Saturday, 27 January 2018

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতার সত্য মিথ্যার ইতিহাস


রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতার সত্য মিথ্যার ইতিহাস ।

 ১ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী। 

মুসলিম অধ্যুষিত পূর্ব বাংলার উচ্চশিক্ষার সবচেয়ে প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাস্থল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। সঙ্কটময় মুহূর্তে আশাহীন-দিশাহীন জাতিকে মুক্তির নেশায় উজ্জীবিত করতে, পূর্ববাংলা তথা আজকের বাংলাদেশের পিছিয়ে পড়া মুসলিম জনগোষ্ঠীর মধ্যে প্রাশ্চাত্যের শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিতে ১৯২১ সালের ১ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তার আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু করে। ইতিহাসের নানা ঘাত-প্রতিঘাত পেরিয়ে, নানা ভাস্বর অধ্যায়ের রূপকার হয়ে এ বিশ্ববিদ্যালয় তার প্রতিষ্ঠার গৌরবের ৯৫ বছর পেরিয়ে পা রাখতে যাচ্ছে ৯৬ বছরে।

বঙ্গভঙ্গ রদেরও ১০ বছর পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। ব্রিটিশ শাসনাধীন থাকার পূর্বে আমাদের এই ভূখণ্ডে ইসলামী শিক্ষার ছোট-বড় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ছিল। ব্রিটিশরা আসার পর ভারতবর্ষের অন্যান্য স্থানে আধুনিক পাশ্চাত্য শিক্ষার বিকাশ হলেও আমাদের এই বাংলা প্রদেশ থেকে যায় বরাবরের মত অবহেলিত। বঙ্গভঙ্গ থেকে বঙ্গভঙ্গ রদের পরবর্তী সময়ে পূর্ববাংলার বৃহত্তর জনগোষ্ঠী উচ্চশিক্ষার সার্বিক সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত ছিল। আধুনিক প্রাশ্চাত্য শিক্ষা অর্জনের অধিকার এই ভূখণ্ডের মুসলমানদের আন্দোলন করেই অর্জন করে নিতে হলো। দীর্ঘ আন্দোলনের অর্জন প্রাচ্যের অক্সফোর্ড বলে খ্যাত এই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
অধিকাংশ কলেজ কলকাতা বা তার আশপাশে অবস্থিত ছিল। পূর্ববাংলা আসাম অঞ্চলে কলেজ কম ছিল। উচ্চশিক্ষার জন্য গোটা আসামে মাত্র দু’টি কলেজ ছিল। সিলেটের এমসি কলেজ ও গৌহাটির কটন কলেজ। গৌহাটিতে তখন একটি ল কলেজও ছিল। উল্লেখ্য যে, আজকের সিলেট তখন আসাম প্রদেশের অন্তর্ভুক্ত ছিল। বঙ্গভঙ্গে আসাম ও পূর্ববাংলা নিয়ে আলাদা প্রদেশ গঠন করা হয়েছিল।

বঙ্গভঙ্গ রদ-পরবর্তী পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে, পূর্ববাংলার আশাহত, বিক্ষুব্ধ মুসলিম জনগোষ্ঠীকে সান্ত¡না দিতে ও বিক্ষোভের মাত্রা প্রশমিত করতে তৎকালীন ব্রিটিশ রাজ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেন। অনেকেই মনে করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করতে ব্রিটিশ সরকার বাধ্য ছিল। দীর্ঘ সময় কোন জনগোষ্ঠীকে অধিকারবঞ্চিত রেখে ক্ষমতার স্থায়িত্ব দীর্ঘ করা যায় না, এ কথা তারা খুব ভাল করেই জানতো। কৃষক মুসলমানের সন্তানরা শিক্ষাদীক্ষাসহ সর্বক্ষেত্রে এগিয়ে যাক, এমন মহৎ উদ্দেশ্য তাদের মধ্যে ছিল না। সহজ কথায় ব্রিটিশরা তাদের রাজত্ব দীর্ঘস্থায়ী করতে এ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করে। প্রথমত, বঙ্গভঙ্গ রদের ফলে মুসলমানরা ছিল বিক্ষুব্ধ। এ বৃহৎ জনগোষ্ঠীকে ক্ষুব্ধ রেখে শাসন দীর্ঘস্থায়ী করা যাবে না। এমন উপলব্ধি থেকে শাসনক্ষমতা দীর্ঘস্থায়ী করার কূটকৌশলের অংশ হিসেবে ব্রিটিশ সরকার এ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেয়। দ্বিতীয়ত, তারা চেয়েছিল কিছু ‘মহৎ বর্বর’ (ঘড়নষব ঝধাধমব) তৈরি করতে, যারা তাদের দালালি করবে। সাত সমুদ্র তেরো নদী পেরিয়ে এ ভারতবর্ষে শাসন দীর্ঘস্থায়ী করতে কিছু অগ্রসর শ্রেণীর দালাল প্রয়োজন ছিল।

এমন মানসিকতা নিয়ে তারা ইতঃপূর্বে কলকাতা, মাদ্রাজ ও বোম্বাই এই প্রধান শহরে তিনটি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করে। ১৮৫৭ সালে সিপাহি বিদ্রোহে শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণী যোগ দেয়নি। আর ইংরেজরা এ বিষয়টি সামনে রেখেই তিনটি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করে। শাসনকার্য পরিচালনার সুবিধার জন্য তারা চেয়েছিল ভারতীয়দের একাংশকে সভ্যতা ও ভব্যতার শিক্ষা দিয়ে ‘মহৎ বর্বরে’ রূপান্তর করতে। এসব বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো তারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ও প্রতিষ্ঠা করে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে।

ঢাকাকে রাজধানী করে বাংলা ও আসাম প্রদেশ নিয়ে ১৯০৫ সালের ১৬ অক্টোবর ‘বঙ্গভঙ্গ’ নামের প্রদেশটি কার্যকর হয়। শিক্ষাদীক্ষাসহ সব দিক থেকে পিছিয়ে পড়া মুসলমানদের জন্য বঙ্গভঙ্গ তাদের প্রাণে আশার সঞ্চার করেছিল। তৎকালীন হিন্দু নেতারা ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রচণ্ড বিরোধী। তারা শেষ পর্যন্ত ব্রিটিশ সরকারকে বঙ্গভঙ্গ বাতিলে বাধ্য করে। ১৯১১ সালের ১২ ডিসেম্বর ‘বঙ্গভঙ্গ রদ’ ঘোষিত হয়। এ খবর পূর্ব বাংলার শোষিত ও বঞ্চিত মুসলমানদের কাম্য ছিল না। বঙ্গভঙ্গের ফলে সামান্য কয়েক বছরের ব্যবধানে মুসলিম সমাজে সার্বিক যে প্রাণচাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছিল, এ ঘোষণায় তা কর্পূরের মতো উবে যায়। মুসলিম সমাজ তাতে বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে।

 বিক্ষোভের তীব্রতা আঁচ করতে পেরে পরিস্থিতি সামাল দিতে তৎকালীন গভর্নর জেনারেল লর্ড হার্ডিঞ্জ ১৯১২ সালে ২৯ জানুয়ারি তিন দিনের এক সফরে ঢাকা আসেন। এ সময় নবাব স্যার সলিমুল্লাহ, নবাব সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরী, শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হকসহ ১৯ জন মুসলিম নেতার একটি প্রতিনিধিদল ৩১ জানুয়ারি গভর্নর জেনারেলের সঙ্গে দেখা করেন। বঙ্গভঙ্গ রদের ফলে পূর্ববাংলার মুসলমানরা সব দিক থেকে যে নিদারুণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে, এ বিষয়টি জানিয়ে তারা আবার বঙ্গভঙ্গ চালুর দাবি জানান। না হয় এর ক্ষতিপূরণ স্বরূপ কমপক্ষে ঢাকায় একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করার দাবি করেন তারা।

জবাবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রæতি দিয়ে লর্ড হার্ডিঞ্জ ঘোষণা করেন :  The Government of India realised that education was the true salvation of the Muslims and that the Government of India, as an earnest of their intentions, would recommend to the Secretary of State for the constitution of University of Dacca.

“… ১৯১১ খ্রীষ্টাব্দে বঙ্গভঙ্গ বাতিল হওয়ায় ঢাকায় একটি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করার জন্য ইংরেজ সরকার প্রতিশ্রুতি দেয়। মুসলমানেরা হতভম্ব হয়ে দেখল, তাতেও হিন্দুরা আপত্তি করছে। আশুতোষ মুখোপাধ্যায় ও রাসবিহারী ঘোষের মত বুদ্ধিজীবীরাও বলতে থাকেন যে, তার ফলে, বাঙ্গালী জাতি ও সংস্কৃতির ক্ষতি হবে। ঢাকার হিন্দুরাও ঐ মত সমর্থন করে। ১৯২১ খ্রীষ্টাব্দে ঐ বিশ্ববিদ্যালয স্থাপিত হলেও তার পঠন-পাঠন ক্ষেত্র হয় বেশ সীমাবদ্ধ। স্বয়ং রবীন্দ্রনাথও ব্যাপারটি ঠিকভাবে নিতে পারেননি। তিনি তাই লিখেছিলেন :

‘আমার নিশ্চয় বিশ্বাস, নিজেদের স্বতন্ত্র বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন প্রভৃতি উদযোগ লইয়া মুসলমানরা যে উৎসাহিত হইয়া উঠিয়াছে তাহার মধ্যে প্রতিযোগিতার ভাব যদি কিছু থাকে তবে সেটা স্থায়ী ও সত্য পদার্থ নহে। ইহার মধ্যে সত্য পদার্থ নিজেদের স্বাতন্ত্র্য উপলব্ধি। মুসলমান নিজের প্রকৃতিতেই মহৎ হইয়া উঠিবে ইহাই মুসলমানের সত্য ইচ্ছা। … অতএব যাহারা স্বতন্ত্রভাবে হিন্দু বা মুসলমান বিশ্বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠাকে ভয় করেন তাহাদের ভয়ের কোন কারণ নাই এমন কথা বলিতে পারি না।’ ( পরিচয় – “হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়” প্রবন্ধ দ্রষ্টব্য)॥”

– সৈয়্দ আব্দুল হালিম / বাঙ্গালী মুসলমানের উৎপত্তি ও বাঙ্গালী বিকাশের ধারা (তৃতীয় খন্ড / পরাধীনতা ও প্রতিকার) ॥ [ নবযুগ প্রকাশনী – ফেব্রুয়ারি, ২০১৬ । পৃ: ২১১ ]

#০২

“… ১৯০৬ সালের ১ অক্টোবর আগা খানের নেতৃত্বে ভারতের ৩৫ জন মুসলিম নেতা সিমলায় ভাইসরয় মিন্টোর সাথে দেখা করে মুসলমানদের পক্ষ থেকে কতিপয় সুনির্দিষ্ট দাবী পেশ করেন। অন্যতম দাবীটি ছিল ঢাকায় একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা। হিন্দুদের চক্রান্তে বঙ্গভঙ্গ রদের পর ১৯১২ সালের ৩১ জানুয়ারী ভারতের বড়লাট নবাবকে সান্তনা দেয়ার জন্য ঢাকায় আসেন এবং বঙ্গভঙ্গ রদের ক্ষতিপূরণ স্বরূপ ঢাকা বিশ্বব্যালয় প্রতিষ্ঠার আশ্বাস দেন। কিন্তু অন্যান্য উগ্রবাদী হিন্দু নেতাদের সাথে কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এ আশ্বাসেরও চরম বিরোধিতা করেন।

১৯১২ সালের ২৮ মার্চ কলকাতার গড়ের মাঠে ঢাকায়  বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরুদ্ধে হিন্দুরা প্রতিবাদ সভা ডাকে। প্রতিবাদ সভায় সভাপতিত্ব করেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। কারণ তিনি ছিলেন জমিদার। তিনি মুসলমান প্রজাদের মনে করতেন লাইভ স্টক বা গৃহপালিত পশু। [ নীরদচন্দ্র চৌধুরী, দি অটোবায়োগ্রাফি অব এন আননোন ইন্ডিয়ান দ্রষ্টব্য ]

কাজেই বাংলার মাটি, বাংলার জলের জন্য একবছর আগে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রেমে গদ গদ হয়ে গান লিখলেও এক বছর পর বাংলার কৃষকদের ছেলে শিক্ষিত হবে তা তিনি সহ্য করেননি। কারণ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা হলে নবশিক্ষিত মুসলমান সমাজকে আর দাবিয়ে রাখা যাবে না। কৃষিজীবী সম্প্রদায়ের সন্তানদের শিক্ষিত হয়ে বুদ্ধিজীবী হলে চিরকাল সেবাদাস করে রাখা যাবে না। একথা চিন্তা করেই বোধ হয় হিন্দু বুদ্ধিজীবী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরেরা সেদিন আতঙ্কিত ও ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে উগ্রবাদী হিন্দুরা কতটা ক্ষিপ্ত হয়েছিল এর প্রমাণ পাওয়া যাবে সেকালের নেতৃবৃন্দের বক্তব্য, বিবৃতি ও পত্রিকার ভাষ্য থেকে।

১৯১২ সালে ১৬ই ফেব্রুয়ারী বড় লাটের সাথে বর্ধমানের স্যার রাসবিহারী ঘোষের নেতৃত্বে এক প্রতিনিধিমন্ডলী সাক্ষাৎ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠা না করার পক্ষে নিম্নোক্ত যুক্তির জাল বিস্তার করেন।

‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা হলে আভ্যন্তরীণ বঙ্গ বিভাগ-এর সমার্থক, তাছাড়া পূর্ববঙ্গের মুসলমানরা প্রধানত কৃষক; তাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় তারা কোন মতেই উপকৃত হবে না।’ [ Report of the Calcutta University Commission Vol. IV, Prt. II, P. 133 ]

‘সিলেটের বিপিনচন্দ্র পাল বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে অশিক্ষিত ও কৃষক বহুল পূর্ববঙ্গের শিক্ষাদান কার্যে ব্যাপৃত থাকতে হবে; পূর্ববঙ্গ ও পশ্চিমবঙ্গের জনসাধারণের শিক্ষানীতি ও মেধার মধ্যে সামঞ্জস্য থাকবে না।’ [ ঢাকা প্রকাশ, ১১ ও ১৮ই ফেব্রুয়ারী – ১৯১২ ]

