত হইয়া বিবাহবেশ সম্পূর্ণ করিয়াছে। এই বেশ তোমাকে দেখাইবার জন্য বহুকষ্টে শত্রুদল ভেদ করিয়া এখানে আসিয়াছি। আইস, এই বেশে তোমাকে একবার আলিঙ্গন করিয়া প্রাণ শীতল করি। সখিনা! আইস, এই বেশেই আমার মানসের চিরপিপাসা নিবারণ করি।’ [মহরম পর্ব্ব, পঞ্চবিংশ প্রবাহ]।
‘বিষাদ-সিন্ধু’র ভাষার বড়ো বৈশিষ্ট্য এর কাব্যধর্মিতায়। নির্বাচিত তৎসম শব্দের ব্যবহার, ক্রিয়াপদের পৌনঃপুনিক প্রয়োগ, অনুপ্রাসের ধ্বনিতরঙ্গ, ‘সিন্ধু’র গদ্যকে অনেকসময় কাব্যের কাছাকাছি পৌঁছে দেয়। মীরের শিল্প-স্বভাবের একান্ত অনুবর্তী ছিল এই প্রবণতা, সে-কারণেই বোধহয় ‘বিষাদ-সিন্ধু’কে তিনি আখ্যাও দিয়েছে ‘মহাকাব্য’ বলে। তাঁর আবেগনির্ভর গীতল গদ্যের নমুনা : ‘এখন এজিদের চক্ষে জল নাই। তাঁহার বিশাল বিস্ফারিত যুগলচক্ষে এখন আর জল নাই।… যদি কিছু পড়িবার হয়, যদি এজিদের অক্ষিদ্বয় হইতে এইক্ষণে কিছু পড়িবার থাকে, তবে কি পড়িবে?… না, না, না, সে জল নহে! যে দুইএক ফোঁটা পড়িবে, সে দুইএক ফোঁটা জল নহে- জল হইবার কথা নহে। মর্ম্মাঘাতের আহতস্থানের বিকৃত শোণিতধার, মর্ম্মাঘাতে ক্ষতস্থানের রক্তের ধারা, দুই চক্ষু ফাটিয়া পড়িবে। জগৎ দেখিবে,- এজিদের চক্ষে জল পড়ে নাই।’ [উদ্ধার পর্ব্ব, ঊনত্রিংশ প্রবাহ]। এজিদের অন্তরের শুশ্রƒষাহীন বেদনা ও রক্তক্ষরণের এই আবেগময় প্রকাশ যে গদ্য ও কাব্যের ব্যবধান কমিয়ে আনে, সে-কথা অকুণ্ঠচিত্তে বলা যায়।
শিল্প ও ভাষারীতিতে বঙ্কিমচন্দ্রের কাছে মশাররফের ঋণ উল্লেখযোগ্য। বঙ্কিমের সংযম ও পরিমিতিবোধ মশাররফের ভাষায় অনুপস্থিত থাকলেও বঙ্কিমিগদ্যের প্রবাহমানতা, গীতল-স্বভাব, আবেগ ও অলঙ্কার-শোভার বৈশিষ্ট্য এখানে দুর্লক্ষ্য নয়। ভাব ও ভাষায় মাঝে-মধ্যে আশ্চর্য সাদৃশ্য আবিষ্কার সম্ভব। যেমন নিচের দুটি অংশের সঙ্গে ‘চন্দ্রশেখর’ উপন্যাসের প্রাসঙ্গিক অংশের তুলনা করা যেতে পারে। প্রেমজ মোহে আচ্ছন্ন বিরহতাপিত দীর্ণ-হৃদয় এজিদের খেদোক্তি : ‘হয় দেখিবেন, না হয় শুনিবেন, এজিদ বিষপান করিয়া যেখানে শোকতাপের নাম নাই, প্রণয়ে হতাশা নাই, অভাব নাই, এমন কোন নির্জ্জন স্থানে এই পাপময় দেহ রাখিয়া সেই পবিত্রধামে চলিয়া গিয়াছে।’ [মহরম পর্ব্ব, প্রথম প্রবাহ]। এ-ছাড়া, আসন্ন বিচ্ছেদ-মুহূর্তে কাসেমের প্রতি সখিনার আবেগ-গাঢ় উচ্চারণ স্মরণীয় : ‘যেখানে শত্রুর নাম নাই, এজিদের ভয় নাই, কারবালা প্রান্তরও নাই, ফোরাত-জলের পিপাসাও যেখানে নাই সেইস্থানে যেন আমি তোমাকে পাই…।’
উদ্ধৃত অনুচ্ছেদদ্বয়ের সঙ্গে বঙ্কিমের ‘চন্দ্রশেখর’ উপন্যাসের উপসংহার-মন্তব্যের ভাব-ভাষাগত সাদৃশ্য আদৌ কষ্ট-কল্পনা নয় : ‘তবে যাও, প্রতাপ, অনন্তধামে। যাও, যেখানে ইন্দ্রিয়জয়ে কষ্ট নাই, রূপে মোহ নাই, প্রণয়ে পাপ নাই, সেইখানে যাও, যেখানে রূপ অনন্ত, প্রণয় অনন্ত, সুখ অনন্ত, সুখে অনন্ত পুণ্য, সেইখানে যাও।’ [অষ্টম পরিচ্ছেদ, যুদ্ধক্ষেত্রে]।
‘বিষাদ-সিন্ধু’তে মীর বঙ্কিম-বিদ্যাসাগরের প্রচলিত ভাষারীতিই অনুসরণ করেছেন। এখানে তৎসম শব্দের প্রাধান্যের তুলনায় আরবি-ফারসি শব্দের সংখ্যা অতি নগণ্য। তাও যে তিনি এইসব শব্দ স্বেচ্ছায় ও স্বতঃস্ফ‚র্তভাবে ব্যবহার করেছেন তা নয়। এ-বিষয়ে ‘বিষাদ-সিন্ধু’র প্রথম সংস্করণের মুখবন্ধে তিনি জানিয়েছিলেন : ‘শাস্ত্রানুসারে পাপভয়ে ও সমাজের দৃঢ় বন্ধনে বাধ্য হইয়া ‘বিষাদ-সিন্ধু’ মধ্যে কতকগুলি জাতীয় শব্দ ব্যবহার করিতে হইল।’ তবুও তিনি স্বজাতি ও স্বধর্মীয়দের নিন্দা ও বিরূপ সমালোচনা এড়াতে পারেননি। ‘উদ্ধার পর্ব্বে’র চতুর্থ প্রবাহে তিনি উল্লেখ করেছেন, ‘পয়গম্বর এবং এমামদিগের নামের পূর্ব্বে বাঙ্গালাভাষায় ব্যবহার্য শব্দে সম্বোধন’ করার কারণে ‘স্বজাতীয় মূর্খদল হাড়ে হাড়ে চটিয়া রহিয়াছেন’। মশাররফ ব্যথিত চিত্তে আক্ষেপ করে বলেছেন, ‘শাস্ত্রের খাতিরে’, ‘সমাজের কঠিন বন্ধন’ ও ‘দৃঢ় শাসনে’ নিয়ন্ত্রিত হওয়ার কারণে ‘কল্পনা-কুসুমে আজ মনোমত হার গাঁথিয়া পাঠক-পাঠিকাগণের পবিত্র গলায় দোলাইতে পারিলাম না’। ভাষা-ব্যবহারে তাঁর ছিল উদার দৃষ্টিভঙ্গি ও মুক্তমন। এখানে একজন লেখক-ব্যক্তিত্বের আন্তরিক উপলব্ধি ও সচেতন ভাষাশিল্পীর পরিচয় খুঁজে পাওয়া যায়।
মশাররফের ভাষা-বৈশিষ্ট্যের সর্বাধিক সিদ্ধি ও সাফল্যের পরিচয় পাওয়া যায় এই বইয়ে। সামগ্রিক বিচারে ‘বিষাদ-সিন্ধু’ই যে মীরের শ্রেষ্ঠ গদ্য-নিদর্শন, এ-কথায় বোধকরি কোনো দ্বিমত হবে না।
দশ.