এছাড়া হিন্দু সংবাদপত্র, বুদ্ধিজীবী ও নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরুদ্ধে অসংখ্য প্রতিবাদ সভার আয়োজন করেন এবং সভার সিদ্ধান্তগুলো বৃটিশ সরকারের কাছে প্রেরণ করতে থাকেন। বাবু গিরিশ চন্দ্র ব্যানার্জী, ড: স্যার রাসবিহারী ঘোষ এবং কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর স্যার আশুতোষ মুখার্জীর নেতৃত্বে হিন্দু বুদ্ধিজীবীরা বড় লাট হার্ডিঞ্জের কাছে ১৮ বার স্মারকলিপি পেশ করেন [ Report of the Calcutta University Commission ]

আশ্চর্যের বিষয়, এই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতার মিছিলে শরীক হয়েছিলেন মানবতার কবি দাবীদার রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও।

… ১৯১৫ সালের ১৬ই জানুয়ারী নবাব সলিমুল্লাহর মৃত্যুর পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় অনিশ্চয়তা দেখা দেয়। নবাব সলিমুল্লাহর স্বপ্ন বাস্তবায়ন করার লক্ষ্যে শক্ত হাতে হাল ধরেন সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরী। সেই ১৯১১ সালের ৩১ জানুয়ারী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ঘোষণার দিন থেকে ১৯২০ সালের ২৩শে মার্চ-এ বড় লাটের আইন সভায় ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এ্যাক্ট’ পাস হওয়ার দিনটি পর্যন্ত তিনি বিরামহীন প্রচেষ্টা চালান। কায়েদে আযম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহও বিশ্ববিদ্যালয় আইন পাসের ক্ষেত্রে বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করেন। অবশেষে কট্টর হিন্দু নেতাদের প্রবল বিরোধিতা সত্ত্বেও ১৯২১ সালের জুলাই মাসে আনুষ্ঠানিকভাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। কিন্তু কাঙ্খিত বিশ্ববিদ্যালয়টি নবাব দেখে যেতে পারেননি। এছাড়া জমিদার ওয়াজেদ আলী খান পন্নীও (চাঁদ মিয়া) পূর্ব বাংলার মুসলমানদের শিক্ষার জন্য উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছেন। অথচ আজ নবাব সলিমুল্লাহর নামে একটি হল আছে বটে; কিন্তু কায়েদ আযম জিন্নাহ, নওয়াব আলী চৌধুরী ও জমিদার চাঁদ মিয়ার কোন স্মৃতি চিহ্ন ক্যাম্পাসে নেই।

… আর যাদের আন্দোলনের ফসল এই এই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, অনেকে তাদের নামই জানে না। তাদেরকে নিয়ে কোন আলোচনা বা স্মৃতি সভা হয় না। আলোচনা বা স্মৃতি সভা হয় বঙ্কিম, সূর্যসেন ও রবীন্দ্রনাথদের নিয়ে। যাদের কল্যাণে চাষার ছেলে থেকে আজকে যারা ভাইস-চান্সেলর, অধ্যাপক, বুদ্ধিজীবী, আমলা, রাজনীতিবিদ, আইনজ্ঞ, বিচারপতি, শিল্পপতি, শিল্পী, অভিনেতা-অহিনেত্রী, প্রযোজক-পরিচালক হওয়ার সৌভাগ্য অর্জন করেছেন, সে-সব কৃতি সন্তানেরা আজ উপেক্ষিত, নিন্দিত। হায়রে দূর্ভাগা দেশ। হায়রে দূর্ভাগা জাতি।

বিশ্ববিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠার লগ্ন থেকেই এর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র চলছে। বর্তমানেও তা অব্যাহত রয়েছে। পূর্বে এই এই প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে চক্রান্ত করেছে রবীন্দ্র বাবুরা। বর্তমানে করছে মুসলমান নামধারী রবীন্দ্র ভক্তরা।

বাংলাদেশের এক বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও সাহিত্যিক একটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত প্রবন্ধে নিম্নোক্ত মন্তব্য করেছিলেন :

‘রবীন্দ্রনাথের মাটিতে দাঁড়িয়ে রবীন্দ্রনাথকে অতিক্রম করার সাধনা, রবীন্দ্রনাথকে বাদ দিয়ে বেঁচে থাকার, বিকশিত হওয়ার কিংবা রবীন্দ্রনাথকে অতিক্রম করার বর্বর অহংকার হচ্ছে পায়ের তলায় জমি শুন্য, শেকড় শুন্য, নির্বোধের অহংকার।’ [ সরদার ফজলুল করিম : রবীন্দ্রনাথের অস্তিত্বে আমাদের অস্তিত্ব /দৈনিক সংবাদ – ২৪ ফাল্গুন, ১৩৯৬ ]

সচেতন মহলের মতে, দেশের শিক্ষা ও সংস্কৃতির সর্বোচ্চ প্রতিষ্ঠান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ফজলুল করিমের এই মন্তব্যে নতুন প্রজন্মের মন-মানসিকতা আচ্ছন্ন করারই কথা। তারা স্বভাবতই বিশ্বাস করবে ‘রবীন্দ্রনাথের অস্তিত্ব আমাদের অস্তিত্ব’। এই বিশ্বাসের পরিণাম কি হবে তাও ভেবে দেখা সময়ের দাবী॥”

– সরকার শাহাবুদ্দীন আহমেদ / ইতিহাসের নিরিখে নজরুল-রবীন্দ্র  চরিত ॥ [ বাংলাদেশ কো অপারেটিভ বুক সোসাইটি – জুলাই, ১৯৯৮ । পৃ: ২৩০-২৩৩ ]

#০৩

“… As compensation for the annulment of the partition as well as protest against the general antipathy of the Calcutta University towards the Muslims, the deputation pressed a vigorous demand for a University at Dacca. In his reply, Lord Hardinge said that the Government of India realised that education was the true salvation of the Muslims and that the Government of India, as an earnest of their intentions, would recommend to the Secretary of State the constitution of a University at Dacca. On 2 February, 1912, a communique was published stating the decision of the Government of India to recommend the constitution of a University at Dacca.  [ C. U. Commission Report, Vol. IV, Pt. II, P. 133 ]

The Hindu leaders were opposed to the plan of setting up a University at Dacca. They voiced their disapprobation in press and platform. On February 16, 1912 a delegation headed by Dr. Rash Behary Ghose waited upon the Viceroy and expressed apprehension that the creation of a separate University at Dacca would be in the nature of ‘an internal partition of Bengal’. They also contended that the the Muslims of Eastern Bengal were in large majority cultivators and they would benefit in no way by the foundation of a University. [Ibid., P. 122 ]

In his reply, Lord Hardinge referred to the progress made by the people of Eastern Bengal and Assam during the few years of the partition and said, ‘when I visited Dacca I found a wide-spread apprehension, particularly among the Muhammadans, who form a majority of the population, lest the attention which the partition of Bengal secured for the eastern provinces should be relaxed, and that there might be a setback in educational progress. It was to allay this not very unreasonable apprehension that I stated to a deputation of Muhammadan gentlemen that the Government of India were so much impressed with the necessity of promoting education in a province which had made such good progress during the past few years that we have decided to recommend to the secretary of state the constitution of a University at Dacca and the appointment of a special officer for education in Eastern Bengal.” The viceroy assured the delegation that no proposals which could lead to the internal partition or division of Bengal would meet the support of the Government of India; and he added that from the fact that he announced the intention of the Government in regard to Dacca to a deputation of Muhammadans it did not follow in any way that the new University would be a Muhammadan University; it would be a University open to all – a teaching and a residential University. [ Ibid., Vol. I , Pt. I, P. 151 ]

… Dr. R. C. Majumdar, in his article “Dhakar Smriti” has referred to the opposition by Sir Ashutosh Mukharjee, Gurudas Banerjee and others. Dr. Majumder writes that Lord Hardinge told Sir Ashutosh that he was determined to establish Dacca University in spite of all opposition and the Viceroy wanted to know at what price he was prepared to withdraw his opposition to it. Sir Ashutosh thought of using this occasion for a bargain in favor of Calcutta University, of which he was the Vice-Chancellor. He asked for four Proffesorships for his University. The Viceroy accepted his demand and Sir Ashutosh agreed to stop his opposition. This agreement between the Viceroy and Sir shutosh was named the ‘Dacca University Pact’. (Sir Ashutosh Bhattacharya, Amader Shei Dhaka Visva Vidyalaya , pp. 24-29)

The educated Hindus criticised the Dacca University as ‘Mecca University’, ‘Fucca (Hollow) University’ and expressed that ‘a good College (Dacca College) was killed to create a bad University. [ Sir Ashutosh Bhattacharya, Amader Shei Dhaka Visva Vidyalaya , pp. 6 & 56 ]

… educated Hindus said that three Jews, Vice-Chancellor Hartog, Viceroy Lord Reading and Secretary of State E. Montage, had contaminated the University and it would not function. [ Syed Mostafa Ali, Atmakatha, p. 115 ]

… In the annual Court meeting of 1922-23 the Vice-Chancellor in his Presidential speech replied to these critics of the Dacca University. He said that he felt proud of the achievement of the Dacca University in a year and spoke of its progressive type of syllabuses, effective tutorial system, better laboratory and library facilities and personal contacts between the teachers and students. There were increasing demands for books both by students and teachers and such demand for books hardly existed before the University was created. He also recalled that the Dacca University, though open to all, was created in response to the demand of the Muslim community and it was intended as an organ to raise them form their backward position in regard to education. [ Minutes of the Court, 13 February, 1922 ]. ”

– Muhammad Abdur Rahim / The History of the University of Dacca  ॥ [ University of Dacca – September, 1981 । P. 5-6 / 39 ]

#০৪

” … রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আহবান অনুযায়ী ১৯০৫ সালের ১৬ অক্টোবর (বঙ্গভঙ্গ কার্যকরী করার জন্য ইংরেজ সরকার কর্তৃক ঘোষিত দিবস)-কে ‘রাখীবন্ধন দিবস’ হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কর্তৃক ১৯০৩ সালে লিখিত “আমার সোনার বাংলা” গানটি ‘বঙ্গভঙ্গ রদ’ আন্দোলনে যথেষ্ট গতি সঞ্চার করে।

বঙ্গভঙ্গ রদ হওয়ার পর পূর্ববাংলার বিক্ষুব্ধ ও বিমর্ষ মুসলমানদের মধ্যে সৃষ্ট অসন্তোষ প্রশমনের জন্য তৎকালীন বড়লাট লর্ড হার্ডিঞ্জ পুর্ববঙ্গ সফরের কর্মসূচী গ্রহণ করেন এবং তদানুযায়ী তিনি ১৯১২ সালের ৩১ জানুয়ারী ঢাকা সফরে আসেন। ঐদিনই নবাব স্যার সলিমুল্লাহ, নবাব নওয়াব আলী চৌধুরী, এ কে ফজলুল হক প্রমুখ মুসলিম নেতৃবৃন্দের একটি প্রতিনিধিদল তার সাথে সাক্ষাৎ করেন এবং তাদের বিশেষ অনুরোধক্রমে তৎকালীন বড়লাট ঢাকায় একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ঘোষণা প্রদান করেন। উক্ত ঘোষণার পর একই বছর মে মাসে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে বিস্তারিত সুপারিশ পেশ করার জন্য ‘নাথান কমিশন’ নামে একটি কমিশন গঠন করা হয়। দীর্ঘ আলাপ আলোচনার পর অত্র কমিশন একটি আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সুপারিশ করে। পূর্ববাংলার মানুষ এবং মুসলিম নেতৃবৃন্দ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সরকারী সরকারী সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানায়।

কিন্তু ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ঘোষণা প্রদানের সাথে সাথেই এবারো শুরু হয়ে যায় কলকাতাকেন্দ্রিক হিন্দু নেতৃবৃন্দ ও বুদ্ধিজীবিদের চরম গাত্রদাহ। সেই একই হিন্দু নেতৃবৃন্দ ও বুদ্ধিজীবি যারা বঙ্গভঙ্গ রদ করার জন্য আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল, ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সরকারী সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে এবারো তারা গর্জে ওঠে, গড়ে তুলে ব্যাপক আন্দোলন। হিন্দু নেতারা সারা বাংলায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রতিবাদে ব্যাপক সভা-সমাবেশের আয়োজন করে।

১৯১২ সালের ২৮ মার্চ কলিকাতার গড়ের মাঠে কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সভাপতিত্বে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রতিবাদে এক বিশাল জনসভার আয়োজন করা হয়।১৯১২ ইং সালের ১২ ফেব্রুয়ারী হিন্দু নেতৃবৃন্দের একটি উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধিদল লর্ড হার্ডিঞ্জের সাথে সাক্ষাৎ করেন। সাক্ষাৎকালীন উক্ত প্রতিনিধিদলের পক্ষ থেকে তাকে বলা হয় যে, ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা আভ্যন্তরীণভাবে বঙ্গভঙ্গেরই সমতুল্য। কেননা এর ফলে বাঙালি জাতি বিভক্ত হয়ে পড়বে এবং হিন্দু মুসলমানের মধ্যে বিরাজমান বিরোধ আরো বাড়বে। তাছাড়া পূর্ববঙ্গের মানুষ প্রধানত কৃষক। তাই ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন কোন উপকারেই আসবে না।

১৯১৭ ইং সালের ২০ মার্চ সৈয়দ নওয়াব অলী চৌধুরী ভারতীয় আইনসভায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবি পুনরায় উত্থাপন করেন এবং অবিলম্বে ‘বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা বিল’ পাসের দাবি জানান। আইনসভার পক্ষ থেকে জানানো হয় যে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বিলের ‘খসড়া’ প্রস্তুত রয়েছে তবে যুদ্ধ সঙ্কটের মধ্যে সরকার এ বিলে হাত দিতে চান না। যুদ্ধশেষে য্থাসময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হবে। অত:পর একই বছর ‘কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় কমিশন’ নামে একটি কমিশন গঠন করা হয়। উক্ত কমিশন পূর্বেকার ‘নাথান কমিশন’ রিপোর্ট অনুমোদন করে। এ রিপোর্টের ভিত্তিতে ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এক্ট’ পাস হয়। অবশেষে সকল প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে দীর্ঘ নয় বছর পর হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রবল বাঁধার মুখে রমনার বিশাল সবুজ চত্বরে প্রায় ৬০০ একর জায়গা জুড়ে প্রতিষ্ঠিত হয় বহুল প্রত্যাশিত ও অনেক সংগ্রামের ফসল ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়’। ১৯২১ সালের ১ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তার যাত্রা শুরু করে এবং এক বছর পর ১৯২২ সালে প্রথম সমাবর্তন অনুষ্ঠিত হয়।