বাংলা সাহিত্যে মশাররফের স্থান-নির্দেশ করতে গিয়ে ব্রজেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় (১৮৯১-১৯৫২) বিদ্যাসাগরের সঙ্গে তাঁর প্রতিতুলনা করে যে-মন্তব্য করেছিলেন, ‘বিষাদ-সিন্ধু’র প্রেক্ষাপটে মশাররফ হোসেনের মূল্যায়ন-প্রসঙ্গে সেই উক্তি বিশেষভাবে স্মরণযোগ্য : ‘বিদ্যাসাগর মহাশয়ের ‘সীতার বনবাস’ বাংলাদেশের ঘরে ঘরে যেমন এককালে পঠিত হইয়াছিল, ‘বিষাদ-সিন্ধু’ তেমনই আজও পর্য্যন্ত জাতীয় মহাকাব্যরূপে বাঙালী মুসলমানের ঘরে ঘরে পঠিত হয়; বাংলা-সাহিত্যের অপূর্ব্ব সম্পদ হিসাবে সকল সমাজেই এই গদ্যকাব্যখানির সমান আদর।… তাঁহার সাহিত্য-প্রতিভা এমনই উচ্চশ্রেণীর ছিল যে, সুদূর অতীতের কারবালা-প্রান্তরের ট্রাজেডিকে তিনি সমগ্র বাংলাভাষাভাষীর ট্রাজেডি করিয়া তুলিতে পারিয়াছেন।’
এগারো.
‘বিষাদ-সিন্ধু’ নিয়তি-লাঞ্ছিত মানবভাগ্যের এক মর্মস্পর্শী গদ্য-মহাকাব্য। একদিকে নীতি, ন্যায় ও সত্য এবং অপরদিকে মানবের কামনা-বাসনা ও শিল্পের দায়- এই দুই টানাপড়েনে মশাররফ দ্বিধাবিভক্ত হয়েছেন। মশাররফের ধর্মচেতনা ও স্বজাতির কাছে দায়বদ্ধতা তাঁকে অনিবার্যভাবে হাসান-হোসেনের পক্ষাবলম্বী করে তুলেছে, এখানে সত্যের জয়-বন্দনায় তাঁর মনোযোগ নিবেদিত। কিন্তু শিল্পী মশাররফের সহানুভূতি ও মমত্ববোধ যে এজিদের প্রতিও ধাবিত, তা-ও বিস্মৃত হওয়া চলে না। বাহ্যত হাসান-হোসেনের প্রতি তাঁর পক্ষপাত, কিন্তু শিল্প-মনোরাজ্যের গভীরে ‘দুরাত্মা’ এজিদই আন্তরিক অনুরাগ ও মমতায় প্রতিষ্ঠিত। শিল্পী মশাররফের অভিপ্রায়ের বিজয় সাধিত হয়েছে এই ধর্মাশ্রিত কাহিনীর শিল্প-রূপায়ণে। ইতিহাসের মর্মান্তিক ট্রাজিক-ঘটনা শেষ পর্যন্ত পরিণত হয়েছে এক প্রেম-পতঙ্গের আত্মহননের আধুনিক রূপকথায়।
1
ঈদ সাময়িকী ২০১৬'র আরও সংবাদ
http://www.bhorerkagoj.net/print-edition/2016/07/04/96667.php

বাংলা সাহিত্যে মহররম

বাংলা সাহিত্যে মহররম
Picture_24_Feather
ম. মী জা নু র র হ মা ন
আরবি মাস ‘মহররম’-এর ১০ তারিখ প্রতিটি মুসলমান ব্যক্তি-মানসে শোক দিবস হিসেবে চিহ্নিত। এই দিন ইরাকের ফোরাত নদীর তীরে কারবালা মরুভূমির প্রান্তরে হজরত মোহাম্মদ (সা.) দৌহিত্র হোসেন (রা)কে সপরিবারে নির্মমভাবে হত্যা করে এজিদ। অতঃপর ইসলামের ইতিহাসে গণতন্ত্র ও সাম্যবাদ নিঃশ্চিহ্ন হয়ে যায় এবং স্বৈরশাসনাধীন রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়। স্মরণাতীতকালের সেই বিয়োগান্তক কাহিনীভিত্তিক ইতিহাস বাংলা গদ্যে, কাব্য-সাহিত্যে ‘মহরম’ হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আসছে যুগযুগ ধরে। মীর মোশাররফ হোসেন (১৮৪৭-১৯১১) তাঁর সুলিখিত গদ্য-কাব্যে ‘বিষাদ-সিন্ধু’ উপন্যাসটি রচনা করেন। এই উপন্যাসের জনপ্রিয়তা অদ্যাবধি অবিস্মরণীয়। সেই উপন্যাসের অংশবিশেষ নীচে দেয়া হলÑ
কারবালার পর-
রে পথিক! রে পাষানহৃদয় পথিক! কি লোভে এত ত্রস্তে দৌড়িতেছ? কি আশায় খ-িত শির বর্ষার অগ্রভাগে বিদ্ধ করিয়া লইয়া যাইতেছ? এ শিরে- হায়! এ খ-িত শিরে তোমার প্রয়োজন কি?
সীমার! এ শিরে তোমার আবশ্যক কি? হোসেন তোমার কি করিয়াছিল? তুমি ত আর জয়নবের রূপে মোহিত হইয়াছিলে না? জয়নব এমাম হাসানের স্ত্রী, হোসেনের শির তোমার বর্শাগ্রে কেন? তুমিই বা সেই শির বর্শাগ্রে লইয়া ঊর্ধ্বশ্বাসে এত বেগে দৌড়িতেছ কেন? যাইতেছই বা কোথায়?
সীমার! একটু দাঁড়াও! আমার প্রশ্নের উত্তর দিয়া যাও, কার সাধ্য তোমার গমনে বাধা দেয়? কার ক্ষমতা তোমাকে কিছু বলে? একটু দাঁড়াও, এ শিরে তোমার স্বার্থ কি? খ-িত শিরে তোমার স্বার্থ কি? খ-িত শিরে তোমার প্রয়োজন কি?
অর্থ?
হায় রে অর্থ! হায় রে পাতকী অর্থ! তুই জগতে সকল অনর্থের মূল। জীবের ধ্বংস, সম্পত্তির বিনাশ, পিতা-পুত্রে শত্রুতা, স্বামী-স্ত্রীতে মনোমালিন্য, ভ্রাতা-ভগ্নিতে কলহ, রাজা-প্রজায় বৈরী ভাব, বন্ধু-বান্ধবে বিচ্ছেদ! বিবাদ-বিসংবাদ, কলহ, বিরহ, বিসর্জন, বিবাদ, বিনাশ এ সকলই তোমার জন্য। সকল অনর্থের মূল ও কারণই তুমি। তোমার কি মোহিনী শক্তি! কি মধুমাখা বিষসংযুক্ত প্রেম, রাজা-প্রজা, ধনী-নির্ধন, যুবক-বৃদ্ধ সকলেই তোমার জন্য ব্যস্ত-মহাব্যস্ত-প্রাণওষ্ঠাগত। তোমাবই জন্য কেবলমাত্র তোমারই কারণে-কতজনে তীর, তরবারি, বন্দুক, বর্শা, গোলাগুলি অকাতরে বক্ষ পাতিয়া বুকে ধরিতেছে। তোমারই জন্য অগাধ জলে ডুবিতেছে, ঘোর অরণ্যে প্রবেশ করিতেছে, পর্বত শিখরে আরোহণ করিতেছে। রক্ত, মাংশপেশি, পরমাণু সংযোজিত শরীর তোমারই জন্য শূন্যে উড়াইতেছে। কি কুহক! কি মায়া॥ কি মোহিনী শক্তি!!! তোমার কুহকে কে না পড়িতেছে? তুমি দূর হও! তুমি দূর হও!!! কবির কল্পনার পথ হইতে একেবারে দূর হও! কবির কল্পনার পথ হইতে একবারে দূর হও। কবির চিন্তাধারা হইতে একেবারে সরিয়া যাও। তোমার নাম করিয়া কথা কহিতে অঙ্গ শিহরিয়া ওঠে। তোমারই জন্য প্রভু হোসেন সীমার হস্তে খ-িত!- রাক্ষসি! তোমারই জন্য খ-িত শির বর্শাগ্রে বিদ্ধ!...”