মুসলমানদের দাবির প্রেক্ষিতে এ দেশের মুসলমানদের জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হলেও, প্রতিষ্ঠার পর বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনার দায়িত্বে মুসলমানরা নিয়োজিত ছিল না, হিন্দুদেরই প্রাধান্য ছিল সর্বক্ষেত্রে। যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজন “মক্কা বিশ্ববিদ্যালয়” বলে ব্যঙ্গ করতে কুন্ঠাবোধ করেনি, বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর এ বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেয়ার জন্য কিন্তু তাদের মাঝে কোন সংকোচ বা কার্পণ্য মোটেই দেখা যায়নি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর জনৈক ইংরেজ এ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি পদে অধিষ্ঠিত হন এবং বিভিন্ন বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদে হিন্দু পন্ডিতগণ পরিচালকের আসনে সমাসীন হন। তারা তাদের রুচি ও মন-মানসিকতা অনুযায়ী বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল প্রশাসন কার্য পরিচালনা করতে থাকেন। ফলে দেখা যায়, যে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধীতা করেছিলেন, ঢাকার বুকে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হওয়ার মাত্র পাঁচ বছর পর সে বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণেই তিনি বিপুলভাবে সংবর্ধিত হন এবং তারো দশ বছর পর তিনি সেখান থেকেই সম্মানসূচক ডক্টরেট ডিগ্রীপ্রাপ্ত হন।

শুধু তাই নয়, একই কারণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোগ্রামে ‘অশোক চক্র’ স্থান লাভ করে। পরবর্তীতে পাকিস্তান আমলে সে মনোগ্রাম পরিবর্তিত হয়ে তাতে পবিত্র কোরআনের আয়াত সংযোজিত হলেও বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার তাদের চিরাচরিত স্বভাব অনুযায়ী নিজেকে মাত্রাতিরিক্ত ‘স্যাকুলার’ বা ‘ধর্মনিরপেক্ষ’ প্রমাণের হীন উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে পাকিস্তান আমলে পরিবর্তিত সে মনোগ্রাম থেকে পবিত্র কোরআনের আয়াতকে নির্বাসিত করে। একই সাথে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘সলিমুল্লাহ্ মুসলিম হল’ এবং ‘ফজলুল হক মুসলিম হল’ দুটির নাম থেকে মুসলিম শব্দ তুলে দেয়া হয়॥”

– মেজর জেনারেল (অব:) এম. এ. মতিন, বীর প্রতীক, পিএসসি / আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের ধারাবাহিকতা এবং প্রাসঙ্গিক কিছু কথা ॥ [ আহমদ পাবলিশিং হাউস – ফেব্রুয়ারি, ২০০০ । পৃ: ১৮-২২ ]
। Kai Kaus

Wednesday, 25 October 2017

সাইয়্যিদুল ইস্তিগফার বা তওবার শ্রেষ্ঠ দোয়া

FB_IMG_1502477883614
সাইয়্যিদুল ইস্তিগফার বা তওবার শ্রেষ্ঠ দোয়া

যে ব্যক্তি সুদৃঢ় বিশ্বাসের সঙ্গে সন্ধ্যায় সায়্যিদুল ইস্তিগফার পড়ে সে যদি সকাল হওয়ার আগে মারা যায়, তবে জান্নাতে প্রবেশ করবে। -সহিহ বোখারি: ৬৩০৬
নবী করিম (সা.) ইরশাদ করেছেন, যে ব্যক্তি সুদৃঢ় বিশ্বাসের সঙ্গে সকালে সায়্যিদুল ইস্তিগফার পাঠ করবে, সে যদি সন্ধ্যা হওয়ার আগে মারা যায় তবে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।
নবী করিম (সা.) ইরশাদ করেছেন, যে ব্যক্তি সুদৃঢ় বিশ্বাসের সঙ্গে সকালে সায়্যিদুল ইস্তিগফার পাঠ করবে, সে যদি সন্ধ্যা হওয়ার আগে মারা যায় তবে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। আর যে ব্যক্তি সুদৃঢ় বিশ্বাসের সঙ্গে সন্ধ্যায় সায়্যিদুল ইস্তিগফার পড়ে সে যদি সকাল হওয়ার আগে মারা যায়, তবে জান্নাতে প্রবেশ করবে। -সহিহ বোখারি: ৬৩০৬
اللَّهُمَّ أَنْتَ رَبِّي لَا إِلَهَ إِلَّا أَنْتَ خَلَقْتَنِي وَأَنَا عَبْدُكَ وَأَنَا عَلَى عَهْدِكَ وَوَعْدِكَ مَا اسْتَطَعْتُ أَعُوذُ بِكَ مِنْ شَرِّ مَا صَنَعْتُ أَبُوءُ لَكَ بِنِعْمَتِكَ عَلَيَّ وَأَبُوءُ لَكَ بِذَنْبِي فَاغْفِرْ لِي فَإِنَّهُ لَا يَغْفِرُ الذُّنُوبَ إِلَّا أَنْتَ
উচ্চারণ : আল্লাহুম্মা আনতা রাব্বি। লা ইলাহা ইল্লা আনতা। খালাকতানি ওয়া আনা আবদুকা। ওয়া আনা আলা আহদিকা। ওয়া ওয়া’দিকা মাসতাতা’তু। আউজু বিকা মিন শাররি মা-সানা’তু। আবুয়ু লাকা বিনি’মাতিকা আলাইয়্যা। ওয়া আবুয়ু লাকা বি জাম্বি। ফাগফিরলী। ফা ইন্নাহু লা ইয়াগফিরুজ জুনবা ইল্লা আনতা।
অর্থ : হে আল্লাহ! একমাত্র আপনিই আমাদের প্রতিপালক। আপনি ব্যতীত আর কোনো উপাস্য নেই। আপনিই আমার স্রষ্টা এবং আমি আপনার দাস। আমি আপনার সঙ্গে কৃত ওয়াদা ও অঙ্গীকারের ওপর সাধ্যানুযায়ী অটল ও অবিচল আছি। আমি আমার কৃতকর্মের সব অনিষ্ট হতে আপানার কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করছি। আমার উওর আপনার দানকৃত সব নেয়ামত স্বীকার করছি। আমি আমার সব গুনাহ স্বীকার করছি। অতএব, আপনি আমাকে ক্ষমা করুন। কেননা, আপনি ছাড়া আর কেউ গুনাহ ক্ষমা করতে পারবে না।

আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া” Al Bidaya Wal Nihaya

FB_IMG_1508977780594

আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া” Al Bidaya Wal Nihaya

প্রখ্যাত মুফাসসির ও ইতিহাসবেত্তা আল্লামা ইবনে কাসীর (রহ) প্রণীত একটি সুবৃহৎ ইতিহাস গ্রন্থ। এই গ্রন্থের সৃষ্টির শুরু তথা আরশ, কুরসী, নভোমন্ডল, ভূমন্ডল প্রভৃতি এবং সৃষ্টির শেষ তথা হাশর-নশর, কিয়ামত, জান্নাত, জাহান্নাম প্রভৃতি সম্বন্ধে আলোচনা করা হয়েছে।
এই গ্রন্থটি ১৪টি খন্ডে সমাপ্ত হয়েছে। আল্লামা ইবনে কাসীর (র) তাঁর এই গ্রন্থকে তিনভাগে ভাগ করেছেন।
প্রথম ভাগ: আরশ, কুরসী, ভুমন্ডল, নভোমন্ডল এতদুভয়ের অন্তর্বতী সব কিচু তথা ফেরেশতা, জিন, শয়তান, আদম (আ)-এর সৃষ্টি, যুগে যুগে আবির্ভূত নবী-রাসুলগণের ঘটনা, বনী ইসরাঈল, ইসলাম-পূর্ব যুগের রচনাবলী এবং মুহাম্মাদ (সা)-এর জীবন-চরিত আলোচনা করা হয়েছে।
দ্বিতীয় ভাগ : রাসুল (সা)-এর ওফাতকাল থেকে ৭৬৮ হিজরী সাল পর্যন্ত সুদীর্ঘ কালের বিভিন্ন ঘটনা এবং মনীষীদের জীবনী আলোচনা করা হয়েছে।
তৃতীয়ভাগ : ফিতনা-ফাসাদ, যুদ্ধ-বিগ্রহ, কিয়ামতের আলামত, নাশর-নশর, জান্নাত-জাহান্নামের বিবরণ ইত্যাদি।
লেখক তাঁর এই গ্রন্থের প্রতিটি আলোচনা কুরআন, হাদীস, সাহাবাগণের বর্ণনা, তাবেঈন ও অন্যান্য মনীষীদের দ্বারা সমৃদ্ধ করেছেন। ইবনে হাজার আসাকালানী (রহ), ইবনুল ইমাদ আল-হাম্বলী (র) প্রমুখ ইতিহাসবিদ এই গ্রন্থের প্রশংসা করেছেন। বদরুদ্দীন আইনী হানাফী (র) এবং ইবনে হাজার আসকালানী (রহ) গ্রন্থটির সার-সংক্ষেপ রচনা করেছেন।
বিখ্যাত এই গ্রন্থটির ১-১০ খন্ড অনুবাদ প্রকাশ করেছে ইসলামিক ফাউন্ডেশন, বাংলাদেশ।
১-৭ ও ৯ম খন্ড স্ক্যান করেছে ইসলামী বই ডট ওয়ার্ডপ্রেস ডট কম এবং ৮ম ও ১০ম খন্ড স্ক্যান এবং সম্পূর্ণ বইটিতে Interactive Link অ্যাড করেছে waytojannah.com । যারা এই কাজে পরিশ্রম ব্যয় করেছেন, আল্লাহ তাদের সবাইকে উত্তম প্রতিদান দান করুন।
নতুন সংস্করণে Interactive Link অ্যাড করা হয়েছে ।

ইবনে খালদুন

download (1)
ইবনে খালদুন
মুসলিম দার্শনিক, ইতিহাসবিদ, আধুনিক সমাজবিজ্ঞান ও অর্থনীতির প্রতিষ্ঠাতা ইবনে খালদুন ১৪০৬ সালের ১৯ মার্চ (৮০৮ হিজরি) মৃত্যুবরণ করেন। ‘আল মুকাদ্দিমা’ তার রচিত বিখ্যাত বই। সপ্তদশ শতকের উসমানীয় খলিফাদের ওপর তার এই বইয়ের ব্যাপক প্রভাব পড়েছিল। এ ছাড়া আধুনিক সমাজবিজ্ঞানের পথিকৃত বলা হয় তাকে।
খালদুনের পুরো নাম ওয়ালি উদ্দিন আব্দুর রহমান ইবনে মুহাম্মাদ। তিনি তিউনিসে আরব বংশোদ্ভূত আন্দালুসিয়ান এক অভিজাত পরিবারে ১৩৩২ সালের ২৭ মে (৭৩২ হিজরির ১ রমজান) জন্মগ্রহণ করেন। বেড়ে ওঠা সেখানেই। প্রাথমিক জ্ঞান অর্জন করেন বাবার কাছ। প্রভাবশালী বংশের সন্তান হওয়ায় মাগরেবের প্রথিতযথা শিক্ষকদের সান্নিধ্য পান। তিনি গণিত, যুক্তিবিদ্যা ও দর্শনের পাশাপাশি পবিত্র কুরআন, হাদিস ও ফিকাহ নিয়ে পড়েন। আঠারো বছর বয়স পর্যন্ত তার পড়ালেখা চলে। এ সময় মিসর থেকে মৌরিতানিয়া পর্যন্ত সমগ্র উত্তর আফ্রিকায় প্লেগের মহামারী (ব্ল্যাক ডেথ) দেখা দেয়। এতে তার বাবা-মা মারা যান। ১৩৫২ সালে ইবনে তাফ্রাকিনের দরবারে কিতাব আল উলামার কাজে ডাক পান। ১৩৫৫ সাল নাগাদ তিনি হয়ে ওঠেন ফেজের উলামা পরিষদের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য।
জীবনের বেশিরভাগ সময় কাটে ফেজ, আন্দালুসিয়া, গ্রানাডা ও কায়রোসহ বিভিন্ন অঞ্চলে। এ সব অঞ্চলে তিনি অনেক রাজার উত্থান-পতন প্রত্যক্ষ করেন। যা একই সঙ্গে রাজনীতিতে তার উত্থান-পতনের ইতিহাস। বলা যায়, স্পেনকে বাদ দিলে পুরো উত্তর আফ্রিকা চষে বেড়িয়েছেন। তিনি এ সব রাজ্যের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। নানান ধরনের ট্রাজেডিতে পূর্ণ ছিল তার ব্যক্তিগত ও পেশাগত জীবন। নিঃসঙ্গ এই ব্যক্তি শেষ জীবনে ঠাঁই পান কায়রোতে। ব্যক্তিগত দুঃখ-দুর্দশা তাকে জ্ঞানচর্চা থেকে থামাতে পারেনি।
ইবনে খালদুনের সময়ে মুসলিম অধ্যুষিত বিভিন্ন অঞ্চল ক্ষমতার দিক থেকে পতনের দিকে যাচ্ছিল। তিনি সে সব রাজ-রাজাদের ইতিহাস গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেন। তার লেখা বিখ্যাত বই 'আল মুকাদ্দিমা' তাকে দিয়েছে কালজয়ী দার্শনিক, ঐতিহাসিক ও সমাজবিজ্ঞানীর সম্মান। ১৩৭৭ সালে পাঁচ মাস সময়ে বইটি রচনা করেন। এর মাধ্যমে সমাজবিজ্ঞানে নতুন দিগন্তের সূচনা করেন। ইতিহাসের ভেতর দর্শনকে খুঁজে বের করেন। আবার ইতিহাস ও সমাজের বিশ্লেষণ করেছেন যুগপৎভাবে। ফলে ইতিহাস ও সমাজবিজ্ঞানের মধ্যে নতুন ধরনের সম্পর্ক সূচিত হয়। যা পরবর্তীতে নৃতত্ত্বে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
তিনি সমাজকে যাযাবর অবস্থা থেকে নগর ও রাষ্ট্রের পত্তনের মাধ্যমে স্থায়ী বসবাসের অবস্থা পর্যন্ত ভাগ করেন। শহুরে সমাজ ও যাযাবর সমাজের মধ্যকার দ্বন্দ্ব ও বিরোধকে ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে দেখেন। সাম্রাজ্যের জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত সময়কে পাঁচ ভাগে ভাগ করেন- ভূ-খণ্ড বিজয়, সাম্রাজ্য গঠন, সর্বোচ্চ স্তরে আরোহণ, শক্তি হ্রাস এবং পতন। এতে মানব সমাজের দৃঢ়তা ও দুর্বলতা, নতুন ও পুরাতন যুগ, উত্থান ও পতনের দিকে নজর দেন।
বিষয়টির দিকে মনোযোগ দিলে বুঝা যায় তার আলোচনা শুধু সমাজ বা রাষ্ট্রকাঠামোর বাহিরের দিকে ব্যপ্ত নয়। বরং এর চেয়ে আরো গভীরে ডুব দেন। তা হলো মানুষের মনস্তত্ত্ব। এ ছাড়া অনুমাননির্ভর ধারণাকে বাদ দিয়ে পর্যবেক্ষণভিত্তিক অভিজ্ঞতাকে তিনি গুরুত্ব দেন। তার মতে, ঘটনা প্রবাহের বিশ্লেষণই উপযুক্ত পদ্ধতি। ১৮ শতকের শেষ দিকে তিনি পাশ্চাত্যে পরিচিতি লাভ করেন। ১৮০৬ সালে ফ্রান্সের প্রাচ্য বিশেষজ্ঞ ভেল্টার দ্য সাকি মুকাদ্দিমার কয়েকটি পরিচ্ছেদ অনুবাদসহ তার জীবনী ছাপেন। এর পর অস্ট্রিয়ান প্রাচ্যবিদ ভন হ্যামার পার্গস্টল তার একটি বইয়ে তাকে 'আরবীয় মন্টেস্কু' বলে অভিহিত করেছেন। এর পর উনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি নাগাদ তিনি ইউরোপে ব্যাপক পরিচিত পান। অগাস্ট ক্যোঁৎ ‘সোশিওলজি’ শব্দটি পাশ্চাত্যের অভিধানে সংযোজন করেন। তা আসলে পাঁচ শতাব্দী আগে প্রাচ্যের অভিধানে স্থান পাওয়া 'আল উমরান' এর পরিভাষা। এ ছাড়া ম্যাকিয়াভেলি’র ‘প্রিন্স’র ধারণা পাওয়া যায় ইবনে খালদুনের বর্ণনায়।
‘আল মুকাদ্দিমা’ বাংলায় অনুদিত হয়েছে অনেক আগে। দুই খণ্ডে অনুবাদ করেছেন গোলাম সামদানি কোরাইয়ী। এ ছাড়া এর ভূমিকা অংশটি অনুবাদ করেছেন ড. মুঈন-উদ-দীন আহমদ খান। এ ছাড়া তার বিখ্যাত আত্মজীবনীর শিরোনাম তা’রিফ বি-ইবনে খালদুন ওয়া-রিলাতুহু গারবান ওয়া-সারকার।
(দ্য রিপোর্ট/ডব্লিুউএস/এমডি/এএল/মার্চ ১৯, ২০১৪)