মীর মোশাররফ হোসেনের ‘বিষাদ-সিন্ধু’ কাহিনী নির্মাণ সম্পর্কে মহাশ্মশান মহাকাব্যের ¯্রষ্টা মহাকবি কায়কোবাদের মতে ঐতিহাসিক সত্য থেকে তথা বিচ্যুতি তখা “ইসলামের হৃদয়-পন্জরে তীব্র শেলাঘাত।” তাই তিনি “মহরম শরীফ বা আত্মবিসর্জন” (মুসলমান কবি-রচিত জাতীয় আথ্যান -কাব্য পৃ৪৪৯। আধুনিক বাংলা সাহিত্যে মুসলিম সাধনা- ড. কাজী আব্দুল মান্নান)।
মোহাম্মদ কাজেম আল কোরেশী ওরফে মহাকবি কায়কোবাদ (১৮৫৭- ১৯৫১) “মহরম শরীফ বা আত্মবিসর্জন” রচনা করেছিলেন শুধু মীর মোশাররফ হোসেনের ‘বিষাদ-সিন্ধু’ কাহিনীর সত্য ইতিহাসটিকে উপস্থাপন করার মানসে। প্রতিটি সর্গে প্রথম থেকে চতুর্থ সর্গ পর্যন্ত তিনি অমিত্রাক্ষর ছন্দে অতি চমৎকারভাবে ঐতিহাসিক বিবরণাদি ফুটায়ে তুলেছেন। এখানে তিনি নাটকীয় রূপদান করেছেন প্রত্যেকটি সর্গে যাতে পাঠক সম্পূর্ণ ঐতিহাসিক সত্যটি চিত্রায়িত দেখতে পান আপন মনের অন্দরমহলে। যেমন প্রথম সর্গ [কারবালা মোআল্লা;-ফোরাত নদী-তীর; মহরম মাসের ৩ তারিখ- শুক্রবার ৬১ হিজরী]
এই কি কারবালা সেই?-এই সেই স্থান? এই
সেই মহামরু? হেরিলে যাহারে
অশ্রু ঝরে দু’নয়নে কেঁদে ওঠে প্রাণ?
কত কথা পড়ে মনে, শিরায় শিরা
প্রচ- অনল-স্রোত হয় প্রবাহিত;
প্রাণের নিভৃত কক্ষে- হৃদয়ে- কন্দরে
কি যে এক শোক- স্মৃতি হয় উচ্ছসিত!Ñ
Ñযেই স্থানে, কি বলিব বুক ফেটে যায়,
মহাম্মদ মোস্তাফার আদরের ধন,
ফাতেমার হৃদি-রতœ নয়নের মণি,
বীরশ্রেষ্ঠ মোর্তজার ¯েœহের নন্দন,
ইশ্লাম ধর্মের আলোÑসৌন্দর্যের খনি
হোসেন তাপস শ্রেষ্ঠ, আপন শোণিতে
প্রক্ষালিত মোশ্লেমের পাপতাপরাশি
দিয়াছিলা ধর্মযুদ্ধে আপনার প্রাণ,
এই কি কার্বালা সেইÑএই সে শ্মশান!...” এইভাবে ৫ পৃষ্ঠা থেকে ১৫৮ পৃষ্ঠাব্যাপী মহাকবি কায়কোবাদ চিত্রায়িত করেছেন সমগ্র হৃদয়বিদারক মর্মন্তদ কাহিনীটি।
সবার উপরে জ্বালাময়ী আখরে লিখেছেন ‘মোহররম’ বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম (১৮৯৯-১৯৭৬)।
ওরে বাঙলার মুসলিম, তোরা কাঁদ্!
এনেছে এজিদী বিদ্বেষ পুনঃ মোহররমের চাঁদ॥
এক ধর্ম ও এক জাতি তবু ক্ষুধিত সর্বনেশে
তখতের লোভে এসেছে এজিদ কম্বখ্তের বেশে!
এসেছে “সীমার”, এসেছে, কুফা’র বিশ্বাসঘাতকতা,
ত্যাগের ধর্মে এসেছে লোভের প্রবল নির্মমতা!
মুসলিমে মুসলিমে আনিয়াছে বিদ্বেষের বিষাদ,
কাঁদে আসমান জমিন, কাঁদিছে মোহাররমের চাঁদ।...”
লেখক: কবি, প্রাবন্ধিক, অনুবাদক
https://www.dailyinqilab.com/article/42393/বাংলা-সাহিত্যে-মহররম

বিষাদ-সিন্ধু

বিষাদ-সিন্ধুimages
বিষাদ-সিন্ধু কারবালার যুদ্ধক্ষেত্রকে উপাত্ত করে রচিত মীর মশাররফ হোসেনের ঐতিহাসিক উপন্যাস। এটি যথাক্রমে ১৮৮৫, ১৮৮৭ ও ১৮৯১ সালে তিন ভাগে প্রকাশিত হয়; পরবর্তীতে সেগুলো এক খ-ে মুদ্রিত হয়।
বিষাদ-সিন্ধুর প্রধান চরিত্রগুলো নামের দিক থেকে ঐতিহাসিক, কিন্তু ঘটনা বর্ণনায় ও চরিত্র সৃষ্টিতে কাল্পনিক। এই গ্রন্থে কিছু উপকাহিনী আছে, যেগুলো যথার্থ ঐতিহাসিক নয়। গ্রন্থের মুখবন্ধে লেখক মীর মশাররফ হোসেন লিখেছেন, ‘পারস্য ও আরব্য গ্রন্থ হইতে মূল ঘটনার সারাংশ লইয়া বিষাদ-সিন্ধু বিরচিত হইল।’ লক্ষণীয় বিষয়, মীর মশাররফ হোসেন বিষাদ-সিন্ধু গ্রন্থে বর্ণিত ঘটনাসমূহ কোন কোন আরবি এবং ফারসি গ্রন্থ হতে সংগ্রহ করেছেন তার নাম উল্লেখ করেননি। এ কারণে ‘সমালোচকবৃন্দ’ লেখকের ‘বক্তব্য অনুমোদনে দ্বিধান্বিত’। মুনীর চৌধুরী লেখকের দাবি সম্পর্কে যৌক্তিক সংশয় পোষণ করেছেন। তিনি দোভাষী পুঁথির সঙ্গে বিষাদ-সিন্ধুর বেশ সাদৃশ্য আবিষ্কার করে নিশ্চিন্ত হয়েছেন যে, মশাররফের অবলম্বন ছিল কারবালা বিষয়ক জনপ্রিয় বাংলা পুঁথিই। গোলাম সাকলায়েনের অভিমতও অভিন্ন। আনিসুজ্জামান ও মুস্তাফা নূরউল ইসলামও মনে করেন, দোভাষী পুঁথিই মশাররফের কাহিনির প্রধান প্রেরণা ও মূল উৎস। কাজী আবদুল মান্নান অনুমান করেছেন, গ্রন্থটির প্রতি ধর্মপ্রাণ মুসলমান সমাজের শ্রদ্ধা এবং আকর্ষণ সৃষ্টির জন্যই মশাররফ কাহিনি-উৎসের প্রশ্নে আরবি-ফারসি গ্রন্থেও প্রসঙ্গটি উত্থাপন করেন।