ভারত কী করে ভাগ হলো

image (1)

ভারত কী করে ভাগ হলো

তবে মহাত্মা গান্ধীর আবির্ভাবের আগেই হিন্দু রাজনীতির চরিত্র ধরা পড়েছিল। এ ঘটনা পরস্পরার মধ্যে ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলন বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। বঙ্গে পূর্বাঞ্চল নিয়ে নতুন একটি প্রদেশ সৃষ্টি হওয়ায় মুসলমান সম্প্রদায়ের মধ্যে উৎসাহের সঞ্চার হয়েছিল এই কারণে যে, এর ফলে তারা অর্থনীতি ও রাজনীতির ক্ষেত্রে উন্নতির সম্ভাবনার সন্ধান পেয়েছিল কিন্তু হিন্দুরা পার্টিশনের বিরোধিতা করে যে তুমুল সন্ত্রাসবাদের সৃষ্টি করে তা ছিল মুসলিম বিরোধী সাম্প্রদায়িক আন্দোলন। দূর্গার সামনে শপথ নিয়ে সন্ত্রাসবাদীরা কাজে নামত। পার্টিশনের বিরোধিতার প্রধান কারণ ছিল যে, এতে হিন্দু জমিদার ও মহাজনের ক্ষমতা ও প্রভাব লাঘবের আশংকা দেখা দিয়েছিল।
ভারত কী করে ভাগ হলো- এ প্রশ্ন নিয়ে ১৯৪৭ সালের পর একাধিক বই বেরিয়েছে। পুরোনো সরকারী দলিলপত্র তথা সে যুগের রাজনীতিকদের আত্মজীবনীমূলক পুস্তকাদি যতই বেরুচ্ছে ততই অনেক রহস্য উদ্ঘাটিত হচ্ছে। ভারত পার্টিশনের অব্যবহিত পর একতরফাভাবে মুসিলম লীগ, বিশেষ করে মুসলিম লীগ নেতা কায়েদে আজম মুহম্মদ আলী জিন্নাহকে দোষী সাব্যস্ত করে বৃটিশ দালাল-সাম্রাজ্যবাদের বশংবদ দাস ইত্যাদি উপাধি তাঁর উপর বর্ষিত হতো। বলা হতো যে, মুসলিম লীগ দ্বিজাতিতত্ত্বের ধূয়া না তুললে বা যদি আপোষ করার কোন সদিচ্ছা মুসলিম নেতাদের থাকত তাহলে ভারত বিভাগ প্রয়োজন হতো না। কংগ্রেস নেতাদের কোন দায়িত্ব এর মধ্যে থাকতে পারে- এ কথাটা কেউ আলোচনা করতে রাজি ছিলেন না। পাকিস্তানের সমর্থনে দেশে-বিদেশে যখনই কোন বই বা আলোচনা বেরিয়েছে তাকে ইতিহাসের বিকৃতি আখ্যা দেয়া হয়েছে।
ভারতীয় লেখকদের যুক্তিতে স্ববিরোধিতা থাকলেও সেটাকে রাজনীতির ক্ষেত্রে কেউ আমল দেয়নি। নৈর্ব্যক্তিক আলোচনায় তাঁরা কখনও কখনও স্বীকার করেছেন ভারত উপমহাদেশের নৃতাত্ত্বিক, ভাষাগত ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্রের কথা। বলেছেন যে, এদিক দিয়ে ইউরোপের চেয়ে বেশী বৈচিত্র্য ভারতে বিদ্যমান। কিন্তু তবু ভারত এক জাতি একথা বলতেও তাঁদের কুণ্ঠা হয়নি। এই জাতীয়তার স্বরূপ নির্ধারণ করতে গিয়ে অনেকে বিপাকে পড়েছেন।
আচারে, ব্যবহারে, ধর্মে, সংস্কৃতিতে, ভাষায়, সামাজিক জীবনধারায় বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে এত প্রভেদ থাকা সত্ত্বেও ভারতকে কেন এক জাতি বলা হবে- এর কোন বিতর্কাতীত সংজ্ঞা কেউ উপস্থাপিত করতে পারেনি, যা আমরা পেয়েছি, সে হচ্ছে শুধু অযৌক্তিক আস্ফালন। জওহরলাল নেহেরুর মত ব্যক্তি তাঁর ডিসকভারী অব ইণ্ডিয়াতে যখন ভারতবর্ষের সত্যিকারের রূপের আবিষ্কার করতে গেলেন, যেরূপ তিনি উদ্ঘাটন করলেন তা হচ্ছে হিন্দু ভারতের রূপ, ভারতের মধ্য যুগের সমস্ত ইতিহাস তাঁর সংজ্ঞায় স্থান পেল না। কারণ, সে ইতিহাস ছিল মুসলিম যুগের ইতিহাস। স্থাপত্যে, সাহিত্যে, ললিত কলায়, জীবনধারায় মুসলমানেরা যা কিছু করেছিলেন- যার ছাপ কখনও নিশ্চিহ্ন হবার নয়। তাকে নেহেরু আমল দিলেন না।
তেমনি অরবন্দি ঘোষ ভারতীয় সংস্কৃতির উপর যে জাতীয়তাবাদ প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছিলেন, সেটা ছিল গীতা-নির্ভর সংস্কৃতি। তার মধ্যে ইসলামের কোন স্থান ছিল না। ডঃ তারাচাঁদের মতো পণ্ডিত কেউ কেউ ভারতীয় জীবনে ইসলামের অবদানের কথা স্বীকার করেছেন সত্য, কিন্তু রাজনীতির সঙ্গে জড়িত কোন হিন্দু নেতা সে কথা কার্যত স্বীকার করেননি। অন্যদিকে বইপত্রে দেশী-বিদেশী সব পণ্ডিত মুসলিম ও হিন্দু- এই দুই প্রধান গোষ্ঠীকে দুই ভিন্ন সভ্যতার প্রতিনিধি হিসাবে চিহ্নিত করেছেন।
১৮৮৫ সালে কংগ্রেস পতিষ্ঠিত হয়। প্রথম প্রথম জাতীয়তাবাদের উপর ততটা জোর ছিল না, যতটা ছিল সর্বভারতীয় একটি রাজনৈতিক রঙ্গমঞ্চ নির্মাণের উপর। তখনই কিন্তু স্যার সৈয়দ আহমদের মত দূরদর্শী ব্যক্তিরা মুসলমানদের হুশিয়ার করে দিচ্ছিলেন। বলেছিলেন যে, যেখানে দুই গোষ্ঠীর স্বার্থ অভিন্ন নয়, সেখানে একই রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানে তাঁরা যোগ দিতে গেলে সমূহ বিপদের সম্ভাবনা দেখা দেবে। তাঁর সে ভবিষ্যদ্বাণী যথার্থ প্রমাণিত হয়েছিল।
কারণ, কংগ্রেস যখন জাতীয়তাবাদের কথা বলতে শুরু করল, দেখা গেল সেটা হিন্দু জাতীয়তাবাদের নামান্তর মাত্র।
মহাত্মা গান্ধী যখন দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে এসে কংগ্রেসে যোগ দিলেন এবং তাঁর ব্যক্তিত্বের প্রভাবে অন্য নেতারা তাঁর কর্তৃত্ব মেনে নিতে বাধ্য হলেন তখন কংগ্রেস জাতীয়তাবাদের স্বরূপ আরও বেশী করে প্রকট হয়ে উঠল। গান্ধী প্রকাশ্যভাবে রাজনীতিতে ধর্মের অনুপ্রবেশ ঘটালেন। রামরাজ্যের আদর্শের কথা বললেন, রামরাজ্য বলতে যে আদর্শের চিত্র মুসলিম মানসে প্রতিভাত হয়, সেটা যে একান্তভাবে হিন্দু আদর্শ- সে আপত্তিতে তিনি কর্ণপাত করলেন না। মুসলমানরা কংগ্রেসের উপর আস্থা হারিয়ে ফেরতে লাগল।
তবে মহাত্মা গান্ধীর আবির্ভাবের আগেই হিন্দু রাজনীতির চরিত্র ধরা পড়েছিল। এ ঘটনা পরস্পরার মধ্যে ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলন বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। বঙ্গে পূর্বাঞ্চল নিয়ে নতুন একটি প্রদেশ সৃষ্টি হওয়ায় মুসলমান সম্প্রদায়ের মধ্যে উৎসাহের সঞ্চার হয়েছিল এই কারণে যে, এর ফলে তারা অর্থনীতি ও রাজনীতির ক্ষেত্রে উন্নতির সম্ভাবনার সন্ধান পেয়েছিল কিন্তু হিন্দুরা পার্টিশনের বিরোধিতা করে যে তুমুল সন্ত্রাসবাদের সৃষ্টি করে তা ছিল মুসলিম বিরোধী সাম্প্রদায়িক আন্দোলন। দূর্গার সামনে শপথ নিয়ে সন্ত্রাসবাদীরা কাজে নামত। পার্টিশনের বিরোধিতার প্রধান কারণ ছিল যে, এতে হিন্দু জমিদার ও মহাজনের ক্ষমতা ও প্রভাব লাঘবের আশংকা দেখা দিয়েছিল।
এসব ঘটনাপ্রবাহের মধ্যে মুসলিম বিচ্ছিন্নতাবাদের সত্যিকার রহস্য ধরা পড়ে। প্রথম প্রথম তারা বিচ্ছিন্ন রাষ্ট্রের কথা বলেনি। হিন্দুদের সঙ্গে বোঝাপড়া করে বৃটিশরা যে ভারত সৃষ্টি করে তার আওতার মধ্যে ভবিষ্যত রচনা করতে চেয়েছিল। কিন্তু সেটা হতে দিল না কংগ্রেস।
এ সমস্ত কথা নতুন নয়। মুসলিম লেখকরা একাধিকবার এসব কথা বলেছেন, কিন্তু তাঁরা সাম্প্রদায়িক সংকীর্ণ স্বার্থবুদ্ধিপ্রণোদিত– এই বলে তাঁদের সমস্ত যুক্তি উড়িয়ে দেয়া হয়েছে।
বর্তমান ভারতে এ সম্বন্ধে যাঁরা নতুনভাবে ভাবতে শুরু করেছেন তাঁদের মধ্যে ইদানীং একটা স্বচ্ছ দৃষ্টিভঙ্গির পরিচয় পাওয়া যাচ্ছে। কিছুকাল আগে অন্নদা শংকর রায়ের ভূমিকা সম্বলিত ‘জিন্না : পাকিস্তান : নতুন ভাবনা’ নামক যে বইটি কলকাতা থেকে প্রকাশিত হয়েছিল তার মধ্যে ১৯৪৭ সালের পার্টিশন সম্বন্ধে অনেক সত্য কথা আছে, যদিও লেখক এবং অন্নদা শংকর রায় উভয়েই নিজেদের তথ্যবিরোধী এক সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেন। একদিকে তারা দেখিয়েছেন যে, নেহেরু ক্যাবিনেট মিশন প্ল্যান বাতিল করায় ভারত বিভাগ অনিবার্য হয়ে পড়ে। অন্যদিকে, এ জন্য কায়েদে আজম জিন্নাহকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়। এই স্ববিরোধিতার জন্য বইটির মর্যাদা হ্রাস পেয়েছে। কারণ, পাঠক মাত্রই প্রশ্ন করে যে, নেহেরুর সিদ্ধান্ত যদি ভারত বিভাগ অনিবার্য করে তোলে তবে জিন্নাহকে ইতিহাসের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে এ জন্য জবাবদিহি করতে হবে কেন?
এদিক থেকে সদ্য (১৯৯১) প্রকাশিত ‘ভারত কী করে ভাগ হলো’? বইখানা সম্পর্ণ ব্যতিক্রমধর্মী। লেখক বিমলানন্দ শাসমল নির্মোহ দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে হিন্দু সমাজের চরিত্র বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন যে, বিচ্ছিন্নতাবাদের অংকুর ঐ সমাজের মূল বিশ্বাসগুলোর মধ্যে নিহিত ছিল। তাঁর সাহস, নির্ভীকতা বিস্ময়কর। তিনি যেখানে সত্যের সন্ধান পেয়েছেন তা উপস্থিত করতে দ্বিধা করেন নি।
ভারতের প্রাচীন ইতিহাস নিয়ে আলোচনা শুরু করতে গিয়ে হিন্দু হয়েও বিমলানন্দ শাসমল স্বীকার করেনে যে, ব্রাহ্মণ্যবাদের জাতিভেদ প্রথার জন্য অন্য কোন সম্প্রদায়ের বিকাশ অসম্ভব। জতিভেদ আবার প্রতিষ্ঠিত কর্মবাদের উপর। সমাজের যত অনাচার যার ফলে নিম্নবর্গের হিন্দুরা যুগ যুগ ধরে নির্যাতিত হয়ে আসছে তাকে বলা হয়েছে পূর্ব জন্মের কর্মফল, অর্থাৎ এর জন্য উপরের কোন শ্রেণী দায়ী নয়। এভাবেই ব্রাহ্মণ শ্রেণীর আধিপত্য সমাজে পাকা করা হয়।