মীর মশাররফ হোসেনের বিষাদ-সিন্ধুর মূল বিষয়বস্তু হচ্ছেÑ হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর প্রিয় দৌহিত্র ইমাম হোসেনের মৃত্যুর জন্য দায়ী ঘটনাসমূহ। অবশ্য ইমাম হোসেনের মৃত্যুর ফলে যে সব ঘটনা ঘটেছিল তারও বর্ণনা রয়েছে এ গ্রন্থে। বিষাদ-সিন্ধু উপন্যাসের প্রধান চরিত্রগুলোর সন্ধান ইতিহাসে পাওয়া যায়, কিন্তু কোনো কোনো অপ্রধান চরিত্রের উল্লেখ বা সন্ধান ঐতিহাসিক কোনো গ্রন্থে পাওয়া যায় না। কিন্তু গবেষকের সিদ্ধান্তÑ‘যেহেতু ইতিহাসের ওপর ভিত্তি করেই এই গ্রন্থ রচিত হয়েছে, সুতরাং এটিকে ঐতিহাসিক উপন্যাস বলা যায়।’
এতে একই সঙ্গে উপন্যাসের চরিত্রচিত্রণ, মানবজীবনের দুঃখ-যন্ত্রণা, হিংসা-বিদ্বেষ ইত্যাদি যেমন চিত্রিত হয়েছে তেমনি ইতিহাসের পটভূমিকায় সিংহাসন নিয়ে দ্বন্দ্ব, সংগ্রাম, রক্তপাত, হত্যাকা- ইত্যাদি বর্ণিত হয়েছে। সারকথা বিষাদ-সিন্ধুতে বর্ণিত ইতিহাসের চরিত্র ও ইতিহাসের লক্ষণকে প্রত্যক্ষ করে গবেষক একে ঐতিহাসিক উপন্যাসের মর্যাদা দিতে দ্বিধা করেননি। তবে এতে এমন কিছু ঘটনার উল্লেখ আছে যেগুলো ইতিহাসের আলোকে বিচার করা চলে না। এমনকি বাস্তব জীবনেও সেগুলোর অস্তিত্ব সম্পর্কে সন্দেহ পোষণ করা চলে, যেমন-কিছু অতিপ্রাকৃত ঘটনা, এগুলোর কোনোটির উৎপত্তি ধর্মীয় বিশ্বাসে, আবার কোনটির উৎপত্তি ঐন্দ্রজালিক শক্তিতে ও আস্থায়।
বিষাদ-সিন্ধুর সূচনা হচ্ছেÑহযরত মুহম্মদ (সা.)-এর এক ভবিষ্যদ্বাণীতে এবং ভবিষ্যদ্বাণী সত্যে পরিণত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে গ্রন্থের উপসংহার হবে। এই ভবিষ্যদ্বাণী ছাড়াও এতে কিছু অতিপ্রাকৃত ঘটনার উল্লেখ রয়েছে। যেমন-এজিদের চোখের সামনে থেকে হোসেনের খ-িত শির অদৃশ্য হওয়া, কারবালা প্রান্তরের বৃক্ষ থেকে রক্তক্ষরিত হওয়া, হোসেনের মৃতদেহের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার সময় হোসেনের পিতা-মাতার মর্ত্যে আগমন এবং দ্ইু পাহাড়ের মধ্যবর্তীস্থানে হানিফার বন্দি হওয়া ইত্যাদি। কোনো উপন্যাসে কেবল বাস্তব জীবনের ঘটনা চিহ্নিত হলে তাকে সাধারণত উপন্যাস হিসেবে গণ্য করা হয় না। কিন্তু বিষাদ-সিন্ধুতে বাস্তব ঘটনা এবং অতিপ্রাকৃত বিষয়ের অবতারণা করা হলেও তা পাঠকদের অবিশ্বাস উদ্রেক করে না। বিষাদ-সিন্ধুর ঘটনাস্থল ও ঘটনাকাল সপ্তম শতাব্দীর আরব দেশ।
এ উপন্যাস বিচারকালে কোনো কোনো গবেষক সেই বিশেষ যুগের ও মানুষের বিশ্বাসের কথাটি মনে রাখার পক্ষে মত দিয়ে বলেছেন, হযরত মুহম্মদ (সা.)-এর বংশধররা যদি দৈবশক্তিতে বিশ্বাসী হন, আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই। কারণ তারা বিশ্বাস করতেন, বিধাতার স্থিরিকৃত পথ থেকে কেউ বিচ্যুত হতে পারে না। বিষাদ-সিন্ধু পাঠকালে কখনো কখনো মনে হয় যেন ইমাম হাসান ও ইমাম হোসেন রক্তমাংসের কোনো মানুষ নয়, কেননা তারা সম্পূর্ণরূপে দৈবের ওপর নির্ভরশীল এবং তারা কেউ নিজেদের কৃতকর্মের ফলের জন্য নিজেদের দায়ী বলে মনে করে না। অপরদিকে এজিদ, জায়েদা, মায়মুনা এবং মরওয়ানÑএরা পাষ- হলেও এদের অনেকটা রক্তমাংসের মানুষ মনে হয়। কারণ এরা মনে করে, তাদের বর্তমান ক্রিয়াকর্মের ফলেই ভবিষ্যৎ ঘটনাবলি প্রভাবান্বিত হবে। এজিদ হযরত মুহম্মদ (সা.)-এর বংশধরদের সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়ে অনবরত সংগ্রাম করতে থাকে, কিন্তু সর্বক্ষণই এজিদ আপন বাহুবল ও কলাকৌশলের ওপর নির্ভর করে। কিন্তু ইমাম হাসান এবং ইমাম হোসেন মৃত্যুকে বরণ করে বিনা প্রতিবাদে, বিনা প্রতিরোধে। কেননা, তারা বিশ্বাস করেÑবিধাতার অভিপ্রায়ই তাই, ফলে তাকে মৃত্যুবরণ করতে হবে।
মীর মশাররফ হোসেন জন্মগ্রহণ করেন ঊনবিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগে এবং তিনি যে পরিবেশে বেড়ে ওঠেন সেটি ছিল সে-যুগের পূর্ববর্তী সময়ের রীতিনীতি ও বিশ্বাসদ্বারা লালিত। অধিকাংশ গবেষক বিষাদ-সিন্ধুকে মহাকাব্যের সঙ্গে তুলনা করে বলেছেন, ‘এতে রয়েছে মহাকাব্যের বিশাল পটভূমি। এটি ব্যক্তির সঙ্গে ব্যক্তির সংঘর্ষের কাহিনি নয়, এ হচ্ছে প্রভুত্ব নিয়ে দুই নৃপতির মধ্যে সংঘর্ষ। এই সংঘর্ষের সঙ্গে জড়িত ছিল বহু লোকের জীবন, বহু লোকের ভাগ্য।’ এতে প্রায় শ’খানেক পাত্রপাত্রী আছে; এর মধ্যে রয়েছে অনেক কাহিনি শাখা-প্রশাখায় বিস্তৃত। হিংসা-বিদ্বেষ জর্জরিত মানুষের কামনা, বাসনা, প্রভুত্বের নিষ্ঠুরতা, রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম, আর এসব ঘটেছিল একটি নারীকে কেন্দ্র করে। ঠিক এমন ঘটনা গ্রিক সাহিত্যের ইলিয়াড মহাকাব্যে ঘটেছিল।