এর পেছনে যে স্বার্থপরতা কাজ করেছে তার প্রভাব অহিন্দু সম্প্রদায়গুলোর সঙ্গে হিন্দু সম্প্রদায়ের সংস্পর্শের উপর এসে পড়েছে, অবশ্যম্বাভী রূপে। উচ্চ শ্রেণীর হিন্দুরা চেয়েছে চিরকাল নিজেদের স্বার্থ রক্ষা করতে। তারা যে সমস্ত বিশেষ অধিকার ও সুবিধা করায়ত্ত করেছে তার বিন্দুমাত্র ক্ষতি হোক, এ রকম আশংকা দেখা দিলেই তারা ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে।
এই পরিপ্রেক্ষিতে মিঃ শাসমল বৃটিশ ভারতের রাজনীতির পর্যালোচনা করেছেন। তিনি দেখিয়েছেন, কংগ্রেস প্রথম থেকেই ধরে নিয়েছিল যে, হিন্দু স্বার্থ ভিন্ন আর কোন স্বার্থ রক্ষার প্রয়োজন ঘটতে পারে না। মুসলমানদের ধর্মীয় অনুভূতি এবং তজ্জনিত স্বার্থবোধ অন্যরূপ হতে পারে- এ ধারণা কংগ্রেস নেতৃবৃন্দ আলোচনা করতেই প্রস্তুত ছিলেন না।
বঙ্গবঙ্গ বিরোধী আন্দোলনের সময় হিন্দু-মুসলিম দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্য বিশেষভাবে ধরা পড়েছিল। কিন্তু হিন্দুরা তাদের জমিদার ও মহাজন শ্রেণীর স্বার্থকে জাতীয়তাবাদ বলে চালিয়ে দিয়েছিল। লেখক দ্বিধাহীন কণ্ঠে স্বীকার করেন যে, বঙ্গভঙ্গবিরোধী আন্দোলন ছিল মুসলমানবিরোধী।
হিন্দুদের মধ্যে যে উদারপন্থী কেউ ছিলেন না, তা নয়। লেখকের পিতা বীরেন্দ্র শাসমল সন্ত্রাসবাদীদের সমালোচনা করেছিলেন বলে তাকে শেষ পর্যন্ত কংগ্রেস থেকে তাড়িয়ে দেয়া হয়। বঙ্গীয় কংগ্রেস নেতাদের মধ্যে তিনি বাংলার মুসলমানদের সমস্যা বুঝতেন। কিন্তু সুভাষ বসু, শরৎ বসু, বিধান রায় এরা তাঁকে সমর্থন না করে সন্ত্রাসবাদীদের সমর্থন করেন।
উদারপন্থী আরেক ব্যক্তি ছিলেন চিরত্তরঞ্জন দাস বা সি আর দাস। তিনি উপলব্ধি করেন যে, মুসলমানদের পেছনে ফেলে স্বাধীনতা আন্দোলন সফল হবে না। এই অনুভবের প্রেরণায় ১৯২৩ সালের বঙ্গের প্যাক্ট স্বাক্ষরিত হয়। কিন্তু তাঁর মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে যখন সুভাষ বসু সেই প্যাক্ট প্রত্যাখান করলেন তখন হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের শেষ সম্ভাবনাটুকু বিলীন হয়ে গেল।
বেঙ্গল প্যাক্টে মুসলমানদের বিশেষ কোন সুবিধা দেয়ার কথা ছিল না। শুধু এই স্বীকৃতি ছিল যে, চাকরিতে এবং আইন পরিষদে তারা সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব লাভ করবে। শিক্ষায় অনগ্রসরতার কারণে এতদিন তারা অবহেলিত, সি আর দাস বোঝাতেন যে, মুসলমানদের এই অবস্থা থেকে উদ্ধার করতে না পারলে তার অকুণ্ঠচিত্তে স্বাধীনতা আন্দোলনে শরীক হতে পারবে না। কিন্তু তাদের শতকরা ৫৫ ভাগ চাকরি দিতে হবে, হিন্দুদের ভাগে কিছুটা ছাড় দিতে হবে।
এটা অন্য হিন্দু নেতাদের সহ্য হল না। আরও মজার কথা- প্যাক্টে একথাও ছিল যে, মুসলমানদের মনে আঘাত লাগে এ জন্য মসজিদের সামনে বাজনা বাজানো চলবে না। কংগ্রেস হিন্দুরা এখন আরো বেশী করে মসজিদের সামনে বাজনা বাজিয়ে মিছিল করতে লাগরেন। পটুয়াখালীতে যে ব্যক্তি এই আন্দোলনে নেতৃত্ব দিলেন তিনি ছিলেন কংগ্রেসের একজন স্থানীয় নেতা সতীন সেন। বিমলানন্দ শাসমলের ভাষায় : “বরিশালের নেতা সতীন সেন পটুয়াখালীতে এক সত্যাগ্রহ আরম্ভ করলেন। যাতে প্রতিদিন সত্যাগ্রহীরা মসজিদের সামনে বাজনা বাজিয়ে শোভাযাত্রা করে যেতেন এবং এই বেআইনী শোভাযাত্রা বেআইনী কাজ করে গ্রেফতার বরণ করতেন। সতীন সেন বরিশাল জেলা কংগ্রেসের সম্পাদক ছিলেন।” (১০৭ পৃষ্ঠা)
পটুয়াখালী সত্যাগ্রহের জের স্বরূপ বরিশাল শহরে দাঙ্গায় ২১ জন নিরস্ত্র দরিদ্র মুসলমান পুলিশের গুলীতে মারা পড়ে।
পটুয়াখালির এই ঘটনা বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ এ জন্য যে, মসজিদের সামনে বাজনা বাজাবার এই আন্দোলন কংগ্রেসের অন্দোলনের সাথে পরিচালিত হয়েছিল এবং এর বিরুদ্ধে সর্বভারতীয় হিন্দু নেতারা যেমন কোন কথা বলেননি, তেমনি বঙ্গদেশীয় কংগ্রেস নেতারাও প্রতিবাদ করেননি।
এরপর কংগ্রেসের জাতীয়তাবাদ সম্বন্ধে মুসলমানদের মনে কোন সংশয় থাকবার কারণ ছিল না।
এ রকম বহু ঘটনার উল্লেখ বিমালনন্দ শাসমল করেছেন। যেমন ১৯৩৭ সালের নির্বাচনের পর ফজলুল হক সাহেবের কৃষক প্রজা পার্টি কংগ্রেসের সঙ্গে কোয়ালিশন মন্ত্রী সভা করতে চাইলে গান্ধী এতে সম্মতি দিলেন না। একথাও এখানে উল্লেখযোগ্য যে, যুক্ত প্রদেশে (বর্তমানে উভয় প্রদেশ) মুসলিম লীগ ঠিক অনুরূপ প্রস্তাব কংগ্রেসকে দিয়েছিল, জওহারলাল নেহেরু সেটা নাকচ করেন। তিনি বললেন, মুসলিম লীগের সদস্যরা যদি পার্টি থেকে পদত্যাগ করে কংগ্রেসে যোগদান করেন তবেই এ রকম সহযোগিতা সম্ভব।
বিমলানন্দ শাসমলের মতে, কংগ্রেসের নেতৃবর্গের হঠকারিতা ও অদূরদর্শিতার দরুনই ক্রমান্বয়ে মুসলমানদের মধ্যে এই বিশ্বাসের সঞ্চার হয় যে, অবিভক্ত ভারতে সসম্মানে জীবন ধারণের কোন আশা তাদের নেই। ১৯৪০ সালের লাহোরে তথাকথিত পাকিস্তান প্রস্তাব গৃহীত হওয়ার পরও যে কায়েদে আজম মোহাম্মদ আলী আপোষ করতে প্রস্তুত ছিলেন, তার প্রমাণ ১৯৪৬ সালের ক্যাবিনেট মিশন প্রস্তাবকালে পাওয়া গেছে। মিঃ শাসমলের আগেও অনেকে স্বীকার করেছেন যে, ক্যাবিনেট মিশন ব্যর্থ হয় গান্ধী এবং নেহেরুর অযৌক্তিক আচরণে। মওলানা আজাদ তাঁর ‘ইণ্ডিয়া উইনস ফ্রিডম’ গ্রন্থে দেখিয়েছিলেন যে, নেহেরু যদি মিশন প্রস্তুতি নাকচ করে না দিতেন তবে ভারতবিভাগের প্রয়োজন পড়ত না। শাসমল তার সমর্থনে আরও যুক্তি দেখিয়েছেন।
কায়েদে আজম জিন্নাহর কাছে পাকিস্তান শেষ কথা ছিল না। সুযোগ পেলে তিনি সম্মানজনক মীমাংসায় আসতে রাজী ছিলেন। আমরা কংগ্রেসের মুখে আমেরিকার যুক্তরাষ্ট্রের মতো ইউনাইটেড স্টেটস অব ইন্ডিয়া গঠনের প্রস্তাবও শুনিনি। তারা আগাগোড়া ভারতীয় জাতীয়তাবাদের স্বপ্নে মেতেছিলেন। বিমলানন্দ বারবার স্বীকার করেছেন যে, এই জাতীয়তাবাদের সঙ্গে হিন্দু জাতির পুনরুত্থানের স্বপ্নের কোন তফাৎ ছিল না।
কংগ্রেস যে সত্য কখনই স্বীকার করেনি, কোন কোন হিন্দু নেতা সে কথা বলেছেন। ১৯২৩ সালে ভাই পরমানন্দ বলেছিলেন, ভারতকে হিন্দু ভারত এবং মুসলিম ভারতে বিভক্ত করাই গণতন্ত্রসম্মত হবে। পাকিস্তান ও ভারত অনেকটা সেই প্রস্তাবের বাস্তবায়ন। কিন্তু কংগ্রেস আগাগোড়া জিদ ধরে যেমনি ভারতের অখণ্ডতা রক্ষা করতে পারল না, তেমনি ১৯৪৭ সালের মীমাংসাও নিঃশর্তভাবে মেনে নিতে পারল না। পরবর্তীকালে পাকিস্তানের সঙ্গে তার সম্পর্কের যে তিক্ততা তার মূল এখানেই।
১৯৬২ সালে নয়াদিল্লীতে আমি একবার জওহরলাল নেহেরুর বক্তৃতা শুনে স্তম্ভিত হয়েছিলাম। কমনওয়েলথ শিক্ষা সম্মেলনের উদ্বোধনী ভাষণে তিনি বললেন যে, ভারতের কালচারের ভিত্তি হচ্ছে সংষ্কৃত ভাষা। প্রকাশ্যত যে কালচারের কথা ভেবে নেহেরুর মুখে এই উক্তি উচ্চারিত হয়, সেটা যে হিন্দু কালচার- তাতে সন্দেহ করার কোন কারণ ছিল না। সাতশ’ বছর ধরে মুসলমানরা ভারতের বুকে যে সভ্যতা ও কালচারের সৃষ্টি করেছিল নেহেরু তাকে সম্পূর্ণভাবে ভারতীয় কালচারের সংজ্ঞা থেকে বাদ দিলেন। হিন্দু হিসাবে একথা বলার অধিকার তার অবশ্যই ছিল, কিন্তু তিনিই তো ধর্মনিরপেক্ষ কালচারের কথা সবচেয়ে বেশী করে বলতেন।
একদিকে নেহেরুর বক্তৃতায় আমি যেমন বিস্মিত হয়েছি, অন্যদিকে তাঁর স্পষ্টবাদিতার প্রশংসাও করেছি। ভেবেছি, তাঁর রাজনীতিতে যদি বাস্তববাদিতা প্রকাশ পেত- অভিবক্ত ভারতকে এত দুঃখ পোহাতে হত না।
যে নীতির ভিত্তিতে পাকিস্তান ও ভারতের সৃষ্টি হল ১৯৪৭ সালে, সেই নীতি অনুসারে কাশ্মীর পাকিস্তানভুক্ত হওয়ার কথা। এখানেও নেহেরু এমন এক নীতি অবলম্বন করলেন যার ফলে প্রকাশ্যে জাতিসংঘে প্রদত্ত সমস্ত প্রতিশ্রুতি ভারত ভঙ্গ করতে বাধ্য হল। কিন্তু আবার প্রশ্ন করব, বিনিময়ে ভারত পেয়েছে কি? কাশ্মীরের সমস্ত মানবাধিকার আজ লুপ্ত। অমানুষিক নির্যাতন করে কাশ্মীর অধিবাসীদের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার থেকে বঞ্চিত করে রাখা হচ্ছে। কিন্তু দুঃখের কথা, নেহেরুর উত্তরসুরিরাও নেহেরুর সেই অযৌক্তিক স্বপ্ন আঁকড়ে ধরে আছেন। রক্তক্ষয়ী সংগ্রামে কাশ্মীরীরা যেমন প্রাণ হারাচ্ছে, তেমনি ইন্ডিয়ান সৈন্য বাহিনীরও ক্ষতি হচ্ছে। তবু এই নৃশংস নাটকের কোন অবসান নেই। কোনো শর্তেই ভারত কাশ্মীরে গণভোট হতে দেবে না। সে জানে, ভোটের ফল কি হবে। এটা কি গণতন্ত্রের কথা না-কি নিছক সাম্রাজ্যবাদ?
আমরা আনন্দিত যে, বিমলানন্দ শাসমলের মতো সৎ সাহসী ব্যক্তি হিন্দু জাতীয়তাবাদের মুখোশ খুলে ফেলতে এগিয়ে এসেছেন। বিভক্ত ভারতকে আবার জোড়া লাগিয়ে এক রাষ্ট্রে পরিণত করার যে চেষ্টা ভারতীয় কূটনীতির মূল চাবিকাঠি, সেটা পরিত্যক্ত হলে এখন এই উপমহাদেশের জনগণের জীবনে শান্তি ফিরে আসবে বলে আমরা মনে করি এ জন্য চাই পরম সত্যনিষ্ঠা। তারই একটি উদাহরণস্বরূপ বিমলানন্দ শাসমলের বই-এর যথার্থ মূল্য।
সূত্রঃ মেসবাহ উদ্দীন আহ্‌মাদ সম্পাদিত ‘ডঃ সৈয়দ সাজ্জাদ হোসায়েন স্মারক গ্রন্থ’

ইমাম ইবনে তাইমিয়া কে ছিলেন

ইবনে-তাইমিয়া-কাল্পনিক-ছবি

ইমাম ইবনে তাইমিয়া কে ছিলেন?

শায়খুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমিয়া রাহিমাহুল্লাহ ছিলেন হিজরী সপ্তম শতাব্দীর একজন ‘মুজাদ্দিদ’। তিনি ছিলেন,
(ক) অসাধারণ মেধা, আশ্চর্য স্মৃতিশক্তি, সূক্ষ্ম বিচারশক্তি ও সুদক্ষ তাকির্কতার পারদর্শী আলেমে-দ্বীন, (খ) অসাধারণ পান্ডিত্যের অধিকারী ফকীহ, (গ) জারাহ ও তাদীলের ইমাম, (ঘ) ক্বুরান ও হাদীসের হিফজকারী ও সঠিক ব্যখ্যা প্রদানকারী, এবং (ঙ) আল্লাহর রাস্তায় মুজাহাদা।
ইলম, তাজকিয়া ও জিহাদের ময়দানে তাঁর খিদমত এতো বেশি যে, পশ্চিম থেকে পূর্ব পর্যন্ত সমস্ত মুসলিম আলেমরা যুগে যুগে তাঁর প্রশংসায় পঞ্চমুখ ছিলেন এবং আছেন।
নামঃ ইবনে তাইমিয়া রাহিমাহুল্লাহর আসল নাম হচ্ছে আহমাদ ইবনে আব্দুল হালিম ইবনে তাইমিয়া। তাঁর উপাধি হচ্ছে শাইখুল ইসলাম। তিনি ‘ইবনে তাইমিয়া’ নামে বেশি পরিচিত, এটা তাঁর দাদীর নাম। উল্লেখ্য, তাঁর দাদী ছিলেন একজন আলিমাহ, এবং ইবনে তাইমিয়ার অসংখ্য উস্তাদের মাঝে তাঁর দাদীও একজন ছিলেন।
জন্ম ও মৃত্যুর স্থানঃ ইবনে তাইমিয়া রাহিমাহুল্লাহর জন্ম হয়েছিলো দামেস্কের হাররান প্রদেশে, আর মৃত্যু হয়েছিলো দামেস্কে।
জন্ম ও মৃত্যুর তারিখ ও বয়সঃ ইবনে তাইমিয়া রাহিমাহুল্লাহর জন্ম হয়েছিলো ৬৬১ হিজরি বা ইংরেজি ১২৬৩ খ্রিষ্টাব্দে। আর মৃত্যু হয়েছিলো ৬৫ বৎসর বয়সে, ৭২৮ হিজরি বা ১৩২৮ খ্রিষ্টাব্দে।
জীবনীঃ ইসলামী ইতিহাসের অনন্য প্রতিভার অধিকারী এই আলেমের জীবনী অত্যন্ত ঘটনা বহুল এবং সংগ্রাম মুখর। তাঁর সারাটা জীবন কেটেছে মুসলমানদের মধ্য থেকে শিরক, বিদাত দূর করার জন্যে মনপূজারীদের বিরুদ্ধে লিখনী ও বক্তৃতার মাধ্যমে মেহনত করা। বিদাতী আলেমদের চক্রান্তে জীবনে তাঁকে অনেক সময় জেলে কাটাতে হয়েছিলো। এমনকি ইমাম আবু হানীফার মতো তাঁর মৃত্যুও হয়েছিলো জেলখানাতে। ঐতিহাসিকগণদের কেউ কেউ উল্লেখ করেছেন, তাঁর মৃত্যুর পর প্রায় দুই লক্ষ মুসলমান তাঁর জানাজা পড়ার জন্যে সমবেত হয়েছিলো। তাঁর জীবন সম্পর্কে বিস্তারিত জানার জন্যে আপনারা শায়খ আলীমুদ্দিন (রাহিমাহুল্লাহ) রচিত “শায়খুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমিয়া রাহিমাহুল্লাহ” এই বইটা পড়তে পারেন।
শায়খুল ইসলাম এর জীবনী সম্পর্কে আলোকপাত না করলেও, আমি তাঁর সম্পর্কে আমাদের পূর্ববর্তী আলেমরা কে কি বলেছেন, সে সম্পর্কে কিছু বক্তব্য তুলে ধরছি।
(১) ‘সহীহ বুখারীর ব্যখ্যাকারী’, ইমাম ইবনে হাজার আসকালানী রাহিমাহুল্লাহ বলেন,
“একজন ইমাম হিসেবে শায়খ তাক্বী উদ্দিন (ইবনে তাইমিয়ার) সম্মান ও মর্যাদা আমাদের কাছে সূর্যের চাইতেও উজ্জ্বল, এবং ‘শায়খুল ইসলাম’ হিসেবে তাঁর উপাধি আজ পর্যন্ত আমাদের কাছে আছে এবং ভবিষ্যতেও থাকবে। যে ব্যক্তি তাঁকে (ইবনে তাইমিয়াকে) ‘শায়খুল ইসলাম’ হিসেবে মেনে নিতে অস্বীকার করবে, সে শায়খের মর্যাদা সম্পর্কে জাহেল, অথবা সে ব্যক্তি পক্ষপাতদুষ্ট। এমন কাজ যে করে সে কতইনা বড় ভুল পন্থা অবলম্বন করলো!”
আল-রাদ্দ আল-ওয়াফিরঃ পৃষ্ঠা ১৪৫-১৪৬, আল-জাওয়াহির ওয়াল-দু’রারঃ ২/৭৩৪-৭৩৬।
(২) ‘তাফসীরে জালালাইন’ এর লেখক, ইমাম জালাল উদ্দিন সুইয়ুতী রাহিমাহুল্লাহ ইবনে তাইমিয়ার জীবনী সম্পর্কে আলোচনায় বলেছেন,
“ইবনে তাইমিয়া হচ্ছেন আমাদের উস্তাদ, ইমাম (নেতা বা আদর্শ), একজন ‘আল্লামাহ’ (মহা পন্ডিত ব্যক্তি), হাফিজ (ক্বুরান ও অসংখ্য হাদীসের মুখস্থকারী), জারহ ও তাদীলের আলেম, ফক্বীহ, মুজাহিদ, অসাধারণ মুফাসসির, একজন‘শায়খুল ইসলাম’, যাহিদ (দুনিয়া বিমুখ ও পরকালমুখী) লোকদের জন্যে আদর্শ বা নেতা। আমাদের যুগে তাঁর সমান আর কেউ নেই।”
তাবাকাত আল-হুফফাজঃ পৃষ্ঠা ৫১৬-৫১৭।
(৩) ‘তাফসীর ইবনে কাসীর’ এর লেখক, ইমাম ইবনে কাসীর রাহিমাহুল্লাহর প্রধান উস্তাদ ছিলেন ইমাম ইবনে তাইমিয়া। তিনি ইবনে তাইমিয়ার পক্ষ নিয়ে শায়খের বিরোধীতাকারীদের জবাব দিতেন। ইমাম ইবনে কাসীর শায়খের পক্ষে তাঁর ‘ক্বুরানের তাফসীর’ ও তাঁর বিখ্যাত ইতিহাসের কিতাব ‘আল-বিদায়া ওয়ান নিয়াহা’ তে অনেক ঘটনা ও ফতোয়া উল্লেখ করেছেন।
(৪) রিজাল শাস্ত্রের বড় আলেম, ইমাম আয-যাহাবী রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন,
“তিনি (ইবনে তাইমিয়া) হচ্ছেন আমাদের উস্তাদ, একজন শায়খুল ইসলাম। আমাদের যুগে (হিজরী সপ্তম ও অষ্টম শতাব্দীতে) ইলম, সাহস, বুদ্ধিমত্তা, আধ্যাত্বিক উৎকর্ষতা,দানশীলতা, উম্মতের জন্যে কল্যাণকামীতা, সৎ কাজে আদেশ করা ও অসৎ কাজে নিষেধ করার ব্যপারে তাঁর মতো আর কেউ নেই। হাদীসের রিজালশাস্ত্র, দোষ-ত্রুটি বিচার-বিশ্লেষণ ও স্তর নির্ধারণ, মুহাদ্দিসের নিকট হাদীস পৌঁছতে রাবীর কম-বেশি হওয়া সম্পর্কিত জ্ঞান, কোন হাদীস সহীহ নাকি জয়ীফ সেটা নির্ণয় করার জন্যে মতন মুখস্থ সহ যাবতীয় জ্ঞানে তিনি ছিলেন বিশেষজ্ঞ। তাঁর যুগে তাঁর সমান মর্যাদায় কিংবা তাঁর ধারে-কাছেও কেউ পৌঁছতে পারেনি। তিনি যেকোন বিষয়ে তাৎক্ষণিক দলিল প্রমাণ সহকারে আলোচনা করার জন্য পারদর্শী ছিলেন।”
তাবাকাত আল-হানবালিয়াঃ ৪/৩৯০।
(৫) ইরাকের বিখ্যাত হানাফী আলেম, আল্লামাহ মোল্লা আলী ক্বারী রাহিমাহুল্লাহ ইমাম ইবনে তাইমিয়্যাকে সমর্থন করে বলেছেন, “ইমাম ইবনে তাইমিয়্যা ও তাঁর ছাত্র হাফিজ ইবনুল কাইয়্যিম আহলে সুন্নাত ওয়াল জামআ’তের বড় আলেম ছিলেন এবং এই উম্মতের ওলী ছিলেন।”
মানাকিবুশ-শায়খুল ইসলাম, ৬২৭ পৃষ্ঠা। hafez_nesar_quran
(৬) ভারতগুরু শাহ ওয়ালী উল্লাহ দেহলভী রাহিমাহুল্লাহ বলেন,
“আমি ইবনে তাইমিয়্যা রাহিমাহুল্লাহর অবস্থা যথেষ্ঠ পর্যালোচনা করেছি। তিনি ছিলেন আল্লাহর কিতাব (ক্বুরআন) সম্পর্কে অভিজ্ঞ ব্যক্তি। আভিধানিক ও শরীআ’তী পদ্ধতির ব্যখ্যায় তিনি ছিলেন সূক্ষ্ম দৃষ্টিসম্পন্ন ব্যক্তি, রাসুলু্লাহ সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম এর সুন্নাতের হিফাজতকারী, প্রখর স্মৃতি শক্তিধারী ব্যক্তি। সাহাবা এবং তাবিঈ’নগণের আদর্শ ও ধ্যান-ধারণা সম্পর্কে এবং তার আভিধানিক ও শরীআ’তী অর্থগুলো সম্পর্কে তার অগাধ পান্ডিত্য ছিলো এবং তার সব কথার সাথে ক্বুরান ও সুন্নাহর প্রমান আছে।”
শাহ ওয়ালী উল্লাহ দেহলভী রাহিমাহুল্লাহ আরো বলেছেন,“এই শায়খের (ইমাম ইবনে তাইমিয়্যার) দৃষ্টান্ত এই পৃথিবীতে বিরল। কে আছে এমন ব্যক্তি যে তার লিখনী ও বক্তৃতার সাথে পাল্লা দিতে পারবে? যারা তার সাথে শত্রুতা করেছে তাদের বিদ্যা শায়খের বিদ্যার দশ ভাগের এক ভাগেরও সমান নয়।” [মাকতুবাতঃ ২৭-২৮ পৃষ্ঠা]
(৭) ভারতবর্ষের সুপরিচিত ব্যক্তিত্ব আল্লামাহ শিবলী নুমান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “ইমাম ইবনে তাইমিয়ার মাঝে মুজাদ্দিদ হওয়ার যে বৈশিষ্ট্য পরিলক্ষিত হয়েছিলো, তা চার ইমাম (ইমাম আবু হানীফা, ইমাম মালেক, ইমাম শাফেয়ী এবং ইমাম আহমাদ) এর মাঝেও ছিলোনা।”
“আন-নাদওয়াহ” মাকালাতে শিবলী, ৫ম খন্ড, ৬৫-৬৬ পৃষ্ঠা।
যুগে যুগে মুসলিম নামধারী কিন্তু আসলে বিদাতপন্থী বা মনপূজারী লোকদের মাঝে কমন একটা বদ চরিত্র হচ্ছে তারা আলেমদের আক্রমণ করে, তাদের সম্পর্কে কুৎসা রটনা করে এবং তাদেরকে অপমান করার চেষ্টা করে। আলহা’মদুলিল্লাহ, মাওলা এবং সাহায্যকারী হিসেবে আল্লাহ একাই তাঁর আওলিয়াদের জন্যে যথেষ্ঠ। যুগে যুগে বিদাতপন্থীরা শায়খুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া সম্পর্কে কুৎসা রটনা করেছে এবং আজ পর্যন্ত করছে।
বিংশ শতাব্দীতে ‘জাহমী’ মতবাদের প্রচারকারী যাহেদ আল-কাউসারী (মৃত্যু ১৯৫১ খৃস্টাব্দ) ইবনে তাইমিয়া সম্পর্কে লিখালিখি করে নিজেকে অপমানিত করেছিলো। কাউসারীর কুকীর্তীর ব্যপারে সতর্ক করে শায়খ বিন বাজ রাহিমাহুলাহ লিখেছিলেন, “কাউসারি ঈমানদার পরহেজগার ব্যক্তি ও উলামাদের বিরুদ্ধে কুৎসা রটনা করেছেন। আমরা তার ছাত্র আবু গুদ্দাকে তার উস্তাদের এই সব ব্যপার হতে তওবা করে দূরে সরে আসার জন্যে বারবার বিশেষভাবে আহবান জানাই, কিন্ত সে তা মেনে নেয়নি। বরং, সে তার উস্তাদের মানহাজের উপর অটল রয়েছে। আল্লাহ তাকে হেদায়েত করুন এবং তার অনিষ্ট হতে মুসলিমদের হেফাজত করুন।”
সর্বশেষ, ইমাম ইবনে তাইমিয়া অনেক কিতাব এবং ফতোয়া লিপিবদ্ধ করে রেখে গেছেন। বিশেষ করে আক্বীদাহর ব্যপারে তাঁর কিতাবগুলো আহলে সুন্নত ওয়াল জামআ’তের জন্যে মহামূল্যবান মনি-মুক্তার মতো। আমরা দুয়া করি, আল্লাহ তাআ’লা ইমাম ইবনে তাইমিয়াকে জান্নাতুল ফেরদাউসে সেই প্রতিদান দান করুন, তিনি যার জন্য উপযুক্ত, আমিন।