বিষাদ-সিন্ধুর অধিকাংশ ঘটনাই জয়নাবকে কেন্দ্র করে। এজিদ ও ইমাম হাসান-হোসেনের সংঘর্ষের মূল কারণ জয়নাব। জয়নাব সতীসাধ্বী স্ত্রী। প্রথম স্বামী কর্তৃক পরিত্যক্ত হয়ে দ্বিতীয়বার পরিণীতা হন ইমাম হাসানের সঙ্গে। ভাগ্যের পরিহাসে ইমাম হাসানের মৃত্যুর পর তিনি এজিদের কারাগারে বন্দিনী হন। কারাগারে বন্দিনী থাকাকালে তার মনে হতো কারবালার রক্তপাতের জন্য সেই যেন দায়ী। এজিদকে স্বামীত্বে বরণ করে নিলেই তো আর এসব ঘটনা ঘটত না। সাহিত্য সৃষ্টির দিক থেকে মাইকেলের মেঘনাদবধ কাব্যের সীতা-চরিত্রের সঙ্গে জয়নাবের তুলনা করা চলে।
বিষাদ-সিন্ধু পাঠ্যপুস্তক হিসেবেই প্রথমে জনপ্রিয়তা লাভ করে এবং গ্রামে গ্রামে পঠিত হতে থাকে। পরবর্তীতে বিষাদ-সিন্ধুর এই জনপ্রিয়তার সূত্র ধরে বাংলাদেশের জারিগানের আসরে প্রথমত প্রতিযোগিতামূলক অনুষ্ঠানের প্রশ্নোত্তর পর্বে আত্তীকৃত হয়, পরবর্তীতে জারিগানের গীত-নৃত্যমূলক পরিবেশনায় বিষাদ-সিন্ধু পদ্যগীতে রূপান্তরিত হয়ে পরিবেশিত হতে থাকে। আধুনিক বাংলা ভাষার গদ্যরীতিতে রচিত মীর মশাররফ হোসেনের লিখিত সাহিত্য বিষাদ-সিন্ধুর পুরো পাঠটিই বাংলাদেশের নেত্রকোনা অঞ্চলে প্রচলিত জারিগানের আদলে আত্তীকৃত হয়েছে।
বিষাদ-সিন্ধু ও জারিগানের তুলনামূলক পাঠের ভেতর দিয়ে পাঠক-গবেষক স্পষ্টভাবে প্রত্যক্ষ করতে পারবেন, আধুনিক বাংলা ভাষার লিখিত সাহিত্য বিষাদ-সিন্ধু কীভাবে গ্রামের স্বল্পশিক্ষিত ‘বয়াতি’, ‘জারিয়াল’ বা ‘খেলোয়াড়’ কর্তৃক জারিগানের আসরে আত্তীকৃত হয়ে কতটা প্রাণবন্তভাবেই না গ্রামীণ আসরে পরিবেশিত হয়ে থাকে। উপস্থাপিত পাঠের ভেতর দিয়ে মূলত নৃত্য-গীত আশ্রিত জারিপালার আত্তীকৃত পাঠকে প্রত্যক্ষ করা যাবে। কিন্তু মনে রাখা দরকার যে, জারিগানের আসরে লিখিত সাহিত্য বিষাদ-সিন্ধু আত্তীকৃত হওয়ার ইতিহাস হতে জানা যায়, সাধারণত দুইভাবে আত্তীকৃত হয়ে বিষাদ-সিন্ধুর আখ্যান গ্রামীণ আসরে পরিবেশিত হয়ে আসছে। ক্ষেত্রসমীক্ষণে জারিগানের বয়াতিদের ভাষ্যমতে, জারিগানের আসরে বিষাদ-সিন্ধু প্রথমবারের মতো আত্তীকৃত হয়েছিল মূলত প্রতিযোগিতামূলক আসরে প্রশ্নোত্তরের একটি আকর্ষণীয় তথ্যনির্ভর উপাদান হিসেবে, দ্বিতীয়ত, প্রতিযোগিতামূলক জারিগানের আসর হতেই পর্যায়ক্রমে বিষাদ-সিন্ধু গীত-নৃত্য আশ্রিত জারিপালায় প্রবেশ করে বয়াতিদের মুখে মুখে সৃজিত ছন্দের গাঁথুনিতে রূপান্তরিত হয়ে। দ্বিতীয় পর্যায়ে বিষাদ-সিন্ধুর গদ্যরীতি জারিগানের সৃজনশীল বয়াতিদের দ্বারা ছন্দবদ্ধ গীতে রূপান্তরের ক্ষেত্রে মূলত ‘ক্ষুদ্র পয়ার’ বা ‘দীর্ঘ পয়ার’ ছন্দগীত প্রযুক্ত হলেও তাতে বৈচিত্র্য প্রদান করে পালার পয়ারের পূর্বে এবং মধ্যে মধ্যে গীত দোহারদের দিশা-দোহার বা ধুয়া এবং ডাক। দিশা-দোহার বা ধুয়াতে বিচিত্র ছন্দের প্রয়োগ লক্ষ করা যায়। মূলত দোহার-দিশাতেই বিচিত্র ছন্দ প্রয়োগ করা হয়, পালার পয়ারের প্রচলিত কাঠামোর ওপরে সাধারণত ত্রিপদী, চৌপদী ইত্যাদি ছন্দের আবরণ দিয়েই জারিগানে বৈচিত্র্য সৃজন করা হয়। জারিগানের আসরের নৃত্য-গীতের মধ্যে বৈচিত্র্য সৃজন করে দোহার-খোলোয়াগড়দের মুখে উচ্চারিত আরেকটি উপাদান তা হলো ‘ডাক’।
বিষাদ-সিন্ধু কেন্দ্রিক নৃত্য-গীত আশ্রিত জারিগানের আসরে লিখিত সাহিত্য এ উপন্যাসে নির্ধারিত প্রবাহ হতে কখনো মূলপাঠ আবার কখনো মূলপাঠের কথার কাটছাঁট উপস্থাপন করে তার আগে ও পরে ছন্দগীত আকারে জারিপালা পরিবেশন করে থাকেন। মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যে কারবালা বিষয়ক কাব্য রচনায় কবি হায়াত মামুদ, ফকির গরীবুল্লাহ এবং সৈয়দ হামজা সর্বাপেক্ষা কৃতিত্বের পরিচয় দেন। মীর মশাররফ হোসেনের কাহিনিতে কবি হায়াত মামুদ ও ফকির গরীবুল্লাহর কাহিনির সাদৃশ্য লক্ষ করা যায়। পূর্বসূরি ফকির গরীবুল্লাহর রচনা থেকে উপকরণ নিলেও বিষাদ-সিন্ধু গ্রন্থের কাহিনী-নির্বাচন, নির্মাণ ও চরিত্র সৃষ্টি মীর মশাররফের একান্ত নিজস্ব।
সূত্র : বাংলাপিডিয়া

কারবালার শিক্ষা– মুফতি ফজলুল হক আমিনী

কারবালার শিক্ষা– মুফতি ফজলুল হক আমিনী 1940018892899816(রহঃ) [বই রিভিউ – ৪৬২ , রিভিউ লেখক : Ashikul Alam Sajeeb]
MARCH 31, 2017
বইয়ের নাম: কারবালার শিক্ষা
লেখক: মুফতি ফজলুল হক আমিনী (রহঃ)
সাবেক প্রিন্সিপাল ও শায়খুল হাদিস
জামিয়া কোআনিয়া আরাবিয়া,লালবাগ,ঢাকা।