সূত্র : আওয়ার ইসলাম:

শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়ার চিন্তার পুনর্পাঠ

ইবনে-তাইমিয়া-কাল্পনিক-ছবি

শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়ার চিন্তার পুনর্পাঠ

ইসলাম ও মুসলিমদের নিয়ে বর্তমানে আগ্রহী কোনো কর্মী, চিন্তাবিদ, সাংবাদিক বা অন্য যে কারো কাছেই ইবনে তাইমিয়া একটি পরিচিত নাম। তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে শুধু নাম ও কিছু অস্পষ্ট পূর্বানুমান ছাড়া তাঁর সম্পর্কে লোকজনের তেমন জানাশোনা নেই। মৃত্যুর আট শতাধিক বছর পরেও যাকে নিয়ে বিতর্ক চলছে, কে সেই ইবনে তাইমিয়া?
হাম্বলী মাজহাবের অনুসারী একটি সম্মানিত পরিবারে আহমদ তাকিউদ্দীন ইবনে তাইমিয়ার জন্ম। ৬৬১ হিজরীর (১২৬৩ খ্রিষ্টাব্দ) ১০ রবিউল আউয়াল তারিখে বর্তমান সিরিয়া ও তুরস্কের মাঝামাঝি অবস্থিত হার্‌রানে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। সাত বছর বয়স পর্যন্ত তিনি সেখানেই বেড়ে ওঠেন। তারপর মোঙ্গলদের আক্রমণের ফলে পুরো অঞ্চলে ত্রাস ও ধ্বংসলীলা ছড়িয়ে পড়লে তাঁর পরিবার রাতের আঁধারে সেখান থেকে বেরিয়ে যান। সাথে করে নিয়ে যায় যে কোনো আলেম পরিবারের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ – বই।
হার্‌রান ছেড়ে দামেস্কের উদ্দেশ্যে এই ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রা অল্পবয়সী ইবনে তাইমিয়ার ওপর ব্যাপক প্রভাব ফেলে। এর ফলে তাতার দখলদারদের প্রতি তাঁর মনে ধীরে ধীরে তীব্র ঘৃণার জন্ম হয়। পরবর্তীতে তাঁর কলম, জবান ও তরবারী দিয়ে তাতারদের বিরোধিতায় নিজের জীবনকে উৎসর্গ করায় তাই অবাক হওয়ার কিছু নেই। তাঁর দৃষ্টিতে বিদআত ও ভ্রান্ত আকীদার ফলেই উম্মাহর কার্যকারিতা, জিহাদ ও ইজতিহাদের চেতনা বিনষ্ট হয়েছে। এসব থেকে উম্মাহ্‌কে মুক্ত করার মাধ্যমে তাতারদের প্রতিরোধ করার জন্যে তিনি শাসক ও জনগণকে আহ্বান করেন।
দামেস্কে পৌঁছার পরপরই ইবনে তাইমিয়ার পিতা শাইখ শিহাব উদ্দীন শহরের সমঝদার জ্ঞানী মহলে সুপরিচিত হয়ে ওঠেন। উমাইয়া মসজিদে দলে দলে লোকজন তাঁর দার্‌সে অংশগ্রহণ করতো। তিনি দারুল হাদীস আল-শুক্কারিয়্যাহ্‌র শাইখ হিসেবে দায়িত্ব লাভ করেন। তাঁর পুত্র এই পরিবেশেই বেড়ে ওঠেন।
তাকিউদ্দীন অল্প বয়সেই কোরআন হিফজ করেন। কোরআনের পাশাপাশি তিনি তাঁর বাবার কাছে হাদীস ও ফিকাহ্‌র পাঠ নেন। এছাড়া অন্যান্য আলেমের অধীনে ভাষাবিজ্ঞান, উসূল এবং দ্বীনি জ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় অধ্যয়ন করেন। তরুণ ইবনে তাইমিয়া শুধু পরিবার থেকে প্রাপ্ত বিষয়সমূহের শিক্ষায় নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেননি। বরং তিনি গভীরভাবে ধর্মতত্ত্ব, দর্শন, গণিত, বীজগণিত, এবং ধর্মের ইতিহাস অধ্যয়ন করেন। তাঁর সম্পর্কে বলা হয়, তিনি দ্রুত মুখস্ত করতে পারতেন এবং খুব কমই ভুলতেন।
বিশ বছর বয়সের পূর্বেই তিনি ফতোয়া দেওয়ার যোগ্যতাসম্পন্ন হয়ে উঠেন। পিতার মৃত্যুর পর তিনি দারুল হাদীস আল-শুক্কারিয়ায় হাদীস ও ফিক্‌হের শিক্ষক হিসেবে পিতার স্থলাভিষিক্ত হন। তখন তাঁর বয়স ছিল একুশ বছর। উমাইয়া মসজিদেও তিনি পিতার স্থলাভিষিক্ত হন। সেখানে তিনি তাফসীরের ওপর দার্‌স দিতেন। ১২৯৬ সালে তাঁর শিক্ষক ও মাদ্রাসা আল-হাম্বলিয়ার ফিকাহ শাস্ত্রের অধ্যাপক যাইনুদ্দীন ইবনে মুনাজ্জা মৃত্যুবরণ করেন। ইবনে তাইমিয়া পরবর্তীতে সে পদে যোগদান করেন।
ইবনে তাইমিয়া উপলব্ধি করেন তাওহীদ হচ্ছে ইসলামের মূল কেন্দ্রবিন্দু।
ফলে হেলেনীয় দর্শন, অজ্ঞেয়বাদ, অবান্তর ধর্মতাত্ত্বিক বিতর্ক এবং দার্শনিক মরমিবাদ থেকে ইসলামী চিন্তা ও আকীদাকে মুক্ত করতে তিনি জীবনের বিরাট অংশ ব্যয় করেন। ইসলামী সংস্কৃতির সকল ক্ষেত্রেই এই বিষয়গুলো গভীরভাবে গেড়ে বসেছিল। বিশেষ করে মানুষের ধারণা, বিশ্বজগতে তার অস্তিত্ব, স্বাধীনতা ও দায়দায়িত্ব সম্পর্কিত ধারণাগুলো ‘ওয়াহ্‌দাতুল ওজুদ’ (সর্বেশ্বরবাদী অদ্বৈতবাদ – এতে মনে করা হয় – সবকিছু একই সত্ত্বার নির্যাস) ও ‘হুলুল’ (অবতারবাদ) সংক্রান্ত আকীদা দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিল। ইবনে তাইমিয়া এ সমস্ত আকীদার ব্যাপারে শংকিত হয়ে উঠেছিলেন। এগুলো বিভাজন, সংশয়, কঠোরতা এবং নিষ্ক্রিয়তা ছড়িয়ে দিচ্ছিল। এগুলো উম্মাহ্‌র ভিত্তিমূলে আঘাত করার মাধ্যমে এর গতিশীলতাকে স্তব্ধ করে দিচ্ছিলো এবং উম্মাহ যে সমস্ত বিপদের সম্মুখীন সেগুলোর ব্যাপারেও অনুভূতিশূন্য করে তুলছিলো।
ইবনে তাইমিয়া ছিলেন সংস্কার আন্দোলনের অন্যতম পথপ্রদর্শক। পতনোন্মুখ ঐতিহ্য, ফিক্‌হী তাকলীদ, সমাজবিচ্ছিন্ন বিভিন্ন তরিকা ও স্বৈরাচারী শাসনব্যবস্থার মধ্যে পারস্পরিক শক্তিশালী মৈত্রিতার কারণে জীবদ্দশায় তাঁর সংস্কারচিন্তা সাফল্য ও ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা না পেলেও তা বৃথা যায়নি। সমকালীন সংস্কার আন্দোলনে তাঁর কর্মপ্রচেষ্টার ব্যাপক প্রভাব রয়েছে। ইবনে তাইমিয়ার তৎপরতা ও পুনর্জাগরণ প্রচেষ্টার উল্লেখযোগ্য দিকগুলো হচ্ছে – একদিকে উম্মাহর বাস্তবতা ও সংকটের মধ্যে যোগসূত্র স্থাপন এবং অন্যদিকে প্রকৃত উৎসের সাথে এ বাস্তবতার সংযোগ পুনঃস্থাপন, পরবর্তীকালে যুক্ত হওয়া বিচ্যুতিগুলো থেকে তাওহীদী আকীদাকে মুক্ত করা, আল্লাহ প্রদত্ত শিক্ষা ও মিশনের প্রতি মানুষের দায়িত্বের ব্যাপারে সচেতনতা তৈরি এবং ইজতেহাদ ও জিহাদের গুরুত্ব তুলে ধরা।
বর্তমানে কোরআন-হাদীসের আলোকে বুদ্ধিবৃত্তিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও প্রাত্যহিক জীবনের সমস্যাগুলোর ব্যাখ্যা দেখতে দেখতে অনেকে হয়ত এই সমস্ত ইজতিহাদী মূলনীতিকে স্বাভাবিক ধরে নেয়। এ কারণে তারা শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া কিংবা পরবর্তীকালের যেসব সংস্কারবাদীরা এই কর্মপদ্ধতি ব্যাখ্যা করেছেন এবং ইতিহাসের ধ্বংসস্তুপ থেকে বের করে এনেছেন তাঁদেরকে যথাযথভাবে মূল্যায়ন করতে পারে না।
এসব পথপ্রদর্শনমূলক প্রচেষ্টাগুলোর গুরুত্ব সম্পর্কে যেসব তরুণ সচেতন নয়, তাদের জন্যে এটুকু বলাই হয়তো যথেষ্ট হবে – ইজতিহাদ করার অভিযোগে একদল আলেমকে আঠারো শতকের শেষ দিকে দামেস্কে বিচারের সম্মুখীন হতে হয়েছিল! যাইহোক, এটা উল্লেখ করা প্রয়োজন যে সমকালীন সংস্কার আন্দোলনগুলো ইবনে তাইমিয়ার চিন্তা দ্বারা অনুপ্রাণিত হলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে তা বাহ্যিক সম্পর্কেই সীমাবদ্ধ থেকে গেছে।
অথচ ইবনে তাইমিয়া বুদ্ধিবৃত্তিক ও রাজনৈতিক স্বাধীনতা এবং সামাজিক সুবিচারের মতো অসাধারণ মূলনীতি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তাঁর চিন্তার এই সামাজিক দিকগুলো অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সংস্কার আন্দোলনগুলোতে অবহেলিত ও প্রান্তিক রয়ে গেছে। আরেকটা বিষয় উল্লেখ করা দরকার, এই মহান আলেমের অনুসারী বলে যারা নিজেদের দাবি করেন, তারা সবাই তাঁর চিন্তার প্রতিনিধিত্ব করেন এমনটা মনে করার কারণ নেই।
তিনি নুসুসের সহায়তা ছাড়াই রাজনৈতিক তত্ত্বের ভিত্তি হিসেবে ন্যায়বিচারের মূলনীতিকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। তাঁর ছাত্র ইবনুল কাইয়্যুম আল-জাওযিয়্যাহ্‌ ব্যাপারটা ব্যাখ্যা করে বলেছেন, রাজনৈতিক তত্ত্ব কোরআন-হাদীস দ্বারা নির্দেশিত হওয়া জরুরি নয়। এটি কোরআন-হাদীসের সাথে সাংঘর্ষিক না হওয়াটাই যথেষ্ট। ইবনে তাইমিয়া উম্মাহ্‌র অনুমোদনের নীতিকে শাসকের বৈধতার একমাত্র ভিত্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন। উদাহরণস্বরুপ তিনি ব্যাখ্যা করেন, রাসূলের (সা) ওফাতের পর সংঘটিত আল-সাকীফার চুক্তি কিংবা উমর (রা) কর্তৃক গঠিত ছয় সাহাবীর শুরা কর্তৃক উসমান (রা) এর নিয়োগে অঙ্গীকার বাধ্যতামূলক (বাইয়্যাত) ছিল না বরঞ্চ তা ছিল মনোনয়ন মাত্র। মূল্য নিয়ন্ত্রণ ও একচেটিয়া বাজার রোধকল্পে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপের নীতি এবং রাষ্ট্রের সামাজিক ভূমিকা সক্রিয় করার লক্ষ্যে অন্যান্য প্রক্রিয়াও ইবনে তাইমিয়া প্রতিষ্ঠা করেন।
একজন চিন্তাবিদ যে সময়ে বাস করেছেন, যেসব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করেছেন এবং যে নির্দিষ্ট পরিস্থিতি ও বিষয়াদির সম্মুখীন হয়েছেন সেই আলোকে তার লেখা পাঠ করা উচিত। প্রকৃতপক্ষে এটিই ইসলামের বাণীর বৈশিষ্ট্য। ইসলামের এই চিরন্তন বৈশিষ্ট্যই নতুন পরিস্থিতির আলোকে কোরআন-হাদীসের পুনর্ব্যাখ্যাকারী সংস্কারকদের আবির্ভাবকে অপরিহার্য করে তোলে।
সপ্তম ও অষ্টম শতকের সাংস্কৃতিক জীবন ছিল অনেকটা নিম্নরূপ:
সুন্নী মুসলমানদের মধ্যে ফিকাহ সংক্রান্ত বিষয়ে চার মাজহাবের প্রবল তাকলীদ বিদ্যমান ছিল। পূর্ববর্তীদের কাজের ব্যাখ্যা ও সারসংক্ষেপ তৈরি করার মধ্যেই মূলত তৎকালীন ফকীহদের তৎপরতা সীমিত ছিল। এছাড়া ‘প্রতিদ্বন্দ্বী’ মাজহাব থেকে স্বীয় মাজহাবকে রক্ষা করায়ও তারা ব্যস্ত থাকতেন।