প্রকাশনী: নাদিয়াতুল কুরআন প্রকাশনী
পৃষ্ঠা সংখ্যা: ১১৬
মূল্য: ৮০ টাকা
বিষয়বস্তু : রাসুলুল্লাহ (সাঃ) এর নয়নমনি ও প্রিয় নাতি হযরত হুসাইন (রাঃ) এর শাহাদাতের হৃদয় বিদারক ঘটনা নিয়ে বইটি লেখা।
পর্যালোচনা :
কিছু কিছু অতীত থাকে,যার কারণে ইতিহাস হয়ে উঠে সমৃদ্ধ ও ঘটনাবহুল। সে সবের মাঝে কারবালার ঘটনাও সেই বিশেষত্বেরর সত্যিকার দাবীদার। কারবালার ইতিহাস আজ মুসলিম জাহানের প্রতিটি ঘরে ঘরে মানুষের মুখে মুখে চর্চিত হলেও সঠিক ইতিহাস সম্পর্কে অজ্ঞতার কারণে অনেক নামীদামী জনেরাও এ ক্ষেত্রে মারাত্মক ভ্রান্তির বেড়াজালে নিজেদের জড়িয়ে ফেলেছেন। আজ আলেম সমাজের প্রয়োজন সঠিক ইতিহাস মানুষের সামনে উপযোগ্য করে তুলে ধরা। সময়ের এই তীব্র অনুভূতিতেই বইটি লেখা ।
“কারবালার শিক্ষা ” বইটি প্রকৃত পক্ষে লেখকের ১৯৮৭ সালের ৩রা সেপ্টেম্বর লালবাগ মাদ্রাসাতে ছাত্রদের উদ্দেশ্য পবিত্র আশুরা উপলক্ষে করা আলোচনার লিখিত রূপ। তারপরেও বইটিতে কুরআন,হাদিস,ইতিহাসগ্রন্থের প্রয়োজনীয় রেফারেন্স সংযোজন করা হয়েছে।
হজরত হুসাইন (রাঃ) এর শাহাদাতের ঘটনায় শুধু বিশ্ব মুসলিমই নয়,অমুসলিম সম্প্রদায়ের পাথরসম হৃদয়কোণেও সমবেদনার কম্পন জাগিয়েছে। আকাশের ফেরেশতা থেকে শুরু করে জান্নাতের হুর-পরীসহ পৃথিবীর প্রাণী জগতের প্রতিটি সদস্যের পক্ষে অশ্রু সংবরণ করা কষ্টসাধ্য ব্যাপার।
ইসলামী ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই ঘটনার উপর ভিত্তি করে বিভিন্ন ভাষায় ঐতিহাসিকগণ বহু পুস্তক রচনা করেছেন। বাংলা ভাষায়ও এ ঘটনার উপর কলম চালিয়েছেন অনেক স্বনামধন্য লেখক ও সাহিত্যিক। কিন্তু পরিতাপের বিষয়,অধিকাংশ লেখক এ ঘটনাকে ইতিহাসের নীরিখে রচনা না করে আজবগল্প ও রূপকথার কাহিনীর মত সাজাতে গিয়ে ভাষা ও সাহিত্যের ধুম্রজাল সৃষ্টি করে প্রকৃত ইতিহাসের বিকৃতি সাধনের অপপ্রয়াস চালিয়েছেন বড় চাতুরতার সাথে। আর এ ঘৃণ্য প্রচেষ্টার উদ্ভব নতুন করে নয়,বরং শুরু হয়েছে ইসলামের প্রথম যুগ থেকেই।
কারবালার হৃদয় বিদারক,মর্মস্পর্শী ঘটনা সংঘটিত হওয়ার মূল কারণ কি ছিল,এ সম্পর্কে মুফতীয়ে আজম হযরত মাওলানা মুফতী মুহাম্মদ শফী (রহঃ) বলেন,
” হজরত হুসাইন রাদিয়াল্লাহু আনহুর শহীদি আত্মা এখনও চিরন্তন সত্যের কণ্ঠ নিয়ে পৃথিবীর বুকে গর্জে উঠছে,বিশ্ব মুসলিমকে আহবান জানাচ্ছে এ পথের সংগ্রামে ঝাপিয়ে পড়ার জন্য। কেন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এ পথে অগ্রসর হলেন হযরত হুসাইন (রাঃ)? কিসের তাড়নায় প্রথমে মদিনা থেকে মক্কা,তারপর মক্কা থেকে কূফা হিযরত করলেন তিনি? কেনই বা নিজেকে স্বপরিবারে আল্লাহর রাহে উৎসর্গ করার মানসিকতা তাঁর মাঝে জেগে উঠেছিল? নির্দ্বিধায় বলা যায় যে,হযরত হুসাইস (রাঃ)র ত্যাগ ও কুরানীর একমাত্র উদ্দেশ্য নিন্মোক্ত বিষয় সমূহই ছিল-
১. কুরআন- সুন্নাহর সংবিধান সমাজ জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে সঠিক পদ্ধতিতে প্রতিষ্ঠা করা।
২. ইসলামী দন্ডবিধি নতুন করে পূর্ণাঙ্গভাবে সু- প্রতিষ্ঠিত করা।
৩. রাজতন্ত্রের মুলোৎপাটন করে খেলাফত আলা মিনহাযিন নবুয়্যুতের ভিতকে মজবুত ও শক্তিশালী করে গড়ে তোলা।
৪.সত্যের সংগ্রামে স্বীয় জীবন,ঐশ্বর্য্য এবং ছেলে সন্তানদের মায়া- মমতা কাটিয়ে জীবন উৎসর্গ করা।
৫. ক্ষমতার দাপটের মুখে সত্যের পথে চির সংগ্রামী বীর মুজাহিদগণ যেন নিষ্প্রভ হয়ে না যায়,তার প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখা।
৬. কারো হুংকারে ভীত সন্ত্রস্ত না হয়ে দুঃখে কষ্টে আল্লাহকে স্মরণ রাখা এবং তার উপর পরিপূর্ণ আস্থা স্থাপন করে সর্বাবস্থায় তাঁর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা।
অতঃপর মুসলিম বিশ্বের বর্তমান পরিস্থিতির প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করে অতি আবেগঝরা ভাষায় তিনি বলেন,
” আমাদের সমাজে কি এমন কোন ব্যক্তির আবির্ভাব ঘটবে না যে রাসুলুল্লাহ (সাঃ) এর নয়নমনি,কারবালার প্রান্তরে নির্মমভাবে অত্যাচারিত ও নির্যাতিত হয়ে শাহাদাতের শরাব পানকারী হযরত হুসাইন (রাঃ) এর আহবানে সাড়া দিবে,আর তাঁর উত্তম চরিত্র ও সৎকর্মকে স্বীয় জীবনের একমাত্র লক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করে নিবে?”