যখন কোনো শাসক নির্দিষ্ট একটি মাজহাব গ্রহণ কিংবা নির্দিষ্ট কোনো মাজহাবের আলেমদের প্রশ্রয় দিতেন, তখন মাজহাবগুলোর মধ্যে দ্বন্দ্ব আরো বেড়ে যেত। ইবনে তাইমিয়া হাম্বলী ঐতিহ্যে বেড়ে উঠেছিলেন এবং ইমাম আহমদের প্রতি তাঁর অশেষ শ্রদ্ধা ছিল। তথাপি তিনি ছিলেন একজন স্বাধীন চিন্তাবিদ, যিনি কেবল কোরআন ও হাদীসের বিশুদ্ধ বর্ণনা এবং সাহাবী ও তাঁদের উত্তরসূরীদের উদাহরণ দ্বারা অনুপ্রাণিত হতেন। এর ফলে তিনি এমন ইজতিহাদ ও মতামত দিয়েছেন যা শুধু তাঁর নিজের মাজহাব থেকেই ভিন্ন ছিলো না বরং চার মাজহাব থেকেই ভিন্ন ছিলো।
তিনি তাকলীদের সীমানা ভাঙ্গার মাধ্যমে অসাধারণ সাহসের পরিচয় দেন। এই সাহসের কারণে তাঁকে অসংখ্য সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়। তাঁকে তাকলীদপন্থী আলেম ও তাঁদের অনুসারীদের আক্রোশের শিকার হতে হয়।
তারবিয়্যাহ্‌র ক্ষেত্রে তাসাউফের প্রভাব ছিল প্রবল। কিন্তু ততদিনে তাসাউফের অংশবিশেষ ‘ওয়াহদাতুল ওজুদ’ (অদ্বৈতবাদ), ‘হুলুল’ (অবতারবাদ) এবং ‘জাবরিয়া’ (অদৃষ্টবাদ) আকীদাগুলো দ্বারা আক্রান্ত হয়। ইবনে তাইমিয়া এইসব আকীদা, হালাল-হারামের প্রতি অবহেলা এবং স্বৈরাচারী শাসক ও দখলদারদের জোটবদ্ধতার বিরোধিতা করেন। বৈরাগ্যবাদসহ যে সমস্ত বিদআত তাসাউফের ভেতর অনুপ্রবেশ করেছিল তিনি সেগুলোর বিরোধিতা করেন।
তাঁর মতে, দারিদ্র্য ও দুর্বলতাকে মহিমান্বিত করা ইসলামবিরুদ্ধ এইসব আকীদা খ্রিষ্টধর্ম (যে ধর্ম নিজেই গ্রিক দর্শন দ্বারা প্রভাবিত) থেকে আমদানি করা হয়েছে। বিভিন্ন মাজহাব ও তাসাউফের মধ্যে বিভাজন সমাজকে আরো বেশি বিভক্ত করে। বিশেষ করে, কারো কারো প্রতি রাষ্ট্রের সমর্থনের ফলে ভুলত্রুটির ঊর্ধ্বে আসীন যাজকতন্ত্রের মতোই একটি শ্রেণীর আবির্ভাব ঘটে। এই বিচ্যুতিগুলো ইসলামের সামাজিক ও রাজনৈতিক দিকগুলোকে পুরোপুরি উপেক্ষা করে ইসলামকে একটি আচারসর্বস্ব অদৃষ্টবাদী বৈরাগ্যবাদে পরিণত করে।
তাসাউফের প্রতি তাঁর তীব্র সমালোচনার ফলে এর প্রতি তাঁর বিরোধিতা সম্পর্কে সৃষ্ট ধারণা সত্ত্বেও বলা চলে তিনি তাসাউফের ব্যাপারে তাঁর মতামতগুলো সরলীকরণ করেননি। বরং তিনি তাসাউফের বিশুদ্ধ ও বিচ্যুত ধারার মধ্যে পার্থক্য করেছেন মাত্র। তিনি প্রায়ই আল জোনাইদ ও আল কায়লানীর মতো তাসাউফের প্রথম দিককার শায়েখদের প্রশংসা করতেন। আর আল হাল্লাজ, ইবনে ‘আরাবী, ইবনে সাবঈন, আন নাকাবী ও অন্যান্যদের দার্শনিক মরমিবাদের সমালোচনা করতেন।
তিনি সুন্নাহ্‌র সাথে সাংঘর্ষিক আচারসমূহের সমালোচনা করতেন। তাতার, ক্রুসেডার ও স্বৈরাচারী শাসকদের সাথে জোটবদ্ধ হওয়ার বিরোধিতা করেছেন। হাম্বলী সুফী আব্দুল কাদির জিলানীর নামানুসারে গড়ে ওঠা কাদেরিয়া সুফী তরীকার সাথে ইবনে তাইমিয়া সম্পৃক্ত ছিলেন। তিনি তাঁর প্রশংসা করতেন। এমনকি আব্দুল কাদির জিলানীর রচিত “ফুতুহ্‌ আল-গায়েব” বইয়ের অংশবিশেষের ব্যাখ্যা হিসেবে ইবনে তাইমিয়া “শরহে ফুতুহ্‌ আল-গায়েব” নামে একটি গ্রন্থও রচনা করেন।
এভাবে তৎকালীন পরিস্থিতি ও চ্যালেঞ্জসমূহ ইবনে তাইমিয়ার কাজের সাথে ওতপ্রোতভাবে যেমন জড়িয়ে আছে, তেমনি তাঁর কাজকে প্রভাবিতও করেছে। তাঁর লেখালেখিগুলো তাঁর গভীর জ্ঞান ও দীর্ঘ অভিজ্ঞতার ফসল হিসেবে আমাদের সামনে রয়েছে। তিনি তাঁর লেখালেখিতে তৎকালীন সংস্কৃতিকে বুঝা ও একে শরয়ী মানদণ্ডে বিচার করার প্রচেষ্টা চালিয়ে গেছেন। ওহী (মানকুল) ও যুক্তিবোধ (মা’কুল) উভয়কেই তিনি শরয়ী মানদণ্ডের অংশ মনে করতেন। আল্লাহ, রাসূল (সা) ও সালফে সালেহীনদের প্রতি গভীর ভালোবাসা এবং তীক্ষ্ণ মননের সমন্বয়ে তিনি এই বিশাল কর্মযজ্ঞ সম্পাদন করেন।
ইবনে তাইমিয়া মনে করতেন, উম্মাহ্‌ তার প্রকৃত বৈশিষ্ট্য থেকে বিচ্যুত হয়ে গেছে। তিনিসহ অন্যান্য সংস্কারকগণ উম্মাহ্‌র পতন, পশ্চাৎপদতা ও অন্য জাতির অধীনস্ত হওয়ার প্রকৃত কারণ হিসেবে উম্মাহ্‌ ও ইসলামের মধ্যে তৈরি হওয়া দূরত্বকে চিহ্নিত করেন। ইমাম মালিকের বক্তব্যের মূলনীতির আলোকে তিনি একটি সামগ্রিক সংস্কার প্রচেষ্টা শুরু করেন। ইমাম মালিক বলেছিলেন: “এই উম্মাহ্‌র পরবর্তী প্রজন্মগুলো ততক্ষণ পর্যন্ত সফল হবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত না তারা ঐ পদ্ধতি অবলম্বন করবে, যা প্রথম প্রজন্মকে সফল করেছিল।”
ইবনে তাইমিয়া সালাফদের অনুসৃত পদ্ধতির আলোকে ধর্মতাত্ত্বিক ও দার্শনিকদের পদ্ধতির বিরোধিতা করেন। এ পদ্ধতি শরীয়াহ্‌কে মনন দ্বারা বিচারের স্থলে শরীয়াহ্‌ দ্বারাই বিচারের নীতি ধারণ করতো, এই অনুমানের ভিত্তিতে যে এই দুয়ের মধ্যে প্রকৃতপক্ষে কোনো ধরণের সংঘাত নেই। তিনি আলেমদের কঠোরতা অবলম্বনের নীতিরও বিরোধিতা করেন। এ লক্ষ্যে তিনি ইজতিহাদের ডাক দেন এবং মতবিরোধপূর্ণ বিষয়গুলো কোরআন-সুন্নাহ্‌র আলোকে বিবেচনা করার আহবান জানান।
সালাফদের আকীদার দিকে আহবানের মাধ্যমে তিনি ‘হুলুল’ ও ‘ওয়াহদাতুল ওজুদ’ আকীদার বিরোধিতা করেন। তাকওয়া ও জিহাদের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত নবুয়তী তারবিয়্যাহ্‌র দিকে আহবানের মাধ্যমে ভ্রান্ত আকীদাগুলোর তারবিয়্যাহ্‌ ও সুলুকের বিরোধিতা করেন। তিনি শাসকদের স্বৈরাচারিতা এবং সমাজের প্রতি তাদের দায়িত্বের প্রতি অবহেলার বিরোধিতা করেন। তিনি এমন একটি সরকার ব্যবস্থার প্রস্তাব করেন যা শাসক ও শাসিতের পরামর্শের ভিত্তিতে পরিচালিত হবে। এই ব্যবস্থায় অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে দরিদ্রদের সুরক্ষা প্রদান, বণ্টন ও মূল্য নির্ধারণে নজরদারি ও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠাসহ জনগণের স্বার্থ নিশ্চিত করতে রাষ্ট্র হস্তক্ষেপ করবে। ‘আল-হিসবা’ বইয়ে তিনি এ বিষয়ে বিস্তারিত লিখেছেন।
উপরোক্ত বক্তব্য সত্ত্বেও ইবনে তাইমিয়া বিভক্তির দিকে ডাকেননি। তিনি শাসক, আলেম ও জনগণসহ সমস্ত উম্মাহ্‌কে পুনর্জাগরিত ও পুনুরুজ্জীবিত করতে চেয়েছিলেন। তিনি কেবল বক্তব্য দিয়েই ক্ষান্ত হননি, বাস্তবেও অনেক কিছু করেছেন। তিনি প্রায়ই জনগণের অভিযোগ ও দাবি নিয়ে সরাসরি শাসকদের কাছে চলে যেতেন। তিনি দখলদারদের বিরুদ্ধে যুদ্ধও করেছেন। এমনকি যুদ্ধবন্দীদের সংকট নিরসনে রাজনৈতিকভাবে ভূমিকা রেখেছেন।
তাঁর মতো মহান সংস্কারককে বুঝতে হলে তৎকালীন বাহ্যিক সামরিক ও সভ্যতার চ্যালেঞ্জসমূহ এবং অভ্যন্তরীণ সংকটগুলোকে বিবেচনায় নিতে হবে। এই বহুবিধ সংকট উম্মাহ্‌কে একটি আত্মরক্ষামূলক অবস্থানে ঠেলে দিয়েছিল। এর ফলে পারস্পরিক সাধারণ বৈশিষ্ট্য অনুসন্ধানের পরিবর্তে উম্মাহ্‌ নিজস্ব স্বতন্ত্র চরিত্রের সন্ধানে অধিক জোর দিয়েছিল। এই জায়গা থেকে দেখলে এটি স্পষ্ট হয়, ইবনে তাইমিয়ার কর্মপ্রচেষ্টা ছিল তাঁর সময়ের চ্যালেঞ্জ ও অগ্রাধিকারের ব্যাপারে একটি ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া।
যাইহোক, তিনি এমন একটি সময়ে কাজ শুরু করেছিলেন যখন উম্মাহ গভীর পতনের সম্মুখীন। ফলে তাঁর আহবান তাদের সুখনিদ্রায় ব্যাঘাত ঘটায়। তাঁর আহবানকে বিবেচনায় নেয়ার পরিবর্তে উম্মাহ্‌র নেতৃবৃন্দ একে স্তব্ধ করে দিতে উঠেপড়ে লাগে। তিনি একের পর এক বিচারের সম্মুখীন হন। প্রকৃতপক্ষে ব্যক্তি ইবনে তাইমিয়াকে নয়, বরং যে রেনেসাঁর আহ্বান তিনি জানাচ্ছিলেন তাকে বিচারের মুখোমুখি করা হয়েছিল। এবং এর বিচারক কোনো মালিকী অথবা শাফিয়ী আলেম ছিলেন না বরং এর বিচারক ছিল তৎকালীন যুগের পতনাবস্থা। শাফেয়ী মাজহাবভুক্ত তাঁর শিষ্য আল-বিরজালী, আয-যাহাবী, ইবনে কাসীর এবং হাম্বলী মাজহাবভুক্ত জীবনীকার ইবনে রজব ইবনে তাইমিয়ার জীবনের এই কঠিন পরীক্ষাগুলো নিয়ে বিস্তারিত লিখেছেন। তবে তাঁর নিজের মতে, বন্দীজীবন ছিল তাঁর জন্যে রহমতস্বরূপ, যা ইলমের সাথে আমলের সম্মান এবং ইজতিহাদের সাথে জিহাদের মুকুটে তাঁকে সজ্জিত করেছে।
জীবনীকারগণ ইবনে তাইমিয়ার বন্দীজীবনের বেশ কিছু বক্তব্য উদ্ধৃত করেছেন, যা তাঁর ঐ সময়ের মানসিক অবস্থার পরিচয় দেয়। যেমন: “আমার শত্রুরা আমার কিই-বা করতে পারে? আমার জান্নাত তো আমার অন্তরে, আমি যেখানেই যাই তা আমার সাথেই থাকে; একে আমার কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন করা যাবে না। কারাগার হলো আমার জন্য নির্জন আশ্রয়; মৃত্যুদণ্ড হলো শাহাদাতের সুযোগ এবং নির্বাসন হলো ভ্রমণের সুযোগ।”
ইবনে তাইমিয়ার মৃত্যুর তিন মাস আগে তাঁর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী আল-ইখনা’য়ী সুলতানের কাছে নালিশ করেন। এই ব্যক্তির যুক্তি খণ্ডন করে একবার ইবনে তাইমিয়া একটি লেখা লিখেছিলেন। আল-ইখনা’য়ীর নালিশের প্রেক্ষিতে ইবনে তাইমিয়াকে কারাগারে লেখালেখি করার সুযোগ থেকে বঞ্চিত করার আদেশ দেয়া হয়। ফলে তাঁর কাগজ, কালি ও কলম ছিনিয়ে নেওয়া হয়। ৭২৮ হিজরীর ২০ জিলকদ (২৬ সেপ্টেম্বর, ১৩২৮) ইবনে তাইমিয়া ৬৫ বছর বয়সে জেলখানায় মৃত্যুবরণ করেন। ইবনে কাসীরের মতে, ৬০ হাজার থেকে ১ লক্ষ লোক তাঁর জানাজায় অংশগ্রহণ করেছিল। এর মাঝে ১৫ হাজার ছিলেন নারী।
আল হাফিজ আল মিজ্জী বলেছেন, “আমি তাঁর মতো আর কাউকে দেখিনি, তিনিও তাঁর মতো কাউকে দেখেননি। আল্লাহর কিতাব ও রাসূলের (সা) সুন্নাহর ব্যাপারে তাঁর মতো জ্ঞানী ও পাবন্দী আর কাউকে আমি দেখিনি।”
সূত্রঃ Ibn Taymiyyah: Misunderstood Genius
http://shoncharon.com/2016/01/13/শাইখুল-ইসলাম-ইবনে-তাইমিয়/