” গচ্ছিত আমানত তোমার এই যৌবন,সারা পৃথিবীর
হে ক্ষীণ দূর্বল! সৃষ্টি কর জগত তরে শান্তির নীড়।”
আলোচ্য বইটিতে মোট ২৬ টি শিরোনামে কারবালার প্রকৃত ইতিহাস,এর প্রেক্ষাপট,এর ধারাবাহিক ঘটনাগুলো বর্ণিত হয়েছে। এবং প্রয়োজনীয় রেফারেন্সগুলো সঠিকভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
বইটির শেষের দিকে লেখকের কারবালা শহর সরেজমিনে সফরের একটা বিবরণ দেওয়া হয়েছে খুব সাবলীল ভাষায়।
বইটির সর্বশেষে ” আশুরা সম্পর্কিত মাসায়েল” নামে একটি অধ্যায় রচনা করা হয়েছে। সেখানে আশুরার নামে প্রচলিত বিদাতী কাজসমূহ,
শিয়া সম্প্রদায়ের ভ্রান্ত বিশ্বাস,ইসলামে শোক পালনের বিধান,আশুরা সম্পর্কে মনিষীদের অভিমত ইত্যাদি আলোচিত হয়েছে।
কারবালার প্রকৃত ইতিহাস ও সঠিক শিক্ষা জানার জন্য বইটি সবাইকে পড়ার পরামর্শ দিচ্ছি।

সেকুলার নাস্তিক তসলিমা নাসরিনের চৌর্যবৃত্তি

সেকুলার নাস্তিক তসলিমা নাসরিনের চৌর্যবৃত্তি ।
taslima-3
এখন দেখা যাচ্ছে সব সেকুলার নাস্তিকরা চুরি করে বিখ্যাত হয়েছে । আসলে এরা নৈতিক ভাবেও অসৎ বর্বর ।
তসলিমার আনন্দ পুরস্কার প্রাপ্তির নেপথ্য কাহিনী
Byফরিদ আহমেদ

তসলিমা নাসরিনের গদ্যগ্রন্থ ‘নির্বাচিত কলাম’ প্রকাশিত হয়েছিলো ১৯৯১ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে। এর প্রকাশক ছিলো বিদ্যাপ্রকাশ নামের একটা প্রকাশনী। ‘নির্বাচিত কলাম’ অত্যন্ত পাতলা একটা বই। শ’খানেক পৃষ্ঠা হবে কিনা, সেটা নিয়েই সন্দেহ আছে আমার। এখন যে বইটা পাওয়া যায়, সেটার প্রকাশক জ্ঞানকোষ প্রকাশনী। এদের ‘নির্বাচিত কলামে’ তসলিমার ‘যাবো না কেন? যাবো’ নামের সংকলন থেকে কিছু রচনা সংযুক্ত করা হয়েছে।
পাতলা এই গ্রন্থটার জন্য আচমকাই তিনি পরের বছর আনন্দ পুরস্কার পেয়ে যান। বাংলা সাহিত্যের ক্ষেত্রে আনন্দ পুরস্কারকে সর্বশ্রেষ্ঠ পুরস্কার হিসাবে বিবেচনা করা হয়। সাধারণত বাংলা সাহিত্যের অত্যন্ত প্রতিষ্ঠিত কোনো সাহিত্যিক এই পুরস্কার পেয়ে থাকেন। বেলাল চৌধুরীর মতে, “আনন্দ পুরস্কার হচ্ছে বাংলার সাহিত্যিকদের জন্য স্বপ্নের বিষয়। এ হচ্ছে গিয়ে বাংলার নোবেল প্রাইজ।” তসলিমা তখন তরুণী, নবাগত একজন লেখক। দেশের ভিতরে তাঁর পরিচিতি থাকলেও, দেশের বাইরে তাঁর লেখালেখি সেভাবে বিস্তৃত হয়নি তখনও। এরকম অবস্থায় তসলিমার আনন্দ পুরস্কার পাওয়াটা দুই বাংলাতেই বিস্ময় হিসাবে দেখা দেয়।
আনন্দ পুরস্কারটা দেওয়া হয় আনন্দ বাজার গোষ্ঠীর তরফ থেকে। আনন্দ বাজার প্রকাশনীর জন্ম ১৯২২ সালে। পশ্চিম বঙ্গের সবচেয়ে শক্তিশালী প্রকাশনা হাউজ এটি। এখান থেকে বের হয় আনন্দ বাজার পত্রিকা, দ্য টেলিগ্রাফ পত্রিকা, দেশ পত্রিকা, একটা ইংরেজি সাপ্তাহিকী এবং আরো বেশ কয়েকটা ফিল্ম ম্যাগাজিন, বাচ্চাদের পত্রিকা, খেলার পত্রিকা। এর বাইরে খুব উঁচু মানের বই প্রকাশনাতেও এর নাম ডাক রয়েছে। খুব সহজ ভাষায় বললে প্রকাশনা জগতের এক দানব হচ্ছে আনন্দ বাজার প্রকাশনী। এদের বাজার শুধু পশ্চিম বঙ্গেই সীমাবদ্ধ নয়, এর বিস্তৃতি বাংলাদেশ পর্যন্ত ছড়ানো। ব্যবসা কীভাবে করতে হয়, সেটা তারা খুব ভালো করে জানে এবং বেশ দীর্ঘ সময় ধরেই সেটা জানে।
তসলিমা নাসরিনের মধ্যে আনন্দ বাজার ব্যবসায়ের বিশাল সম্ভাবনা দেখতে পেয়েছিলো। তসলিমা একজন বিতর্কিত বাংলাদেশি লেখক, মুসলিম পরিবার থেকে আসা নাস্তিক, বাংলায় লেখালেখি করেন, এবং এমন সব বিষয় নিয়ে লেখেন যা মুসলিম পাঠকদের ক্ষিপ্ত করে তোলে। এই পণ্যকে বাজারজাত করার জন্য আনন্দ বাজার অত্যন্ত সতর্কতার সাথে মার্কেটিং ক্যাম্পেইনে নামে। তাঁকে আনন্দ পুরস্কার দেওয়াটা এই মার্কেটিং ক্যাম্পেইনেরই অংশ ছিলো।
তসলিমা হচ্ছেন প্রথম বাংলাদেশি, যিনি আনন্দ পুরস্কার পেয়েছেন। গর্বে বাংলাদেশিদের যেখানে বুক ফুলে ওঠার কথা, সেখানে বাংলাদেশে এর প্রতিক্রিয়া হয় বিপরীত ধরনের। পশ্চিম বঙ্গের স্বীকৃতির জন্য লালায়িত বাংলাদেশি সাহিত্যিকেরা কেউ-ই তসলিমার এই পুরস্কারপ্রাপ্তিকে সহজভাবে নিতে পারেন নাই। কোলকাতা যতো ভালবেসে তসলিমাকে কাছে টেনে নিতে থাকে, ঢাকা তাঁকে ঠিক ততোটাই দূরে ঠেলে দিতে থাকে। ঢাকার থেকে প্রত্যাখ্যাত হয়ে এবং কোলকাতার কাছ থেকে ভালবাসা পেয়ে তসলিমার ভালবাসাও সরে যেতে থাকে কোলকাতার দিকে। তিনি তাঁর এক কবিতায় ঢাকার তুলনায় কোলকাতা যে স্বর্গ, এটা বলতেও দ্বিধা করেন নাই।
আনন্দ পুরস্কারের বিচারকেরা অবশ্য শুরুতে তসলিমাকে নয়, পুরস্কারটা দিতে চেয়েছিলো বাংলা একাডেমিকে। বাংলা একাডেমির কাউন্সিল এটাকে প্রত্যাখ্যান করে দেয়। বাংলা একাডেমি একটা সরকারী প্রতিষ্ঠান, বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের সাথে এর অস্তিত্ব জড়িয়ে রয়েছে ওতপ্রোতভাবে। এরকম একটা মর্যাদাবান জাতীয় প্রতিষ্ঠানের পক্ষে একটা বাণিজ্যিক গোষ্ঠীর পুরস্কার নেওয়াটা মর্যাদা হানিকর, এই বিবেচনা থেকেই পুরস্কার প্রত্যাখ্যান করা হয়েছিলো। প্রত্যাখ্যান করা হয়েছিলো বিনয়ের সাথে, তবে অত্যন্ত শক্তভাবে। কেউ কেউ অবশ্য বলে যে, এগুলো কিছু নয়। পতিত স্বৈরাচার এরশাদের সাথে আনন্দ বাজার গোষ্ঠীর দহরম মহরম ছিলো। বাংলা একাডেমি সে কারণেই এই পুরস্কার গ্রহণ করতে আগ্রহী ছিলো না।
বাংলা একাডেমিকে আনন্দ পুরস্কার দেবার পিছনে আনন্দ বাজার গোষ্ঠীর একটা উদ্দেশ্য রয়েছে, এরকম একটা ধারণাও তখন প্রচার পেয়ে গিয়েছিলো। তারা বাংলাদেশ থেকে একটা পত্রিকা প্রকাশ করতে চায়, এবং তাদের এই প্রচেষ্টাতে বাংলা একাডেমি বাধা দিতে পারে, এই বিষয়কে মাথায় রেখেই বাংলা একাডেমিকে পুরস্কার দিয়ে ঠাণ্ডা রাখার পরিকল্পনা নিয়েছে আনন্দ বাজার গোষ্ঠী।
ঢাকার অনেকেই বিশ্বাস করেন যে, বাংলা একাডেমিকে বিশেষ করে এর মহাপরিচালক প্রতিষ্ঠিত কবি এবং সাহিত্যিক শামসুর রাহমানকে একটা উচিত শিক্ষা দেবার উদ্দেশ্যে আনন্দ বাজার আনন্দ পুরস্কার তসলিমাকে দেবার সিদ্ধান্ত নেয়।
আনন্দ বাজারের বিচারক প্যানেলে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় ছিলেন। তিনি তসলিমাকে এই পুরস্কার দেবার বিপক্ষে ছিলেন। এর বদলে তাঁর পছন্দ ছিলো কবি শামসুর রাহমান। তসলিমাকে এই পুরস্কার দিলে, চারিদিকে যে ঝড় উঠবে, সেটা তিনি জানতেন। কারণ, কোলকাতার কবি সাহিত্যিকদের মধ্যে সুনীলেরই সবচেয়ে বেশি যোগাযোগ ছিলো বাংলাদেশের সাথে। আনন্দ হোল্ডিংসের চেয়ারম্যান সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের কথায় কর্ণপাত করেননি। পুরস্কার চলে যায় তসলিমা নাসরিনের কাছে।
তসলিমা নাসরিনের আনন্দ পুরস্কার প্রাপ্তি ঢাকার সাহিত্যিকদের ক্ষিপ্ত করে তোলে। দুইদিনের পুচকে মেয়ে কিনা সব বাঘা বাঘা সাহিত্যিকদের ডিঙ্গিয়ে ভারতের সেরা সাহিত্য পুরস্কারটা ছিনিয়ে নিচ্ছে। একথা ঠিক যে তসলিমা তখন বেশ জনপ্রিয়। লেখালেখিকে পেশা হিসাবে নিতে চাইলে সেই মুহূর্তে বাংলাদেশে মাত্র দুজন লোক ছিলেন, হুমায়ুন আহমেদ আর তসলিমা নাসরিন। কিন্তু, জনপ্রিয়তা বাদ দিলে, তখন তাঁর এমন কোনো অবদান সাহিত্যে ছিলো না যা তাঁকে আনন্দ পুরস্কার পাওয়াতে পারে। এর বাইরে, যে বইটা পুরস্কার পাচ্ছে, সেই ‘নির্বাচিত কলাম’ নিয়েও একটা গুরুতর অভিযোগ ছিলো। অভিযোগটা হচ্ছে এর অংশ বিশেষ সুকুমারী ভট্টাচার্যের লেখা ‘প্রাচীন ভারত ও বৈদিক সমাজ’ বই থেকে নকল করা।
তসলিমার এই চৌর্যবৃত্তির কথা, এবং তাঁর পুরস্কার প্রাপ্তির যৌক্তিকতা নিয়ে নামে এবং বেনামে অসংখ্য চিঠি বাংলাদেশ থেকে আসতে থাকে আনন্দবাজার গোষ্ঠীর কাছে। তসলিমার বইয়ের একটা রিভিউ সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় লিখতে দিয়েছিলেন সাংবাদিক মৈত্রেয়ী চ্যাটার্জিকে। তিনি বইটা থেকে বাইশ পৃষ্ঠা আলাদা করেন, যেখানে তসলিমা সুকুমারী ভট্টাচার্যের বই থেকে নিয়েছেন, কিন্তু তথ্যসূত্র স্বীকার করেন নাই। এরকম একটা মর্যাদাবান পুরস্কার পাওয়া বইয়ে কীভাবে এমন হতে পারে, কীভাবে কেউ এটাকে খেয়াল করলো না, সেটা ভেবে অবাক হন তিনি। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় দেশ পত্রিকার গ্রন্থ সেকশনের সম্পাদক ছিলেন। তিনি সুনীলকে জানান যে, তাঁর রিভিউতে তিনি এটা উল্লেখ করেছেন। এখন এটা লেখাতে যাবে, কী যাবে না, সেটা সুনীলের ব্যাপার। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় মৈত্রেয়ীর রিভিউ এর তসলিমার এই তথ্যসূত্র না দেবার অংশটাকে না কেটে অবিকৃত অবস্থায় রেখে দেন।
মৈত্রেয়ীর এই অপরাধকে ক্ষমার চোখে দেখেনি আনন্দ বাজার। সিনিয়র এক্সিকিউটিভ নিখিল সরকার তাঁর উপরে প্রচণ্ড রকমের ক্ষিপ্ত হন। তাঁর লেখা একটা প্রবন্ধ ছাপানো হয় না এবং পরবর্তী ছয় মাস আনন্দ বাজার থেকে তাঁকে কোনো কাজও দেওয়া হয়নি।
তসলিমার চৌর্যবৃত্তি নিয়ে অন্য পত্রিকাতেও লেখালেখি হতে থাকে। এর কাউন্টার দিতে আনন্দ বাজার পুরো একটা সাপ্লিমেন্টই উৎসর্গ করে তসলিমাকে। তসলিমা যে তাঁদের আদরের সন্তান এটা জানিয়ে দিতে কোনো কুণ্ঠাবোধ তাঁরা করে না।
আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে, সুকুমারী ভট্টাচার্য সব জানার পরেও কোনো আনুষ্ঠানিক অভিযোগ তোলেন না তসলিমার বিরুদ্ধে। এর কারণ হিসাবে অনেকেই বলে থাকেন যে, তিনি নিজেও আনন্দ বাজার গোষ্ঠীর লেখক। সে কারণে তাঁর পক্ষে প্রতিবাদ করা সম্ভব ছিলো না। এই একই পুরস্কার তিনি নিজেও কয়েক বছর আগে পেয়েছেন।
[এডিটরস নোটঃ নাগরিক কথা সেকশনে প্রকাশিত এই লেখাটিতে লেখক তার নিজস্ব অভিমত প্রকাশ করেছেন। নিয়ন আলোয় শুধুমাত্র লেখকের মতপ্রকাশের একটি উন্মুক্ত প্ল্যাটফরমের ভূমিকা পালন করেছে। কোন প্রতিষ্ঠান কিংবা ব্যক্তির সম্মানহানি এই লেখার উদ্দেশ্য নয়। আপনার আশেপাশে ঘটে চলা কোন অসঙ্গতির কথা তুলে ধরতে চান সবার কাছে? আমাদের ইমেইল করুন neonaloymag@gmail.com অ্যাড্রেসে।]
http://www.neonaloy.com/2017/09/28/তসলিমার-আনন্দ-পুরস্কার-প/